নির্ধারিত ৮ কর্মঘণ্টা ডিউটির অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশের কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত ওভারটাইম ভাতা চালু করার দাবি এসেছে পুলিশের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের বাসাগুলোয় পুলিশকেও বরাদ্দ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে মামলা তদন্তের ব্যয় বরাদ্দ আরও বাড়ানোরও দাবি তুলেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ দাবিগুলো তোলা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। ওই সভায় মোট ৭টি দাবি বা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। এর আগে গতকাল দিনভর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তাদের সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে। অধিকাংশ ইউনিট তাদের সাফল্যের পাশাপাশি কাজ করতে গিয়ে তাদের যে অবকাঠামোগত সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব রয়েছে তা তুলে ধরেন।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে সকাল থেকে একে একে উপস্থাপনা দেয় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। সিআইডি, র্যাব, পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, এন্টি টেররিজম ইউনিট, হাইওয়ে পুলিশ, এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ, নৌপুলিশ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ নিজ নিজ ইউনিটের পক্ষে তাদের কার্যক্রম, সাফল্য ও দীর্ঘদিনের সংকট তুলে ধরে। বিশেষ করে মামলার তদন্ত, অভিযানের ব্যয় এবং অজ্ঞাত লাশের ব্যবস্থাপনায় কোনো সরকারি বরাদ্দ না থাকায় ক্ষোভও প্রকাশ করে কোনো কোনো ইউনিট।
মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সঙ্গে সভায় পুলিশ
সদর দপ্তরের এআইজি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের বিভিন্ন বাসা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশকে দেওয়া হয় না। পুলিশে চরম আবাসন সংকট রয়েছে। এই সংকট নিরসনে তিনি আবাসন পরিদপ্তরের বিভিন্ন বাসা পুলিশকেও বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সভায় বলেন, পুলিশকে প্রতিনিয়ত নির্ধারিত ৮ কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয় আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু এ জন্য তাদের কোনো ওভারটাইম ভাতা প্রদান করা হয় না। তিনি জানান, মাঠপুুলিশের পাশাপাশি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও প্রায়শই ৮ ঘণ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। তিনি এ জন্য পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ৮ কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য ওভারটাইম ভাতা চালু করার প্রস্তাব করেন।
সভায় ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, বর্তমানে মামলা তদন্তে সরকার থেকে যে অর্থ বরাদ্দ করা আছে, তা খুবই অপ্রতুল। কোনো কোনো মামলা তদন্তে সরকার থেকে দেওয়া বরাদ্দের চেয়েও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। তিনি মামলা তদন্তে সরকারি অর্থ বরাদ্দ আরও বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন।
সভায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার তার ইউনিটে জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। এ ছাড়া সিআইডির পক্ষ থেকে সভায় প্রতিটি জেলায় ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়।
সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী।
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ বাহারুল আলমের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ আবু তাহের, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী,, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে পৃথক অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া র্যাবের প্রেজেনটেশনে বাহিনীটি নিজেদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিতে নতুন উদ্যোগের কথা জানায়। বাহিনীটির মহাপরিচালক (ডিজি) একেএম শহিদুর রহমান জানান, বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে কোনো অপব্যবহার বা একক সিদ্ধান্তে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ঠেকাতে গঠিত হয়েছে মানবাধিকার সেল ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত সেল। একই সঙ্গে আইনগত কাঠামোয় র?্যাবকে আনতে প্রণয়ন করা হচ্ছে ‘র?্যাব আইন ২০২৪ (খসড়া)’। এই আইনের আওতায় থাকলে আর কেউ বাহিনীকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না। যার মাধ্যমে বাহিনীটি আইনের আওতায় আনতে চায় সরকার। এতে র?্যাব আর কারও খুশিমতো ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ পাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিআইডির প্রধান গাজী জসীম তার উপস্থাপনায় বলেন, সিআইডির ফরেনসিক শাখা দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে অপরাধ বিশ্লেষণের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে। এর প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক ফরেনসিক প্রতিবেদন ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটনে কার্যকর ভূমিকা রেখে আসছে। এসব সাফল্যের মধ্যেও রয়েছে তীব্র সংকট। যানবাহনের অভাব, নিজস্ব স্থাপনার ঘাটতি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও টুলসের অভাব এবং বদলির অনিশ্চয়তা অনেক সময় কাজের গতিকে শ্লথ করে। সিআইডির বেশির ভাগ ইউনিট এখনও ভাড়া অফিসে বা জেলা পুলিশের ভবনে চলছে। মাঠপর্যায়ে ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় তদন্তও বিলম্বিত হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশের উপস্থাপনায় মহাসড়কে নিরাপত্তা ও সেবার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তারা উল্লেখ করে, সামাজিক মাধ্যমে মহাসড়ক নিয়ে অনেক তথ্য গুজবভিত্তিক। তবে মহাসড়কে নিরাপত্তা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় তারা।
এর আগে মঙ্গলবার পুলিশ সপ্তাহের প্রথম দিন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পক্ষ থেকে তাদের কর্মকা- ও আগামীর পরিকল্পনার ব্যাপারে প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়। সেখানে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩(২) ধারায় তালিকাভুক্ত ব্যক্তিকে ডিটেনশনে (একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনাবিচারে আটক রাখা) নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নিকট ভবিষ্যতে যাতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে না পারে, সে জন্যই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের ডিটেনশনে নেওয়া উচিত। সরকারের অনুতি পেলে এসবির পক্ষ থেকে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিস্তারিত জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।
Reporter Name 






















