,

image-514190-1643361535

ইউক্রেন নিয়ে আমেরিকা-রাশিয়ার টানাটানি

হাওর বার্তা ডেস্কঃ ইউক্রেন সীমান্তে প্রচুর পরিমাণে সৈন্য ও অস্ত্র মোতায়েন করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের দাবি, তার পূর্ব সীমান্তে রাশিয়া প্রায় সোয়া এক লাখ সেনা মোতায়েন করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণে ভারি অস্ত্র, ট্যাংক, গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ সরাসরি যুদ্ধের জন্য যা দরকার সবই উপস্থিত করেছে রাশিয়া। ইউক্রেন আশঙ্কা করছে, যে কোনো সময়ে সামরিক হামলা চালাবেন পুতিন। তাই আমেরিকার শরণাপন্ন হয়েছেন ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকা বলছে, ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পুরো পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনের পাশে আছে। রাশিয়াকে ব্যাপক হুমকি-ধমকি দিচ্ছে নিজেকে এখনও বিশ্বের একক ক্ষমতাধর দাবি করা এই দেশটি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তো আরেকধাপ এগিয়ে গেছেন। সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাশিয়া আক্রমণ করলে পুতিনের এবার খবর আছে। তাকে দেখিয়ে দেবেন কত ধানে কত চাল।
সারা বিশ্বএখন মনে করছে এই বুঝি বেঁধে গেলে রাশিয়া আমেরিকার যুদ্ধ, এই বুঝি বেঁধে গেল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু বাইডেন পুতিনকে কি যে দেখিয়ে দেবেন তা হয়তো তিনি নিজেও জানেন না। যে পুতিনকে তারা বেলারুশে কিছু করতে পারল না। জর্জিয়াতে যার বিরুদ্ধে পশ্চিমা কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করল না। সিরিয়ায় যে পুতিনের একটা চুলও ছিঁড়তে পারল না। লিবিয়ায় যে পুতিনের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তিটুকু যাদের নেই। কাজাখস্তানে যে পুতিন একাই ঘোড়া ছুটালেন ইচ্ছেমতো কেউ একটা শক্ত বিবৃতি পর্যন্ত দিতে পারল না। তারা এখন হুমকি দিচ্ছে ইউক্রেনে হামলা হলে সেই পুতিনের খবর করে ছাড়বেন। দেখা যাক পুতিনের কী খবর করেন?

আচ্ছা পুতিন কি ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নেননি। ইউক্রেনের পূর্বদিকের শিল্পোন্নত ডোনবাস অঞ্চল এখন কি রাশিয়া সমর্থিত বিদ্রোহীদের দখলে না? সেখানে কি এখন যুদ্ধ চলছে না? সেখানে কি প্রতিদিন ইউক্রেনের সৈন্য মারা যাচ্ছে না? ইউক্রেনের বন্দরনগরী ওডেসা রাশিয়ার নৌবহর ঘেরাও করে রাখেনি। ইউক্রেনের উত্তরে বেলারুশের সঙ্গে এক হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ধরে রাশিয়া সেনাবাহিনী আর ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেনি? পুরো ইউক্রেনের তিন দিক হাজার হাজার সেনাবাহিনী আর অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে ঘিরে রেখেছে রাশিয়া। ওদিকে মলডোভাতেও আছে রুশ সেনা উপস্থিতি। তা হলে আর যুদ্ধের বাকিটা রইল কী?

মিস্টার দুনিয়া লিডার বললেন, রাশিয়া যদি সরাসরি আক্রমণ করে তা হলে খবর করে ছাড়বেন। অর্থাৎ পুতিন যদি সরাসরি তার সেনাবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ইউক্রেনের ওপর এবং ইউক্রেন দখল করে নেয় তখন তিনি পুতিনকে মহা শাস্তি দেবেন। পুতিন কি এত বোকা নাকি। যে দেশকে ভেতর থেকে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে অথবা বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে যে দেশের অনেকাংশ দখল করা সম্ভব। অর্থাৎ যেখানে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে সফলতা পাওয়া সম্ভব পুতিন সেখানে নিজ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কনভেনশনাল যুদ্ধে জড়াবেন কেন? মিস্টার দুনিয়া লিডারও এটা জানেন। ভালো করেই জানেন যে পুতিন ইউক্রেনে সরাসরি সেনাবাহিনী পাঠাবে না। বাইডেন আসলে এই হুমকি দিয়ে মূলত রাশিয়াকে ক্ষেপাতে চাইছেন। ইউক্রেনে আরেকটা প্রক্সি যুদ্ধ চাইছেন। নয়ত অন্তত যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রেখে ইউরোপ এবং ন্যাটোকে দৃঢ় করতে চাইছে। ইউরোপ এবং ন্যাটোকে দেখাতে চাইছে যে দেখো রাশিয়া আসলে সেনাবাহিনী পাঠাত কিন্তু আমাদের সামষ্টিক শক্তি দেখে রাশিয়া ভয় পেয়েছে তাই সেনা পাঠায়নি।

এখানে পুতিনেরও যেমন আসল উদ্দেশ্য ইউক্রেনকে দখল করা না, বাইডেনেরও তেমন আসল উদ্দেশ্য ইউক্রেনকে সহযোগিতা করা না। তা না হলে পুতিন তিন দিক দিয়ে ইউক্রেনের মধ্যে সেনা ঢুকিয়ে দিলে তাদের রুখে দেওয়ার মতো কোনো শক্তি বা ক্ষমতা ইউক্রেনের নেই।
আবার বাইডেন যদি সত্যি সত্যি রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে বাঁচাতে চাইতেন তা হলে কাঁধ থেকে ছোড়া যায় এমন কিছু ট্যাংক বিধ্বংসী স্বল্পপাল্লার মিসাইল পাঠাতেন না ইউক্রেনে। তিনি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পাঠাতেন। যুদ্ধবিমান পাঠাতেন। যুদ্ধজাহাজ পাঠাতেন কৃষ্ণ সাগরে। বিমানবাহী রণতরী পাঠাতেন এজিয়ান সাগরে। হাজার হাজার ন্যাটো সেনা মোতায়েন করতেন ইউক্রেনে। কিন্তু সেগুলো করছেন না। ইউক্রেনকে এমন কিছু অস্ত্র দিচ্ছেন যা দিয়ে শুধু গেরিলাযুদ্ধ সম্ভব।রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ করলে তো দেশের অর্ধেক এমনিতেই রাশিয়ার অধীনে চলে যাবে।
আসলে এখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও হচ্ছে না। আর আমেরিকা, ন্যাটো বা ইউরোপ ইউক্রেনকে সাহায্য করতে ছুটেও আসছে না। আসল ঘটনা হচ্ছে ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়া এবং আমেরিকা নতুন কিছু দরকষাকষি করছে। নতুন কিছু চুক্তি করতে চাইছে। যে চুক্তিগুলো আসলে ইউক্রেনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না; তবে ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে। যেগুলো আগামীর বিশ্বে সামরিক, সাইবার এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনেক বিষয়কে সামনে নিয়ে আসবে। আগামীর বিশ্বের ক্ষমতা ভাগাভাগির দরকষাকষি হচ্ছে মূলত রাশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে। যেমনটি হয়েছিলো ১৯৬২ সালে কিউবাকে নিয়ে। তখন আমেরিকা কিউবাকে ঘিরে ফেলেছিল। কিন্তু রাশিয়া কিউবায় পারমাণবিক বোমা বহনকারী মিসাইল পাঠিয়েছিল যা আমেরিকার সবগুলো অঙ্গরাজ্যে আঘাত করতে সক্ষম। তখন মনে হচ্ছিল যে কিউবাতে আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবে। কিন্তু আমেরিকার একেবারে ঘরের পেছনে গিয়ে কিউবায় স্থাপন করা সেই রাশিয়ার মিসাইল সরানোর জন্য তখন এ দুই দেশের মধ্যে কিছু গোপন চিঠি চালাচালি হয় তখন এবং কিছু চুক্তি হয়। সেই চুক্তির মধ্যের একটি ছিল আমেরিকা তথা ন্যাটোর পক্ষ থেকে তুরস্কে স্থাপিত পারমানবিক অস্ত্র সরিয়ে নিতে হবে। এবং আমেরিকা তথা ন্যাটো রাশিয়ার উপর কোন ধরণের হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না।

আরও অনেক কিছু ছিল তখনকার সেই চুক্তির মধ্যে যেগুলো সরাসরি কিউবার সঙ্গে সম্পৃক্ত না। অর্থাৎ তখন কিউবাকে ইস্যু করে এই দুই পরাশক্তি নিজেদের মধ্যকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল।

তার পর অনেক জল গড়িয়েছে শীতল যুদ্ধ শেষ হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে অনেক নতুন দেশ গঠিত হয়েছে। আমেরিকা সেই নতুন দেশগুলোকে তার বলয়ে টানতে ন্যাটো নামের আকর্ষণ নিয়ে তাদের কাছে হাজির হয়েছে।

যদিও ১৯৯৭ সালে রাশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে একটা চুক্তি হয়। যেখানে আমেরিকা রাশিয়াকে নিশ্চয়তা দেয় যে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোকে ন্যাটোর মধ্যে নেবে না। আবার আরেকটা চুক্তি হয় এ ইউক্রেন, বেলারুশ আর কাজাখস্তানকে নিয়ে। যেখানে বলা হয় আমেরিকা, ব্রিটেন বা রাশিয়া এই তিন দেশের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব খাটাবে না। এ দেশগুলো স্বাধীনভাব তাদের বিদেশনীতি পরিচালনা করবে, যার সঙ্গে ইচ্ছা সম্পর্ক গড়বে। কিন্তু আমেরিকা বা রাশিয়া কেউ-ই সেই কথা রাখেনি।

আমেরিকা পূর্ব ইউরোপের সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোকে তার বলয়ে টানতে ন্যাটোর সদস্য করে নেয়। পূর্ব ইউরোপের শুধু বেলারুশ, মলডোভা এবং ইউক্রেন ছাড়া সব দেশই এখন আমেরিকার বলয়ে।

গত ১৮ জানুয়ারি ক্রিমিয়ার হাইওয়েতে রাশিয়ার একটি সশস্ত্র বহর। ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ১ লাখ সেনা সদস্য ভারি অস্ত্র ও ট্যাঙ্কসহ মোতায়েন করছে। ছবি: এপি
গত ১৮ জানুয়ারি ক্রিমিয়ার হাইওয়েতে রাশিয়ার একটি সশস্ত্র বহর। ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ১ লাখ সেনা সদস্য ভারি অস্ত্র ও ট্যাঙ্কসহ মোতায়েন করছে। ছবি: এপি

অন্যদিকে মলডোভা, বেলারুশ এবং কাজাখস্তান এখন পুরোপুরি রাশিয়ার বলয়ে চলে গেছে। এখন ইউক্রেন নিয়ে টানাটানি চলছে। রাশিয়া ইউক্রেনকে হাতছাড়া করতে চাইছে না। আবার আমেরিকা ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে চাইছে না। কিন্তু ইউক্রেন সেই ২০১৪ সালে রাশিয়ার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। এখন যদি ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হয়, তা হলে দেশটি পুরোপুরি রাশিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাবে।

এ জন্য পুতিন, ইউক্রেন সীমান্তে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে হুমকি দিচ্ছেন। তিনি শর্ত দিয়েছেন, যাতে ইউক্রেনকে পুরোপুরি পশ্চিমা বলয়ে না নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ন্যাটো সদস্য দেশে ভারি অস্ত্র মোতায়েন যেন না করে সে শর্তও দিয়েছেন আমেরিকাকে। এ ছাড়া কয়েকটি সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রর ন্যাটো সদস্যপদ বাতিল করার ও দাবি জানিয়েছে রাশিয়া।

যদিও ১৯৯৭ সালে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার সেই চুক্তির কারণেই রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ন্যাটো সদস্য দেশগুলোতে কোনো ভারি অস্ত্র মোতায়েন করছে না আমেরিকা। আমেরিকা মূলত ন্যাটোকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে তার বলয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এ রকম আরও অনেক ধরনের আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক জোট আছে যেগুলোকে ব্যবহার করে আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন দেশকে নিজের বলয়ে রাখার চেষ্টা করে। আর যখনই কোনো দেশ সেই বলয়ের বাইরে গিয়ে নিজের স্বার্থে কিছু করতে চায়, তখন বিভিন্ন অজুহাতে তার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

যাই হোক এখন ইউক্রেনকে নিয়ে রাশিয়া আসলে অনেক ভালো অবস্থানে আছে। এমনভাবে ঘিরে ধরেছে ইউক্রেনকে চাইলেই যে কোনো সময় আক্রমণ করতে পারবে এবং অনেক অংশ দখল করে নিতে পারবে। তখন না আমেরিকা, না ন্যাটো, না ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেউই রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। যদিও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু তাতে কি ইউক্রেন রক্ষা পাবে? পাবে না। যদিও ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাত থেকে রক্ষা করার আদৌ কোনো ইচ্ছা আমেরিকার আছে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আর রাশিয়াকে অর্থনৈতিক অবরোধ দিলে রাশিয়ার চেয়েও বেশি সংকটে পড়বে ইউরোপ। কারণ ইউরোপের জ্বালানির সিংহভাগ আসে রাশিয়া থেকে।

আমেরিকা যতই বলুক ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিনা দ্বিধায় তার পক্ষে আছে সেটিও সত্য না। আমেরিকার পর ন্যাটোর যে বড় শক্তিগুলো, তুরস্ক, জার্মানি, ফ্রান্স এরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো অবস্থানে যাবে না। জার্মানি তো সরাসরি না বলে দিয়েছে। এমনকি ন্যাটোর অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তাবেও ভেটো দিয়েছে। ফ্রান্সও একই পথে হাঁটছে। তুরস্কের তো এমনিতেই রাশিয়ার সঙ্গে কিছুটা হলেও সুসম্পর্ক আছে।

এ কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমেরিকা একদিকে ইউরোপ এবং ন্যাটোকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছে; অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দরকষাকষি করেছে। কিন্তু কোনোটাই সফল হয়নি। তাই এখন হার্ডলাইনে যাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

ইউক্রেন থেকে আমেরিকার দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেশছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও বলেছে তাদের ডিপ্লোম্যাটদের ইউক্রেন ছাড়তে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি বলেছে জানেন, বলেছে— তাদের ডিপ্লোম্যাটদের ইউক্রেন ছাড়ার দরকার নেই। যেখানে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে, সেখানে এত ড্রামার কি দরকার। যদিও ইউরোপ শেষ পর্যন্ত হয়তো আমেরিকা যা বলবে সেটিই করবে। এখন পর্যন্ত ইউরোপ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। আমেরিকা পূর্ব ইউরোপে নতুন যুদ্ধবিমান এবং ভারি অস্ত্র পাঠাচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশেও এই একই কাজ করছে। যুদ্ধের দামামা বাজছে। কিন্তু যুদ্ধ বাঁধছে না।

তবে ইউক্রেনের এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে জিইয়ে রেখে বিশ্বের অনেক বিষয় নিয়ে রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে অনেক ওপেন এবং গোপন চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। হতে পারে রাশিয়ার নিরাপত্তার গ্যারান্টি, হতে পারে তুর্কির ওপর থেকে আমেরিকার খবরদারি কমানো, হতে পারে গ্রিসে আমেরিকার ব্যাপক অস্ত্র বিক্রিতে কিছুটা বিরতি দেওয়া। হতে পারে ইরান নিয়ে, সিরিয়া নিয়ে বা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি। হতে পারে চীন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি। হয়তো আমেরিকা ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে চীনবিরোধী যুদ্ধে রাশিয়া যেন নিউট্রাল থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে চাইতে পারে। অথবা রাশিয়ার ইউক্রেন দখলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার কারণে হয়তো বাল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে জার্মানিতে যে গ্যাস পাইপলাইন নিচ্ছে রাশিয়া, সেখানে আমেরিকা কোনো ভেটো দেবে না। হয়তো হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার নিয়ে কোনো চুক্তি হতে পারে। হতে পারে মহাকাশ নিয়ে নতুন কোনো চুক্তি। অথবা মেটাভারস বা ক্রিপ্টো কারেন্সি নিয়েও কোনো চুক্তি হতে পারে। আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার নিয়েও চুক্তি হতে পারে। এর মধ্যে এলেই কোনোগুলো হতে পারে আমি জানি না। হয়তো বা এগুলোর বাইরে অন্য কোনো বিষয়েও চুক্তি হতে পারে। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে ইউক্রেনের এই উত্তেজনা আসলে ইউক্রেনের জন্য না। অন্য কোনো কিছুর জন্য।

আর এই উত্তেজনা নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধার সম্ভাবনা খুবই কম। নাই বললেই চলে। আপনাদের মনে থাকবে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ যখন রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল, তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিশাল হাঁকডাক ছেড়েছিলেন। বলেছিলেন যদি প্রমাণ হয়, বাশার আল আসাদ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে তা হলে তার বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে যাবেন। প্রমাণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনো ডাইরেক্ট অ্যাকশন তো দূরের কথা ইনডাইরেক্ট অ্যাকশনেও যেতে পারেননি। এমনকি তার পরেও বাসার আল আসাদ বহুবার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও ওবামা শুধু হাঁকডাক দিয়ে খ্যান্ত ছিলেন। পরে অবশ্য সেখানে আইএসআইএস কে লেলিয়ে দিয়ে মনোযোগ অন্যদিকে ডাইভারড করেছিলেন। যাক সে কথা। আমাদের দেশে একটা কথা আছে না— যত গর্জে তত বর্ষে না। ইউক্রেনেও বিষয়টি সে রকমই। দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়।

ও হ্যাঁ তুরস্কের রাষ্ট্রপতি অবশ্য প্রস্তাব দিয়েছেন মধ্যস্থতা করার। ইউক্রেন রাজি হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া গরিমসি করছে। তবে আমেরিকা তুরস্কের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটা সমঝোতা হলে সেটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের তথা এরদোয়ানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। যেটি অনেকেই চাইবে না। আর সত্যি সত্যিই যুদ্ধ বেঁধে গেলে তুরস্ক নিউট্রাল থাকার চেষ্টা করবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার স্বার্থে আঘাত আসে।

লেখক: সরোয়ার আলম

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর