হাওর বার্তা ডেস্কঃ শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত। এ স্লোগান ধারণ করে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-জনপদ চরকাজল ও চরবিশ্বাসে শুরু হয়েছে ‘মিনিগ্রীডের’ মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে বিদ্যুত সুবিধা পৌঁছে দেয়ার কাজ। সৌর শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে আলোকিত করা হচ্ছে গ্রামের বাড়িঘর, দোকানপাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাপনা। সরকারী অর্থায়নে একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা এরই মধ্যে ১০০ কিলোওয়াটের একটি সোলার মিনিগ্রীড বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন করেছে এবং পরীক্ষামূলক বিদ্যুত সরবরাহ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে আরও একটি বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
পটুয়াখালী জেলায় যে কয়েকটি ইউনিয়ন মূল ভূন্ডখ- থেকে সম্পূর্ণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তারমধ্যে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়ন দু’টি অন্যতম। সাড়ে আট কিলোমিটার প্রশস্ত বুড়াগৌড়াঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদী প্রাচীন এ দ্বীপ ইউনিয়ন দু’টিকে যথেষ্ট দুর্গম করে তুলেছে। আর এ দুর্গমতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নে বিদ্যুত সুবিধা পৌঁছবে, তেমন সম্ভাবনা খুব কম। এখনও এলাকার বাসিন্দা লক্ষাধিক মানুষের কাছে আলো মানেই কেরোসিনের কুপিবাতি কিংবা হারিকেনই ভরসা। যদিও মাঝে মধ্যে সোলার সিস্টেম রয়েছে, তবে তা সীমিত অবস্থাপন্নদের মাঝে। এ অবস্থায় সৌর শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এগিয়ে এসেছে গ্রীন হাউসিং এ্যান্ড এনার্জি লিমিটেড নামের একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড অর্থাৎ ইডকলের অর্থ সহায়তায় বেসরকারী এ সংস্থা এতোমধ্যে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের উত্তর চরবিশ্বাস গ্রামে স্থাপন করেছে ১শ’ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার সিস্টেম মিনিগ্রীড বিদ্যুত কেন্দ্র। গত আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুত কেন্দ্রটি চালু হয়েছে। দৈনিক চার ঘণ্টা করে ৩০টি পরিবারকে বিদ্যুত সুবিধা দেয়া হচ্ছে। শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হবে। তখন এ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৮-২০ ঘণ্টা বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে চরকাজল ইউনিয়নে আরেকটি একই ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার সিস্টেম মিনিগ্রীড বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের কাজ বেশ জোরেশোরে চলছে। যা আগামী মাস তিনেকের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
উত্তাল বুড়াগৌরাঙ্গ নদ পারি দিয়ে চরকাজল লঞ্চঘাট থেকে বিটুমিন কার্পেটিং সড়ক ধরে চরবিশ্বাস যেতে চোখে পড়ে রাস্তার পাশে স্থাপন করা হচ্ছে বিদ্যুতের খুঁটি। টানা হচ্ছে বিদ্যুতের তার। কয়েক মাস আগেও এ দৃশ্য এলাকার মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়। এখন তা বাস্তব। আর এ দৃশ্যে বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না এলাকাবাসীর। ওই পথ ধরে মোটরসাইকেলে আরও কিছুটা এগোতেই উত্তর চরবিশ্বাস গ্রামে প্রবেশ মুখে চোখে পড়ে খোলা আকাশের নিচে সারি সারি সোলার প্যানেল। যাতে সূর্যের আলো ঝিলিক দেয় চোখেমুখে। রাস্তা লাগোয়া ছোট্ট পাকা ভবনে বেসরকারী সংস্থাটির কার্যালয়। এর একটি কক্ষে ব্যাটারির সারি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা হয় সৌরশক্তি। যা বিদ্যুতে রূপান্তর করে সরবরাহ করা হচ্ছে।
গ্রীন হাউসিং এ্যান্ড এনার্জি লিমিটেডের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আবুল হোসেন সুজন প্রকল্পটির আদ্যপান্ত জানিয়ে বলেন, দুর্গমতার কারণে আগামী ২০ বছরে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নে জাতীয় গ্রীডের বিদ্যুত পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। এনিয়ে অনেক স্টাডি করা হয়েছে। এরপরই সোলার সিস্টেমে বিদ্যুত সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত’ এ সেøাগান বাস্তবে রূপ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এরপরেও যদি জাতীয় গ্রীডের বিদ্যুত আসে তবে এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুত সরকারের কাছেই বিক্রি করা হবে। প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, এ মিনিগ্রীড থেকে চাহিদার ভিত্তিতে ৩৫০ থেকে ৫৩০টি পরিবারকে বিদ্যুত সুবিধা দেয়া হবে। প্রতিটি সংযোগে প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করা হবে। প্রাকৃতিক কোন কারণে সোলার সিস্টেমে সমস্যা হলে ব্যাকআপ হিসেবে জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে। এর সাহায্যে বিদ্যুত সরবরাহ চালু রাখা হবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ টাকা। প্রতিটি সংযোগের জন্য অফেরতযোগ্য তিন হাজার টাকা দিতে হবে। প্রকল্পের অপর কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, প্রথম পর্যায়ে ৩০টি পরিবারকে বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরে বাকি সংযোগ দেয়া হবে।
প্রত্যন্ত দুর্গম এ জনপদে সোলার সিস্টেমে বিদ্যুত সরবরাহের উদ্যোগ এলাকার মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। গৃহবধূ শাওলা বেগম জানান, বিদ্যুত আসায় রাতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় খুবই সুবিধা হয়েছে। রাত জেগে পড়াশোনায় আগ্রহ বেড়েছে। জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু বকর জানান, এক বছর আগেও ভাবা যায়নি প্রত্যন্ত এ গ্রামে বিদ্যুত আসবে। কিন্তু এখন সে স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। যা অকল্পনীয় একটি বিষয়। স্থানীয় দোকানদার খলিল জানান, এখন অনেক রাত পর্যন্ত দোকানে বেচাকেনা চলে। গাঁয়ের মানুষের আঁধার ভীতি কেটে গেছে। চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোফাজ্জেল হোসেন বাবুল মুন্সি বলেন, এলাকায় এ ধরনের আরও কয়েকটি মিনিগ্রীড স্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। যা কাজে লাগানো যেতে পারে। মানুষ বিদ্যুত নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। তবে বিদ্যুতের দাম অতিরিক্ত নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকার এ ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিতে পারে। এতে গ্রামীণ মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে। গ্রামের সাধারণ মানুষের অনেকেই দাম নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে পল্লী বিদ্যুতের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম হওয়ায় তা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। এরপরেও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছে, এটিই আপাতত মানুষের সান্ত¡না এবং খুশির বিষয়। বিদ্যুতের আলোয় ঘটেছে প্রাণের সঞ্চার।
কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পটুয়াখালীর সাগরপাড়ের রাঙ্গাবালী উপজেলার বাহেরচর ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নে আরও দু’টি মিনিগ্রীড বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব দুর্গম এলাকা বিশেষ করে যেখানে জাতীয় গ্রীডের বিদ্যুত আপাতত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, সেসব এলাকায় এ ধরনের সোলার সিস্টেম মিনিগ্রীড বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন করা হবে এবং প্রান্তিক মানুষকে বিদ্যুত সুবিধা দেয়া হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানো হবে।
– See more at: http://www.dailyjanakantha.com/details/article/299260/%E0%A6%B8%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%AE-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%AE-%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%80%E0%A6%AA-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%9E%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0#sthash.qqWGAGQQ.dpuf
Reporter Name 

























