,

2

শেষ মুহূর্তে পম্পেওর পররাষ্ট্র নীতি বাইডেনকে ভোগাবে

হাওর বার্তা ডেস্কঃ আগামীকাল অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন জো বাইডেন। সে হিসেবে আজই ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিন। বিদায়ের আগে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বেশ চাপেই আছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও কম যান না। তিনি বরাবরই ট্রাম্পের দেখানো পথে চলেছেন।

আর সে কারণেই মুখ বুজে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে রাজী হননি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অনুগত পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রধান সেনাপতি ছিলেন মাইক পম্পেও। শেষ দিনগুলোতে পররাষ্ট্র নীতিতে এমন কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত তিনি দিয়েছেন যা জো বাইডেনকে নিশ্চিতভাবে ভোগাবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতির কারণে গত চার বছরে বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও প্রভাব ক্ষুণ্ণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

গত কয়েক মাসে জো বাইডেন বার বার বলেছেন, বিশ্বে আমেরিকার ‘মর্যাদাপূর্ণ নেতৃত্ব’ প্রতিষ্ঠাই হবে তার পররাষ্ট্র নীতির প্রধান লক্ষ্য। এমন লোকজনকে তিনি তার পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছেন যারা ‘একলা-চলো’ নীতির বদলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী।

কিন্তু জো বাইডেনের জন্য সবকিছু হয়তো খুব একটা সহজ হবে না। কারণ ক্ষমতার শেষ দিকে চীন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে মাইক পম্পেও এমন কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যার পরিণতি জো বাইডেনকে ভোগ করতে হবে।

গত ১০দিনে পম্পেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। চীনের স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে তাইওয়ানের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ রাখার যে নীতি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করছিল তা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে চীন।

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছেন পম্পেও। যা নিয়ে জাতিসংঘ এবং ত্রাণ সংস্থাগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পরিষদে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তে ইয়েমেনে মানবিক দুর্যোগ ভয়াবহ রূপ নেবে।

যে দেশটির সাথে সম্পর্ক ভালো করতে জো বাইডেন বিশেষভাবে ইচ্ছুক সেই কিউবাকে হঠাৎ করে সন্ত্রাসে মদতদাতা রাষ্ট্রের তালিকায় ঢোকানো হয়েছে। ইরানে এখন আল কায়দা তাদের প্রধান ঘাঁটি তৈরি করেছে এই অভিযোগ তুলে পম্পেও বেশ কিছু শীর্ষ ইরানি নেতা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছেন। ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিয়ন্ত্রিত কিছু প্রতিষ্ঠানকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

চীনের সাথে বাণিজ্যিক এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা জো বাইডেনের না থাকলেও তিনি চীনের সাথে সম্পর্কে সুর বদলাতে আগ্রহী। ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তিতে ফেরা তার অন্যতম লক্ষ্য। ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বন্ধে প্রয়োজনে সৌদি আরবের ওপর চাপ তৈরির জন্য ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থী অংশের ভেতর থেকে বড় ধরনের চাপ রয়েছে তার ওপর। কিউবার সাথে বৈরিতা দূর করার ব্যক্তিগত ইচ্ছা রয়েছে জো বাইডেনের।

কিন্তু বেছে বেছে মাইক পম্পেও শেষ বেলায় ঠিক এসব জায়গাতেই হাত দিয়েছেন। এছাড়া শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই ক্ষান্ত হননি পম্পেও। গত কয়েকদিন ধরে তিনি এমন সব বিবৃতি দিচ্ছেন যার প্রধান বক্তব্য হচ্ছে ডেমোক্র্যটরা আগেও তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে আমেরিকার স্বার্থ দেখেনি এবারও দেখবে না।

যেমন, ওবামা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির পুরনো একটি ভিডিও তিনি টুইটারে পোস্ট করেছেন যেখানে কেরি বলছেন যে, ফিলিস্তিন নিয়ে ছাড় না দিলে আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবেনা। ওই ভিডিও পোস্টের সাথে পম্পেও লিখেছেন, ‘এই মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞকে চীনে রাখুন! তিনি যেটা হবেনা বলেছিলেন আমরা তা করে দেখিয়ে দিয়েছি।’

গত সপ্তাহে পম্পেও তার আরেক টুইটে বলেন, জাতিসংঘে সবচেয়ে বেশি তহবিলের যোগানদাতা হিসাবে আমি মার্কিন করদাতা এবং আমেরিকার স্বার্থ দেখেছি। টুইটের সাথে তিনি একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে বারাক ওবামা, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুজান রাইস এবং জাতিসংঘে তৎকালীন মার্কিন সামান্থা পাওয়ার রয়েছেন। জো বাইডেনের সরকারেও সুজান রাইস এবং সামান্থা পাওয়ার জায়গা পেয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে ট্রাম্প সরকারের শেষ মুহূর্তের এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে কী করতে পারেন জো বাইডেন? তার সামনে বিকল্প কী? বাইডেনের উপদেষ্টা শিবির থেকে বলা হচ্ছে, পম্পেওর এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সহজেই এগুলো উল্টে দেয়া সম্ভব।

বারাক ওবামা সরকারের সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা বিভাগে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন শীর্ষ আইনজীবী অ্যাডাম স্মিথ। তাকে উদ্ধৃত করে লন্ডনের টাইমস পত্রিকা লিখেছে আইনগতভাবে পম্পেওর এসব নির্দেশনা সবই উল্টে দেওয়া সম্ভব কারণ এগুলো তার মতে নির্বাহী আদেশ যা প্রেসিডেন্ট পাল্টে দিতে পারেন।

তবে তিনি বলেন, বাতিল করার আগে এসব সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে হবে যে কাজে অনেক সময় লাগতে পারে। শুধু যে কালক্ষেপণ হবে তাই নয়, এগুলো বদলাতে গেলে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে পারেন জো বাইডেন।

নভেম্বরের নির্বাচনে জো বাইডেন ফ্লোরিডায় কিউবান-অমেরিকানদের সমর্থন তেমন পাননি। ফলে কিউবার ওপর বসানো ‘সন্ত্রাসে মদতদাতার’ তকমা ওঠাতে তাকে দশবার ভাবতে হবে। তাইওয়ানের সাথে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুনঃ:স্থাপনের সিদ্ধান্ত বদলানোর ক্ষেত্রেও একইরকম দ্বিধায় পড়তে পারেন তিনি। কারণ চীনকে শায়েস্তা করার ইস্যুতে কংগ্রেসে দুই দলের মধ্যে এক ধরণের ঐক্যমত্য রয়েছে।

সাহস করে মাইক পম্পেওর শেষ মুহূর্তের এসব সিদ্ধান্তের কিছুটা হলেও হয়তো বাইডেন উল্টে দিতে পারবেন বা দেবেন। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, আস্থার সঙ্কটই হবে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় সমস্যা। ইরান এবং অন্য দেশগুলো বাইডেনের সাথে নতুন কোনো চুক্তি করতে এখন দু’বার ভাববে কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখিয়েছেন কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিও রাতারাতি উল্টে ফেলা যায়।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর