,

IMG_20210804_155636

করোনা মহামারী কি মানব শুন্য করে দিবে পৃথিবীকে?

 ড. গোলসান আরা বেগমঃ সকাল থেকেই আকাশটা গোমরা মুখে অভিমান করে আছে। সূর্যটাকে ডেকে রেখেছে। পাহাড় ভাঙ্গা মেঘ উড়ছে আকাশে। এমন আলো ছায়া মাখা দিন পাশের বাসার লিলি ভাবির ভালো লাগে না। এক টানা ঘুমিয়ে থাকবে তাও পারে না।ছটফট করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর আমার বাসায় আসে আর যায়।

ছোট বাচ্চাদের সাথে লুডু খেলতে ইচ্ছে করেছে আমার। হাতের কাছে বাদাম বাজা,দই চিড়া খাবো, তার ব্যবস্থাও নেই। বৃস্টির গান বা কবিতা শুনতে মন চাইছে।বাসায় তারও আয়োজন নেই। কোন ছোট বা বড় বাবু নেই। কার সাথে খেলবো লুডু খেলা। ছুটে গেলাম রান্না ঘরে,বুয়াকে সাহায্য করতে। ততক্ষণে বুয়ার রান্না শেষ।কি কি রান্না করেছে তা দেখে, সেখান থেকেও ফেরৎ আসি।

ভাবতে থাকি, আচ্ছা বৃস্টিতে ভিজে গোসল করলে কেমন হয়। গত রাতে বেশ বেশ কয়েকটা চমৎকার কবিতা লিখেছি। মনটা ফুরফুরে লাগছে।কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। করোনার ভয়ে তাও পারছি না।

ছোট বেলায় আশ পড়শী শিশুদের সাথে বুস্টিতে ভিজে কাদা গোসল করে খুব মজা পাইতাম। শাপলা ফুল কাঁধে নিয়ে ভিজা কাপড়ে বাড়ি ফিরতাম।মায়ের বকুনী শুনলেও ভালো লাগতো। আহা, সে দিনগুলি কোথায় হারিয়ে গেলো। চার তলার সিড়ি বেয়ে ওঠে গেলাম ছাদে। আকাশ ভেঙ্গে বৃস্টি পড়ছে না,শুধু গুম গুম শব্দে গড়াগড়ি করছে আকাশ জুড়ে।

ভবনের উপরে রয়েছে বিরাট ছাদ বাগান। সিজনেল ফল, তরিতরকারি, শাকসবজি এখান থেকে খাই। আরো রয়েছে শতেক কবুতরের বাসা।এ সবের সমারোহ ঘটিয়েছে দাড়োয়ানকে নিয়ে আমার স্বামী।কবুতর গুলো যথন দল বেধে আকাশে উড়তে থাকে,তখন আমার স্বামীও ওদের সঙ্গী হয়ে আকাশে ভাসতে থাকে। খুব মজা পায় উড়াউড়ির দৃশ্য দেখে। তার এখন অবসর জীবন, কি আর করবে। বাগান, কবুতর, রোজা, নামাজ, ব্যায়াম, কোরআন কিতাব পড়ে সময় পাড় করে।

এমন সময় স্কুল জীবনের বান্ধবী ফোন করে।কি রে তুই কোথায় কি করছিস।আমি বলি – ছাদের উপরে বৃস্টিতে ভিজে গোসল করার চেষ্টা করছি।
ও বলতে লাগলো — না না তা করবি না।ঠান্ডা লাগবে।করোনা বা চিকনগুনিয়া জ্বর হবে। এই বয়সে জ্বর হলে মরে যাবি। আর শোন তোরে একটা কথা বলি — তুই কি মরবি না?

—-হা, মরবো তো অবশ্যই।হয়েছে কি তা বল।
— তুই ছবি আকিঁস কেন। ছবির জীবন দিতে পারবি? জানিস না, ছবি আঁকা পাপ।ছবি আর আকঁবি না।

অবুঝ শিশুর মতো বললাম — আচ্ছা ছবি আঁকবো না।প্রতিবাদ বা আমার পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করার রুচি হলো হলো না ।

যুক্তি দেখিয়ে কি হবে, এ দেশের মানুষ যারা বিশ্বাস করে চাঁদে রাজাকার যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর মুখ দেখা গেছে ,তাদের সাথে মতের মিল না থাকলেও তর্ক করে কোন লাভ হবে না। তারা ঘুরে ঘুরে সাপের গর্তেই ঢোকবে।

ছাদে কলা গাছ লাগানোর ব্যাপারে আমি স্বামীর সাথ দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। সে জেদ করে পাঁচটা কলা গাছ লাগিয়েছিলো। একটা গাছে ভালো কলা হয়েছিলো, অন্যগুলোতে কলা হলেও, খাওয়া যায় নাই।

একদিন ছবি তুলে ফেইজ বুক ফেইজে পোষ্ট দিয়েছিলাম।পেপে গাছের ফলন দেখে সবাই খুশী হয়েছিলো।

বান্ধবী বেবী ফোন করে পেপের বিচি চেয়েছিলো।এখন তিনি অ্যামেরিকায়ায় বসবাস করছেন। মেয়ের দিকের নাতি নিয়ে বেশ ফুর্তিতে আছে। ঘণ ঘণ নাতির ছবি ফেইজ বুকে পোষ্ট দিয়ে খুব মজা পায়,আনন্দ উচ্বাস ফিল করে।

ছাদে রয়েছে একটি বড় সাইজের আম গাছ।প্রতি বছর ফুল ধরলেও ফল আসে না।তবে পেপে গাছ থেকে প্রায় প্রতি দিন বেশ মজার পেপে খেয়ে আনন্দ পাই।ডালিম গাছে ডালিম হয় না। লেবু,পেয়ারা,কাটবাদাম গাছ বাগানের শুভা বৃদ্ধি করলেও ফল হয় না। যত্নের অভাবে ফুলের গাছগুলো তরতরিয়ে বাড়ছে না। বৃস্টি হলো না,শুধু অযথা সময় নষ্ট করে ফিরে এলাম বাসায়।

বুড়ু বয়সে আমার বন্ধু হাবিব খুব ভালো ছবি আকে।তা দেখে আমারও ইচ্ছে হয় ছবি আঁকতে।কিন্তু আঁকাআঁকির ১০% এর কাছাকাছি যেতে পারি না। নাক হলে, চোখ হয়না, ছবি যেন ভুতের আকার ধারন করে।অবশেষে কারো কথায় নয়, ইচ্ছে করেই ছবি আঁকা আপাতত বন্ধ রেখেছি।

এ দেশের অবুঝ ধমার্ন্ধরা তো কতো কথাই বলে। আমাদের দেশের শিল্প,সাহিত্য,সংস্কৃতিকে ধ্বংশ করার জন্য,দেশটিকে পেছনমুখী স্রোতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে, তাদের হেন তেন কূটকৌশলের অভাব নেই। আমারা উচ্চ শিক্ষিত প্রগতিশীল ধ্যান ধারার মানুষ, এ সমস্ত ধার্মান্ধবাজদের কথায় দেশটিতে ধ্বংস ডেকে আনবো?

পাশের বাসার লিলি ভাবী দুই কাপ চা নিয়ে আমাদের ড্রইং রুমে এসে বসলেন।আমাকে এক কাপ এগিয় দিযে গল্প জুড়ে দিলেন।আজকে টিভিতে কি সিরিয়াল দেখলেন, কি রান্না করেছেন।স্বামী সন্তান তা খেয়ে, কে কি মন্তব্য করলো, তাও বলতে ভুল করেননি। হাউজ ওয়াইফদের কথার ধরন এ রখমই হয়।

আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে গিয়ে বলি-ভাবী, আপনি কি রমিজ সাহেবকে চিনতেন।উনি তো মারা গেছেন ৩/৪ দিন হলো।করোনা হয়েছিলো। ভ্যান্টিলেটার সাপোর্টে যাওয়ার পর,ভয়ে স্ট্রোক করে মারা গেছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
লিলি ভাবী– আমরা যে ভালো মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলছি। পরবর্তীতে বাঁচবো কেমন করে।

আমি– উনার বাসায় গেলে সহসা আসতে পারতাম না।তিনি ছিলেন মুজিব আদর্শের লোক। আমাকে পেলেই গল্প জুড়ে বসিয়ে রাখতেন।
কোথায় মিটিং করেছেন,কার সাথে ছবি ওঠিয়েছন, কে কি রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে ইত্যদি বলতে বলতে কান গরম করে ফেলতেন।

ভাবী এবার বিদায় হলো। কারন রাজনৈতিক কথাবার্তা উনার ভালো লাগে না।আমি বেড রুমে ঢুকে স্বামীকে চিমটা চিমটি করে ঘুম ভাঙ্গাতে ব্যর্থ হই।গোসল সেরে খেতে বসি। এমন সময় লাল বাতির এস্বুলেন্স হর্ন বাজিয়ে মহল্লায় ঢুকছে। কোন রুগী বা লাশ কেরি করতে।আবার মসজিদের মাইকের মুখ থেকে ভ্যা ভ্যা করে মৃত্যু সংবাদি প্রচার করছে।যদিও কোন কথা বুঝা যাচ্ছে না। আঠার কোটি জনগনের বাংলাদেশ থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ২৫০০০ মানুষকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপরও করোনা শান্ত হয়নি। নাকের ডগায় ঘুরছে মানুষের, যে কোন সময়ে, যে কাউকে হৃদয়হীন করোনা টেনে নিবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ি পৃথিবী বাসি ঘর বন্দি জীবন যাপন করছে।কোথাও চলছে লক ডাউন। মানুষ দেহে ভ্যাকসিন টিকা নিচ্ছে করোনা প্রতিরোধে।অনুজীব করোনা সুপার পাওয়ারের খেলা খেলছে। মানুষকে প্রতিদিনই আক্রান্ত করছে ও পরপারে পাঠিয়ে দিচ্ছে।মানুষ মহা আতংকের মাঝে বসবাস করছে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর