ঢাকা ০৮:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১১ আগস্ট আমার জন্মদিন নয় আমি প্রথা-বিরোধী, প্রচলন-বিরোধী

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৪৪:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ অগাস্ট ২০২১
  • ২৩৪ বার

শরীফ সাদীঃ জীববিজ্ঞানের ছাত্র বলেই
আমি প্রচলিত জন্মদিন মানিনা।
সবাই ভুল জন্মদিন পালন করলেও আমি করিনা। কারন পৃথিবীর আলোয় আসার দিনটি শিশুটির জন্মদিন নয়।
তার জন্ম আরো আগেই,মাতৃজঠরে।
সেই ক্ষণ, সেই সময়, সেই দিন কারো কি জানা আছে?জানা নেই। তাই এ জন্মদিন বিজ্ঞানসম্মত নয়।
আমি প্রথা-বিরোধী। আমি প্রচলন-বিরোধী।

পৃথিবীতে আসার এ দিনটি
অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয়
এবং মহান মানুষদের এ দিনটি উদযাপনযোগ্য।
তবে উৎসব-উদযাপন কি
যে কোনো অনুল্লেখ্য
মানুষদের জন্য?
যারা পৃথিবীর জন্য,দেশের জন্য,মানুষের জন্য কল্যাণকর
কিছু করে গেছেন,
উৎসব হবে তাদের ভূমিষ্ঠ দিবসে।

১১ আগস্টের সেই সেদিন থেকে
সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখেছি
৪৩ হাজার ৮ শতবার,
সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছি ৬০বার।
উদীয়মান সূর্য আমার পছন্দ,
কিন্তু অস্তমান সূর্য পছন্দ নয়।
আনন্দ বেদনার এই
সুন্দর পৃথিবীতে আমার আগমনের জন্য সবচে কষ্ট করেছেন যিনি,
যার উদরে জন্ম আমার
যার কারণে উদয় আমার
সেই মা——
তাঁর প্রতি আকাশ যত বড়
তারচে’ বেশি অপরিমেয় ভালোবাসা
অসীম কৃতজ্ঞতা।
যার ঔরসে আমার পৃথিবী দেখা
সেই শুভ্রতার প্রতীক
সুউচ্চ পর্বতের মতো
বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষ,
আমাদের অহংকার
জনক-শিক্ষক
প্রয়াত আশরাফুদ্দীন মাস্টারের প্রতি
আমার সর্বোত্তম প্রণতি।
এই সবুজ-সজল গ্রহের
আলো-বাতাসে অবগাহনের
দক্ষিণা দাতাকে জানাই কৃতজ্ঞতা।

চারিদিকে এত রূপ-রস-ফুল
পাখির কলকাকলি
নদীর কুলু-ধ্বনি
“এতো শোভা এতো রূপ এতো
হাসি গান
ছাড়িয়া যাইতে মোর নাহি
চাহে মন-প্রাণ।”
দুঃখ আছে,কষ্ট আছে
তবু ৬০ পেরিয়েও
মন চায় আবার শুরু থেকে
শুরু হোক।

শীতের সকালে রোদেলা উঠোনে
আব্বার সাথে সব ভাই-বোন
একসাথে বসে নাস্তা খাওয়া–।
আবার শুরু হোক,
খাবার টেবিলে ইংরেজি বিষয়ের
নামকরা শিক্ষক,আমাদের আব্বা
খাদ্যের সাথে যেন বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, ইতিহাস, ভূগোল, সাধারণ জ্ঞানের উপাদেয় সালাদও গিলিয়ে দিচ্ছেন।
রাজনীতির যেটুকু পাঠ নিয়েছি
সেতো এই পারিবারিক আড্ডায়।
মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময়টিতে আমি ছোট, অত বুঝিনা। কিন্তু ‘৭০ দশকের প্রায় সবটুকু জুড়ে এবং ‘৮০ দশক প্রায় প্রতিদিনই বসেছে ঘরোয়া পার্লামেন্ট,নীরব দর্শকের মতো
দেখেছি এবং শুনেছি
বড়দা(ফজলে এলাহী,উপাধ্যক্ষ) মেজদা (শওকত আহ. আল ফারুক ব্যাংকার) মানিকদা(বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক) ও আব্বার তুমুল রাজনৈতিক আড্ডা, আলোচনা-পর্যালোচনা, কখনো কখনো তুমুল বিতর্ক। ‘৮০ দশকের শেষভাগ থেকে আব্বার সাথে তার নাতি সৌরভ-পরাগ-পিটার সুজন-পাবেল-শুভ-সৌধ-মনি-হিল্লোল-কল্লোল-নিলয়-বাবু-সুপ্তি-সোনি-কুন্তলা-রোদেলা এরা কেউ রাজনৈতিক, কেউ খোশ গল্পের আড্ডায় যুক্ত হয়ে যায়।
মনে হয় এরা আব্বার ক্যাডার বাহিনী।
না, আজকের তথাকথিত পেশীবাজ ক্যাডার নয়,বরং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ আব্বার তৈরি করা শিক্ষিত ক্যাডার,
“ভাষাসৈনিক প্রাক্তণ এমপি আশরাফ মাস্টার পাঠশালার” ক্যাডার বাহিনী ওরা।

The lap of mother was my first school. প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী কোনো স্কুলে পড়িনি। এখানেও প্রথামাফিক রইলাম না। তৃতীয় শ্রেণীতে স্কুল শুরু।
ভিত্ গড়ে দিয়েছিলেন একসময়ের
প্রাইমারি শিক্ষক আমার মা।
“আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে” বিদ্রোহী নজরুলের জাগরণধর্মী কবিতার মাধ্যমে ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন তিনি।
আমাদের পরিবারেও
একজন কাজলা দিদি ছিলো,
যিনি অকালে চলে গিয়েছিলেন।
যতীন্দ্র মোহন বাগচির “কাজলা দিদি” কবিতাটি আমাকে আর নায়লাকে(আমাদের সবার প্রিয় নাইলী)দুই পাশে শুইয়ে আম্মা
সুর করে পড়তেন।
বই ছাড়াই মুখস্ত হয়ে যেতো।
মুখস্ত করে যখন আমি কবিতাটি সবটুকু পড়ে শেষদিকে বলতাম,
“দিদির মত ফাঁকি দিয়ে
আমিও যদি লুকাই গিয়ে
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন
ক’রে রবে?
আমিও নাই–দিদিও নাই–কেমন মজা হবে!”
আম্মা তখন আমাদের হারিয়ে যাওয়া কাজলা দিদির জন্য (আরজু আপার জন্য) ডুকরে কেঁদে উঠতেন। আমি আর নাইলীও কাঁদতে থাকতাম।

এখনো আমার ইম্মিডিয়েট বড়
ভাইজানকে(শাকের ভাই) কিংবা আপাকে(শাহানা) জিজ্ঞেস করা হয়নি, তোমরাও কি কাজলা দিদির জন্য আমার মতো আম্মার সাথে কেঁদেছো?
আম্মা সেভাবেই পড়াতেন।
রসূলপুরে ভেন্নাপাতার ছানি
দেওয়া ঘরে বসবাস করা এবং
পেটটি ভরে খেতে না পাওয়া
জীর্ণ-শীর্ণ আসমানীদের দুঃখ কষ্টের
সাথে আমাদেরকে একাত্ব করে গড়ে তুলেছিলেন।
জসীম উদ্দিনের আসমানী কবিতা পড়েও কেঁদেছি অনেক।
“পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।”
আম্মা আমাদের মননে মমত্ববোধ নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন। তিনি বিষাদ সিন্ধুর কাহিনী শুনাতেন, কারবালার বিয়োগান্ত ইতিহাসকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলে ধরতেন। শিশুমন নির্মানের সবগুলো কৌশল আম্মা নিয়েছেন।
সাত/আট বছর বয়স পর্যন্ত অত বড় কাঁচের বোতলে কে সাগু-বার্লি-দুধ খেয়েছে জানিনা, কিশোরগঞ্জের নগুয়া এলাকার একটা মোটাসোটা “ভীম সাহেব”(বড়দা’র দেওয়া নাম) ফিডার লাগানো বোতল নিয়ে আয়ূব খানের করা নতুন আরসিসি রাস্তা দিয়ে হেঁটেছে আর খেয়েছে।
সেই ছেলেটি আজ বার্ধক্যে। ৬০ পেরুলো। নৈতিকতার যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন শিক্ষক বাবা এবং মা,
সেখান থেকে সরে যায়নি।
“মানুষের কল্যাণের চেষ্টা করবে, তোমার হাতে যেন কারো অকল্যাণ না হয়।”— বাবার সেই শিক্ষা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয়নি। জেনে শুনে কারো ক্ষতি করেনি, কাউকে ঠকায়নি।

আব্বা/আম্মা,
আপনাদের পবিত্র আত্মার কাছে বলছি— বিলাসিতার গড্ডালিকা স্রোতে গা ভাসাতে সুযোগসন্ধানী অপরাজনীতি করিনি। সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে অন্য অনেকের মতো নিজের ভাগ্য গড়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়িনি।
আপনি যা দিয়ে গেছেন– এডুকেশন, এ দিয়ে শিক্ষকতা,প্রিন্সিপাল, হ্যান্ডসাম বেতন-ভাতা, সেই সাথে রাজনীতির প্রাপ্তি সরকারি দায়িত্ব, এখানেও সম্মান এবং সম্মানী।
কারো পকেট না কেটে নীতি-নৈতিকতা বজায় রেখে সচ্ছলভাবেই চলতে পারছি। অস্বাভাবিক সম্পদশালী হয়ে ওঠার স্বপ্ন আপনি দেখাননি। পথ খোলা থাকলেও সে পথে হাটিনি।
আব্বা/আম্মা,
১১ আগস্টের এ দিন আপনাদের উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত খামে লিখছি।
কষ্টসহিষ্ণুতা এবং সন্তুষ্টির শিক্ষাটাও আপনাদের। পিতাকে ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে কারো কাছে নতজানু হতে দেখিনি। এমনকি যখন আমি সামরিক আইনে গ্রেফতার হয়ে ময়মনসিংহ কারাগারে ছিলাম,সেই সময়েও না। কাউকে তদবির করেননি। জেলখানায় আমাকে চিঠি লিখেছেন। সেই-যে আমার স্কুল জীবনে সক্রেটিস পড়াতেন, জেলখানার চিঠিতেও সক্রেটিসের সাজার কথা লিখে সাহস দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনের কথা বলে আমাকেও ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রেরণা দিয়েছেন।
তিনি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের কারাবন্দি,সে কথা স্মরণ করিয়ে মনোবল যুগিয়েছেন।
আব্বা,
আপনাকে দেখেছি, কোন শক্তির কাছে আপনি কখনো মাথা নত করেননি। আমিও কারো কাছে মাথা বিক্রি করতে পারবো না। আমাকে ফেলে দেওয়ার কত আয়োজন এখনো চলছে। রাজনীতি থেকে আমার নাম-নিশানা মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু ওরা পারবেনা। সাধারণ মানুষ আমার সাথে আছে। সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা ও দোয়া আছে আমার প্রতি।

আপনি এবং আম্মার দেওয়া প্রাথমিক শিক্ষা, সেই সাথে রাজনীতির বাতিঘর বঙ্গবন্ধুর দেওয়া আদর্শের পথ থেকে সরে যাইনি,সরে যাবোনা। অনেকেই আছে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে, আবার সুযোগ পেলেই লোভাতুর হয়ে আদর্শ-বিরোধী নোংরা নর্দমায় ডুব দেয়, চুরি-দুর্নীতি করে সম্পদশালী হয়ে ওঠে।

এ জীবনের প্রান্তিক সীমানায় দাঁড়িয়ে
১১ আগস্টের এ দিনে
দৃপ্তকন্ঠে ঘোষণা করছি,
আর তো ক’টা দিন– শ্বাস-প্রশ্বাসের বাকীটা সময়ও লড়াইয়ে আছি।
রাজনীতি শিক্ষানীতি সমাজনীতির বিদ্যমান অপসংস্কৃতির
বিরুদ্ধে যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
ততক্ষণ সুস্থ স্রোতধারা সৃষ্টির কাজ করে যাবো। ব্ল্যাক এন্ড পলিউটেড পলিটিক্সের বিরুদ্ধে হোয়াইট পলিটিক্সের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
অত:পর নি:শ্বাস বন্ধ হবে,নশ্বর দেহ বিলীন হবে, কিন্তু জীবন নি:শেষ হবে না।
আমি থাকবো। আমি পারস্যের কবি দার্শনিক জালালুদ্দিন রুমির মতো বলি, When I die, When my coffin is carried out, You must never think
I am missing this world.
Don’t shed any tears,
Don’t lament or feel sorry.
আমি কবি Robert Frost এর বিশ্বাস নিয়ে বলবো “But life —- it goes on. It always has, it always will. Don’t forget that.

জীবন কী পদ্ম-পাতার একটি
শিশির বিন্দু? না। এখানেও জীব বিজ্ঞান। জেনেটিক ইনহেরিটেন্স।
“জিন”। ‘জীবন’ –এর বংশানুক্রমিক ধারা। বাবা ও মায়ের এবং তাদের
পূর্ব পুরুষদের জিন(এটি জড় বা
মৃত সত্ত্বা নয়) আমরা বংশ-পরম্পরায়
বর্তমান প্রজন্মের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাচ্ছি। Life has no ending. Yet everything is endless. জীবন নি:শেষিত নয়। দেখা হবেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

১১ আগস্ট আমার জন্মদিন নয় আমি প্রথা-বিরোধী, প্রচলন-বিরোধী

আপডেট টাইম : ১২:৪৪:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ অগাস্ট ২০২১

শরীফ সাদীঃ জীববিজ্ঞানের ছাত্র বলেই
আমি প্রচলিত জন্মদিন মানিনা।
সবাই ভুল জন্মদিন পালন করলেও আমি করিনা। কারন পৃথিবীর আলোয় আসার দিনটি শিশুটির জন্মদিন নয়।
তার জন্ম আরো আগেই,মাতৃজঠরে।
সেই ক্ষণ, সেই সময়, সেই দিন কারো কি জানা আছে?জানা নেই। তাই এ জন্মদিন বিজ্ঞানসম্মত নয়।
আমি প্রথা-বিরোধী। আমি প্রচলন-বিরোধী।

পৃথিবীতে আসার এ দিনটি
অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয়
এবং মহান মানুষদের এ দিনটি উদযাপনযোগ্য।
তবে উৎসব-উদযাপন কি
যে কোনো অনুল্লেখ্য
মানুষদের জন্য?
যারা পৃথিবীর জন্য,দেশের জন্য,মানুষের জন্য কল্যাণকর
কিছু করে গেছেন,
উৎসব হবে তাদের ভূমিষ্ঠ দিবসে।

১১ আগস্টের সেই সেদিন থেকে
সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখেছি
৪৩ হাজার ৮ শতবার,
সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছি ৬০বার।
উদীয়মান সূর্য আমার পছন্দ,
কিন্তু অস্তমান সূর্য পছন্দ নয়।
আনন্দ বেদনার এই
সুন্দর পৃথিবীতে আমার আগমনের জন্য সবচে কষ্ট করেছেন যিনি,
যার উদরে জন্ম আমার
যার কারণে উদয় আমার
সেই মা——
তাঁর প্রতি আকাশ যত বড়
তারচে’ বেশি অপরিমেয় ভালোবাসা
অসীম কৃতজ্ঞতা।
যার ঔরসে আমার পৃথিবী দেখা
সেই শুভ্রতার প্রতীক
সুউচ্চ পর্বতের মতো
বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষ,
আমাদের অহংকার
জনক-শিক্ষক
প্রয়াত আশরাফুদ্দীন মাস্টারের প্রতি
আমার সর্বোত্তম প্রণতি।
এই সবুজ-সজল গ্রহের
আলো-বাতাসে অবগাহনের
দক্ষিণা দাতাকে জানাই কৃতজ্ঞতা।

চারিদিকে এত রূপ-রস-ফুল
পাখির কলকাকলি
নদীর কুলু-ধ্বনি
“এতো শোভা এতো রূপ এতো
হাসি গান
ছাড়িয়া যাইতে মোর নাহি
চাহে মন-প্রাণ।”
দুঃখ আছে,কষ্ট আছে
তবু ৬০ পেরিয়েও
মন চায় আবার শুরু থেকে
শুরু হোক।

শীতের সকালে রোদেলা উঠোনে
আব্বার সাথে সব ভাই-বোন
একসাথে বসে নাস্তা খাওয়া–।
আবার শুরু হোক,
খাবার টেবিলে ইংরেজি বিষয়ের
নামকরা শিক্ষক,আমাদের আব্বা
খাদ্যের সাথে যেন বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, ইতিহাস, ভূগোল, সাধারণ জ্ঞানের উপাদেয় সালাদও গিলিয়ে দিচ্ছেন।
রাজনীতির যেটুকু পাঠ নিয়েছি
সেতো এই পারিবারিক আড্ডায়।
মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময়টিতে আমি ছোট, অত বুঝিনা। কিন্তু ‘৭০ দশকের প্রায় সবটুকু জুড়ে এবং ‘৮০ দশক প্রায় প্রতিদিনই বসেছে ঘরোয়া পার্লামেন্ট,নীরব দর্শকের মতো
দেখেছি এবং শুনেছি
বড়দা(ফজলে এলাহী,উপাধ্যক্ষ) মেজদা (শওকত আহ. আল ফারুক ব্যাংকার) মানিকদা(বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক) ও আব্বার তুমুল রাজনৈতিক আড্ডা, আলোচনা-পর্যালোচনা, কখনো কখনো তুমুল বিতর্ক। ‘৮০ দশকের শেষভাগ থেকে আব্বার সাথে তার নাতি সৌরভ-পরাগ-পিটার সুজন-পাবেল-শুভ-সৌধ-মনি-হিল্লোল-কল্লোল-নিলয়-বাবু-সুপ্তি-সোনি-কুন্তলা-রোদেলা এরা কেউ রাজনৈতিক, কেউ খোশ গল্পের আড্ডায় যুক্ত হয়ে যায়।
মনে হয় এরা আব্বার ক্যাডার বাহিনী।
না, আজকের তথাকথিত পেশীবাজ ক্যাডার নয়,বরং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ আব্বার তৈরি করা শিক্ষিত ক্যাডার,
“ভাষাসৈনিক প্রাক্তণ এমপি আশরাফ মাস্টার পাঠশালার” ক্যাডার বাহিনী ওরা।

The lap of mother was my first school. প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী কোনো স্কুলে পড়িনি। এখানেও প্রথামাফিক রইলাম না। তৃতীয় শ্রেণীতে স্কুল শুরু।
ভিত্ গড়ে দিয়েছিলেন একসময়ের
প্রাইমারি শিক্ষক আমার মা।
“আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে” বিদ্রোহী নজরুলের জাগরণধর্মী কবিতার মাধ্যমে ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন তিনি।
আমাদের পরিবারেও
একজন কাজলা দিদি ছিলো,
যিনি অকালে চলে গিয়েছিলেন।
যতীন্দ্র মোহন বাগচির “কাজলা দিদি” কবিতাটি আমাকে আর নায়লাকে(আমাদের সবার প্রিয় নাইলী)দুই পাশে শুইয়ে আম্মা
সুর করে পড়তেন।
বই ছাড়াই মুখস্ত হয়ে যেতো।
মুখস্ত করে যখন আমি কবিতাটি সবটুকু পড়ে শেষদিকে বলতাম,
“দিদির মত ফাঁকি দিয়ে
আমিও যদি লুকাই গিয়ে
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন
ক’রে রবে?
আমিও নাই–দিদিও নাই–কেমন মজা হবে!”
আম্মা তখন আমাদের হারিয়ে যাওয়া কাজলা দিদির জন্য (আরজু আপার জন্য) ডুকরে কেঁদে উঠতেন। আমি আর নাইলীও কাঁদতে থাকতাম।

এখনো আমার ইম্মিডিয়েট বড়
ভাইজানকে(শাকের ভাই) কিংবা আপাকে(শাহানা) জিজ্ঞেস করা হয়নি, তোমরাও কি কাজলা দিদির জন্য আমার মতো আম্মার সাথে কেঁদেছো?
আম্মা সেভাবেই পড়াতেন।
রসূলপুরে ভেন্নাপাতার ছানি
দেওয়া ঘরে বসবাস করা এবং
পেটটি ভরে খেতে না পাওয়া
জীর্ণ-শীর্ণ আসমানীদের দুঃখ কষ্টের
সাথে আমাদেরকে একাত্ব করে গড়ে তুলেছিলেন।
জসীম উদ্দিনের আসমানী কবিতা পড়েও কেঁদেছি অনেক।
“পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।”
আম্মা আমাদের মননে মমত্ববোধ নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন। তিনি বিষাদ সিন্ধুর কাহিনী শুনাতেন, কারবালার বিয়োগান্ত ইতিহাসকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলে ধরতেন। শিশুমন নির্মানের সবগুলো কৌশল আম্মা নিয়েছেন।
সাত/আট বছর বয়স পর্যন্ত অত বড় কাঁচের বোতলে কে সাগু-বার্লি-দুধ খেয়েছে জানিনা, কিশোরগঞ্জের নগুয়া এলাকার একটা মোটাসোটা “ভীম সাহেব”(বড়দা’র দেওয়া নাম) ফিডার লাগানো বোতল নিয়ে আয়ূব খানের করা নতুন আরসিসি রাস্তা দিয়ে হেঁটেছে আর খেয়েছে।
সেই ছেলেটি আজ বার্ধক্যে। ৬০ পেরুলো। নৈতিকতার যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন শিক্ষক বাবা এবং মা,
সেখান থেকে সরে যায়নি।
“মানুষের কল্যাণের চেষ্টা করবে, তোমার হাতে যেন কারো অকল্যাণ না হয়।”— বাবার সেই শিক্ষা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয়নি। জেনে শুনে কারো ক্ষতি করেনি, কাউকে ঠকায়নি।

আব্বা/আম্মা,
আপনাদের পবিত্র আত্মার কাছে বলছি— বিলাসিতার গড্ডালিকা স্রোতে গা ভাসাতে সুযোগসন্ধানী অপরাজনীতি করিনি। সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে অন্য অনেকের মতো নিজের ভাগ্য গড়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়িনি।
আপনি যা দিয়ে গেছেন– এডুকেশন, এ দিয়ে শিক্ষকতা,প্রিন্সিপাল, হ্যান্ডসাম বেতন-ভাতা, সেই সাথে রাজনীতির প্রাপ্তি সরকারি দায়িত্ব, এখানেও সম্মান এবং সম্মানী।
কারো পকেট না কেটে নীতি-নৈতিকতা বজায় রেখে সচ্ছলভাবেই চলতে পারছি। অস্বাভাবিক সম্পদশালী হয়ে ওঠার স্বপ্ন আপনি দেখাননি। পথ খোলা থাকলেও সে পথে হাটিনি।
আব্বা/আম্মা,
১১ আগস্টের এ দিন আপনাদের উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত খামে লিখছি।
কষ্টসহিষ্ণুতা এবং সন্তুষ্টির শিক্ষাটাও আপনাদের। পিতাকে ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে কারো কাছে নতজানু হতে দেখিনি। এমনকি যখন আমি সামরিক আইনে গ্রেফতার হয়ে ময়মনসিংহ কারাগারে ছিলাম,সেই সময়েও না। কাউকে তদবির করেননি। জেলখানায় আমাকে চিঠি লিখেছেন। সেই-যে আমার স্কুল জীবনে সক্রেটিস পড়াতেন, জেলখানার চিঠিতেও সক্রেটিসের সাজার কথা লিখে সাহস দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনের কথা বলে আমাকেও ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রেরণা দিয়েছেন।
তিনি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের কারাবন্দি,সে কথা স্মরণ করিয়ে মনোবল যুগিয়েছেন।
আব্বা,
আপনাকে দেখেছি, কোন শক্তির কাছে আপনি কখনো মাথা নত করেননি। আমিও কারো কাছে মাথা বিক্রি করতে পারবো না। আমাকে ফেলে দেওয়ার কত আয়োজন এখনো চলছে। রাজনীতি থেকে আমার নাম-নিশানা মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু ওরা পারবেনা। সাধারণ মানুষ আমার সাথে আছে। সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা ও দোয়া আছে আমার প্রতি।

আপনি এবং আম্মার দেওয়া প্রাথমিক শিক্ষা, সেই সাথে রাজনীতির বাতিঘর বঙ্গবন্ধুর দেওয়া আদর্শের পথ থেকে সরে যাইনি,সরে যাবোনা। অনেকেই আছে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে, আবার সুযোগ পেলেই লোভাতুর হয়ে আদর্শ-বিরোধী নোংরা নর্দমায় ডুব দেয়, চুরি-দুর্নীতি করে সম্পদশালী হয়ে ওঠে।

এ জীবনের প্রান্তিক সীমানায় দাঁড়িয়ে
১১ আগস্টের এ দিনে
দৃপ্তকন্ঠে ঘোষণা করছি,
আর তো ক’টা দিন– শ্বাস-প্রশ্বাসের বাকীটা সময়ও লড়াইয়ে আছি।
রাজনীতি শিক্ষানীতি সমাজনীতির বিদ্যমান অপসংস্কৃতির
বিরুদ্ধে যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
ততক্ষণ সুস্থ স্রোতধারা সৃষ্টির কাজ করে যাবো। ব্ল্যাক এন্ড পলিউটেড পলিটিক্সের বিরুদ্ধে হোয়াইট পলিটিক্সের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
অত:পর নি:শ্বাস বন্ধ হবে,নশ্বর দেহ বিলীন হবে, কিন্তু জীবন নি:শেষ হবে না।
আমি থাকবো। আমি পারস্যের কবি দার্শনিক জালালুদ্দিন রুমির মতো বলি, When I die, When my coffin is carried out, You must never think
I am missing this world.
Don’t shed any tears,
Don’t lament or feel sorry.
আমি কবি Robert Frost এর বিশ্বাস নিয়ে বলবো “But life —- it goes on. It always has, it always will. Don’t forget that.

জীবন কী পদ্ম-পাতার একটি
শিশির বিন্দু? না। এখানেও জীব বিজ্ঞান। জেনেটিক ইনহেরিটেন্স।
“জিন”। ‘জীবন’ –এর বংশানুক্রমিক ধারা। বাবা ও মায়ের এবং তাদের
পূর্ব পুরুষদের জিন(এটি জড় বা
মৃত সত্ত্বা নয়) আমরা বংশ-পরম্পরায়
বর্তমান প্রজন্মের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাচ্ছি। Life has no ending. Yet everything is endless. জীবন নি:শেষিত নয়। দেখা হবেই।