ঢাকা ০৭:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৩৪:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অগাস্ট ২০১৮
  • ৪৫৫ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কৈশোর বয়সে আমরা যখন লেখাপড়াসহ অন্যান্য কাজে ঢিলেমি করতাম তখন আমাদের মুরব্বিরা এই বলে উপদেশ দিতেন- ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’। গ্রামীণ এই প্রবাদটির মর্মার্থ ওই বয়সে না বুঝলেও পরবর্তী সময়ে বুঝেছি। অর্থাৎ সময়ের কাজ সময়ে না করলে তা আর হয়ে ওঠে না। আর হলেও তার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।

ব্যক্তি, সমাজ, রাজনীতি- সব ক্ষেত্রে প্রবাদটি সমভাবে প্রযোজ্য।

আমাদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা ধরা যাক। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে আমরা যে বাঙালি তা টের পেলাম যখন আমাদের মায়ের ভাষার ওপর আঘাত এল। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে সেদিন ছাত্রসমাজ মিছিল না বের করলে আমাদের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা হতো না।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা না করলে পাকিস্তানিদের দ্বারা আমরা যে শোষিত-বঞ্চিত হচ্ছি তা আমরা জানতেই পারতাম না।

৭০-এর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রয়াত মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সাহেবের সেই স্লোগান ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ বিশ্বাস করে যদি জাতির জনক অগ্রসর হতেন, তাহলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হতো?

ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির জনক সমগ্র জাতির ম্যান্ডেট নিয়ে ধীরে ধীরে তিনি আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করলেন এবং সময়মতো স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন।

সমগ্র জাতি তার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ স্বাধীন করল এবং বিশ্ব আমাদের স্বীকৃতি দিলেন।

জাতির জনক সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পেরেছিলেন বলে আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক।

আবার সময়ের কাজ সময়মতো না করলে যে রাজনীতিতে অনেক বড় খেসারত দিতে হয় সেটাও আমরা দেখেছি।

গ্রামীণ যে প্রবাদটি নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, এবার সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করি।

আমার জানি, যেকোনো দুর্ঘটনার মৃত্যুই মর্মান্তিক। তারপরও কিছু কিছু দুর্ঘটনার মৃত্যু সবার হৃদয়কে ব্যথিত করে।

এমনি এক দুর্ঘটনায় গত ২৯ জুলাই ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে ফুটপাতে বাসের জন্য অপেক্ষামাণ দুই মেধাবী শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়ার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।েআহত হয় আরও অনেকে। এ ঘটনা তাদের সহপাঠীসহ সমগ্র জাতির হৃদয়কে ব্যথিত করেছে।

কিন্তু তার চেয়েও বেশি ব্যথিত হলো পরিবহন শ্রমিকদের প্রধান নেতা ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের হাস্যোজ্জল মন্তব্যে। যদিও সড়ক পরিবহন তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, তারপরেও শ্রমিক নেতা এবং সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে তার ওই হাস্যোজ্জ্বল মন্তব্য কেউ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি।

এ জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভর্ৎসনাও শুনেছেন বলে পত্রিকান্তরে খবর বেরিয়েছে।

পত্রিকান্তরেই গত বুধবার খবর বেরিয়েছে, মন্ত্রী শাজাহান খান মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যাওয়া দিয়ার বাসায় গিয়ে শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং সেদিনের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী মহোদয় যদি তিন দিন আগে রোববারই রাজীব ও দিয়ার বাসায় গিয়ে শোকাহত পরিবার দুটিকে সান্ত্বনা বা সমবেদনা জানাতেন এবং বাসচালকদের কঠোর শাস্তির কথা বলতেন তাহলে আজকের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়’ গ্রামীণ প্রবাদটি যে সর্বক্ষেত্রে এখনো ধ্রুব সত্য তা উপলব্ধি করতে মাননীয় নৌমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খানের সেদিন হয়তো স্মৃতিভ্রম ঘটেছিল।

লেখক: সাবেক কমান্ডার, মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়

আপডেট টাইম : ১২:৩৪:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অগাস্ট ২০১৮

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কৈশোর বয়সে আমরা যখন লেখাপড়াসহ অন্যান্য কাজে ঢিলেমি করতাম তখন আমাদের মুরব্বিরা এই বলে উপদেশ দিতেন- ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’। গ্রামীণ এই প্রবাদটির মর্মার্থ ওই বয়সে না বুঝলেও পরবর্তী সময়ে বুঝেছি। অর্থাৎ সময়ের কাজ সময়ে না করলে তা আর হয়ে ওঠে না। আর হলেও তার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।

ব্যক্তি, সমাজ, রাজনীতি- সব ক্ষেত্রে প্রবাদটি সমভাবে প্রযোজ্য।

আমাদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা ধরা যাক। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে আমরা যে বাঙালি তা টের পেলাম যখন আমাদের মায়ের ভাষার ওপর আঘাত এল। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে সেদিন ছাত্রসমাজ মিছিল না বের করলে আমাদের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা হতো না।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা না করলে পাকিস্তানিদের দ্বারা আমরা যে শোষিত-বঞ্চিত হচ্ছি তা আমরা জানতেই পারতাম না।

৭০-এর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রয়াত মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সাহেবের সেই স্লোগান ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ বিশ্বাস করে যদি জাতির জনক অগ্রসর হতেন, তাহলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হতো?

ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির জনক সমগ্র জাতির ম্যান্ডেট নিয়ে ধীরে ধীরে তিনি আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করলেন এবং সময়মতো স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন।

সমগ্র জাতি তার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ স্বাধীন করল এবং বিশ্ব আমাদের স্বীকৃতি দিলেন।

জাতির জনক সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পেরেছিলেন বলে আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক।

আবার সময়ের কাজ সময়মতো না করলে যে রাজনীতিতে অনেক বড় খেসারত দিতে হয় সেটাও আমরা দেখেছি।

গ্রামীণ যে প্রবাদটি নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, এবার সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করি।

আমার জানি, যেকোনো দুর্ঘটনার মৃত্যুই মর্মান্তিক। তারপরও কিছু কিছু দুর্ঘটনার মৃত্যু সবার হৃদয়কে ব্যথিত করে।

এমনি এক দুর্ঘটনায় গত ২৯ জুলাই ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে ফুটপাতে বাসের জন্য অপেক্ষামাণ দুই মেধাবী শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়ার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।েআহত হয় আরও অনেকে। এ ঘটনা তাদের সহপাঠীসহ সমগ্র জাতির হৃদয়কে ব্যথিত করেছে।

কিন্তু তার চেয়েও বেশি ব্যথিত হলো পরিবহন শ্রমিকদের প্রধান নেতা ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের হাস্যোজ্জল মন্তব্যে। যদিও সড়ক পরিবহন তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, তারপরেও শ্রমিক নেতা এবং সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে তার ওই হাস্যোজ্জ্বল মন্তব্য কেউ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি।

এ জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভর্ৎসনাও শুনেছেন বলে পত্রিকান্তরে খবর বেরিয়েছে।

পত্রিকান্তরেই গত বুধবার খবর বেরিয়েছে, মন্ত্রী শাজাহান খান মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যাওয়া দিয়ার বাসায় গিয়ে শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং সেদিনের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী মহোদয় যদি তিন দিন আগে রোববারই রাজীব ও দিয়ার বাসায় গিয়ে শোকাহত পরিবার দুটিকে সান্ত্বনা বা সমবেদনা জানাতেন এবং বাসচালকদের কঠোর শাস্তির কথা বলতেন তাহলে আজকের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়’ গ্রামীণ প্রবাদটি যে সর্বক্ষেত্রে এখনো ধ্রুব সত্য তা উপলব্ধি করতে মাননীয় নৌমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খানের সেদিন হয়তো স্মৃতিভ্রম ঘটেছিল।

লেখক: সাবেক কমান্ডার, মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড।