,

19

গৃহবধূ থেকে সফল ফুলচাষি

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সাতক্ষীরার মেয়ে সাজেদা বেগম। জীবন যুদ্ধে হার না মানা সাজেদা বেগম এখন একজন সফল ফুলচাষি। বর্তমানে আত্মপ্রত্যয়ী এ নারীর সফলতা ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত যশোরের গদখালি-পানিসারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

সাতক্ষীরা পৌর এলাকার পারকুখরালী সরদার পাড়ার যার জন্ম ১৯৮৪ সালে। সাত ভাই-বোনদের মধ্যে ষষ্ঠ সন্তান সাজেদা বেগম। তার বাবা আতিয়ার সরদার ও মা আকিমন বেগম।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করা সাজেদা বেগমের ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে হয় যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি ইমামুল হোসেনের সঙ্গে। মোটামুটি ভালোই চলছিল তাদের সংসার। বিয়ের প্রায় আট বছর পর ২০০৪ সালে বাড়ির সামনের শিশুগাছ থেকে পড়ে ইমামুল হোসেনের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি।

সাজেদা বেগম বলেন, অসুস্থ স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ হলেও আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায় তিনি। স্বামীর চিকিৎসায় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ি। এরপর ধার-দেনা করে স্বামীর অনুপ্রেরণা ও তার ফুলচাষের অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শকে পুঁজি করে নিজেদের ১০ কাঠা জমিতে শুরু করি জারবেরা ফুল চাষ।

এতে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা। পাঁচ মাস পরেই প্রায় ৮০ হাজার টাকার জারবেরা ফুল বিক্রি করেন তিনি। ফুল চাষে এমন লাভ হওয়ায় উৎসাহ বেড়ে যায় তার। আত্মপ্রত্যয়ে আর পেছনে ফিরে তাকাননি তিনি। নিরলস পরিশ্রমের সঙ্গে পারিবারিক দায়বদ্ধতা ধীরে ধীরে ফুল চাষে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন গৃহবধূ সাজেদা বেগম।

তিনি জানান, নারী হিসেবে সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে ফুলচাষি জীবনের শুরুর ওই বছরই আরো দুই বিঘা জমিতে গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা ফুলের চাষ শুরু করেছিলাম। এখন পাঁচ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ফুল চাষ ছাড়াও ড্রাগন, ধান, পাট, শর্ষে ও সবজি চাষ করছি। জারবেরা ফুল উৎপাদনের জন্য তিনটি সেড তৈরি করেছেন তিনি।

যা আম্পান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে দুটো সেড জোড়াতালি দিয়ে ঠিকঠাক করে ফুলচাষ শুরু হয়েছে। আম্ফান ঝড়ের আগে ১৫ কাঠা জমিতে রজনীগন্ধা, দেড় বিঘা জমিতে জারবেরা, এক বিঘা জমিতে গাঁদা, ১০ কাঠা জমিতে গ্লাডিওলাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ করেন।

সাজেদা বেগম জানান, তখন পাঁচ বিঘা জমিতে নানা জাতের ফুল চাষ করে খরচ বাদে মাসিক আয় হতো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এ আয় দিয়ে বড় অনার্সপড়ুয়া বড় মেয়ে তানিয়া ইয়াসসিন ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে মাইনুল ইসলাম জয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে ভালোই চলছে সংসার।

তিনি বলেন, স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর যখন সংসারের হাল ধরি তখন বসতঘর ছিল খড়ের। এখন স্বামী সন্তানদের নিয়ে ইটের বসতবাড়িতে থাকতে পারছি। তাছাড়া নিজের সংসার দেখাশোনার পাশাপাশি ফুলের জমিতে দৈনিক পাঁচজন শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে সংগ্রামী এ নারীর নিবিড় পরিচর্যায় ক্ষেতজুড়ে বাহারি ফুলের সমারোহ। রঙিন ফুলে ফুলে সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। মুছে গেছে দরিদ্রতার দুঃসহ স্মৃতি। তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ফুল বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে মে মাসে হানা দেয় ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ফুল ক্ষেতের সেড লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এ সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন সাজেদা বেগম। নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সাজেদা বেগম বলেন, ফুল চাষ করে সংসার খরচ ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ভালোই যাচ্ছিল। করোনাভাইরাস ও আম্ফান ঝড় সবকিছু উল্টোপাল্টা করে দিয়েছে। পাঁচ-ছয় মাস ধরে আমরা খুব বিপদে আছি। ফুলের সেড নষ্ট হয়ে গেছে। ভেঙে পড়া শেডগুলো পুরোপুরি মেরামত করতে হলে অনেক টাকা লাগবে। এতো টাকা পাব কোথায়? টাকার অভাবে শ্রমিককে মজুরি দিয়ে কাজ করাতে পারছি না। তাই স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তানদের সহযোগিতায় ফুলের সেড মেরামত করেছি। সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ দেয় তাহলে আমাদের মতো চাষিরা উপকৃত হবেন বলে জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর