ঢাকা ০৮:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাখিকে ভালোবেসে যার কেটে যায় সারা বেলা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৮:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
  • ৪৬১ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ পেশায় শিক্ষক হলেও তার সারা অঙ্গ-প্রতঙ্গে বিরাজমান পাখির প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও ভালো লাগা। পাখিকে ভালোবেসেই যার কেটে যায় সারা বেলা। চলনে বলনে অত্যন্ত সাদাসিধে এই হ্যাংলা পাতলা ঘরনের মানুষটি ঘরে-বাইরে, রাস্তায় কি প্রতিষ্ঠানে যেখানেই থাকেন না কেন, যদি শুনেন বা দেখেন কোনো পাখি রাস্তায়, ক্ষেত খামারে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, তখন আর তাকে আটকে রাখার সাধ্য কার। তিনি সব কাজ ফেলে সেখানে যাবেন। পিতা-মাতার মমতা দিয়ে অসুস্থ পাখিটিকে উঠিয়ে আনবেন নিজের ঘরে। যতদিন না পাখিটি সুস্থ হয়ে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় ডানা মেলে উড়তে পারছে ততদিন তিনি তাকে লালন-পালন করবেন। এ সময়ে আপন সন্তানের যত নেয়ারও সময় পান না তিনি। ধ্যান জ্ঞান অসুস্থ পাখিটিকে সুস্থ করা নিয়ে। পরে সুস্থ পাখিটিকে অবমুক্ত করে দিয়েই তৃপ্তি অনুভব করেন তিনি। তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন মনের অজান্তে। লাভ করেন অনাবিল প্রশান্তি। এমনি করেই এ পর্যন্ত তিনি অবমুক্ত করেছেন ৩৫০টি পাখিকে। তাই তো এলাকাবাসী তাকে ডাকে পাখি বন্ধু হিসেবে। কৃষক বন্ধু হিসেবেও স্বীকৃত রয়েছে তার।

কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের সন্তান অধ্যাপক মতিন সৈকত। বাবা মৃত কেরামত আলী ও মাতা মৃত শাহানারা বেগম। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক মতিন সৈকতের স্ত্রী জাহানারা বেগম একজন গৃহিণী। তিনি দাউদকান্দি পীরচর আতিকিয়া সিনিয়র আলিম মাদরাসার বাংলা বিভাগের শিক্ষক। দাউদকান্দি উপজেলা প্লাবণভূমিতে মাছ চাষের মডেল এখন সারাদেশে। জল যেখানে মাছ সেখানে। চিল, ঈগল, বক, পানকৌড়ি, পরিযায়ীসহ বহু পাখির প্রধান খাদ্য মাছ হওয়ায় এখানে হাজারো পাখির বসবাস। মৎস্য খামারিরা চাষের ছোট মাছকে রক্ষার জন্য জাল এবং সুতা দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে রাখে। এতে অনেক পাখি আটকে আহত হয়ে ঝুলে থাকে। কখনো মারা যায়। মতিন সৈকত এসব পাখি খুঁজে বের করে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে ছেড়ে দেন।

২০০৬ সাল থেকে এই পর্যন্ত ১১ বছরে তিনি ৩৫০টি নানা প্রজাতির পাখি অবমুক্ত করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন পাখি, বন্যপ্রাণী উদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাল-নদ পুনঃখননে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মতিন সৈকতের দেখাদেখি স্থানীয় শিশু কিশোররা পাখি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এগিয়ে এসেছে। এলাকায় কোনো পাখি আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডাক পড়ে পাখিদের প্রিয় বন্ধু মতিন সৈকতের। ডাক পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেখানে থাকেন না কেন চলে আসেন তিনি।

মতিন সৈকত বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি অনেকে সখ করে পাখি পালে। কিন্ত পাখিটি যখন অসুস্থ হয় তখন তাকে ছেড়ে দেয়। আমার এ বিষয়টি খুব খরাপ লাগত। পাখিটি তো আর তার বাবা-মাকে খুঁজে পাবে না। তবে তার চিকিৎসা করাবে কে? এই চিন্তা থেকেই পাখির প্রতি আমার ভালোবাসা, ভালো লাগা কিংবা বলতে পারেন প্রেম শুরু হয়ে যায়। যে কোনো প্রজাতির পাখি অসুস্থ হয়েছে তা দেখলে কিংবা শুনলে আমার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আমাদের দাউদকান্দি যখন প্লাবণভূমিতে মৎস্য চাষ শুরু করে তখন লক্ষ করলাম যে, ছোট মাছকে রক্ষা করার জন্য মৎস্যচাষিরা পুকুরের ওপর জাল দিয়ে রাখে। আর সে জালে পা আটকে অসংখ্য পাখি অসুস্থ হয়ে যায়, জেলেদের হাতে মারা যায়। তাই আমি পাখিদের উদ্ধার অভিযানে নেমে যাই। আমার দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় থাকে যখন আমি বিভিন্ন জমি কিংবা পুকুরে ঘুরে বেড়াই। কাদা মাটি নিয়ে নেমে যাই জমির ভেতর। খুঁজে বের করি কোনো অসুস্থ কিংবা আটকে যাওয়া পাখি আছে কিনা। প্রথম প্রথম এলাকার লোকজন আড়ালে আবডালে আমাকে পাগল বলত। কেউ বা সখ করে বলত পাখির পাগল বলে। কিন্তু আমি কোনো সমালোচনাকেই মনে ধরিনি। আমার একটাই উদ্দেশ্য, অসুস্থ পাখিদের সুস্থ করে আকাশের দিকে ছেড়ে দেয়া। কারণ, পাখিদের আকাশে ওড়া কিংবা গাছের ডালে মানায় বেশ। এখন এলাকার লোক আর আমাকে পাগল বলে না। তারা আমাকে পাখি বন্ধু বলে ডাকে। এটাই আমার সবচেয়ে অর্জন বলে আমি মনে করি।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ কালবৈশাখীতে আহত ২০টি চিল খুঁজে বের করে বাড়িতে এনে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে ২৭ এপ্রিল দুপুরে তিনি অবমুক্ত করেন।

অধ্যাপক মতিন সৈকত শুধু যে পাখি প্রেমিক তা নয়, তিনি একজন খাঁটি কৃষক বন্ধু। কৃষি, কৃষকের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কারণেই তাকে কৃষক বন্ধুর খেতাবও এনে দিয়েছে। তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

পাখিকে ভালোবেসে যার কেটে যায় সারা বেলা

আপডেট টাইম : ০৮:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ পেশায় শিক্ষক হলেও তার সারা অঙ্গ-প্রতঙ্গে বিরাজমান পাখির প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও ভালো লাগা। পাখিকে ভালোবেসেই যার কেটে যায় সারা বেলা। চলনে বলনে অত্যন্ত সাদাসিধে এই হ্যাংলা পাতলা ঘরনের মানুষটি ঘরে-বাইরে, রাস্তায় কি প্রতিষ্ঠানে যেখানেই থাকেন না কেন, যদি শুনেন বা দেখেন কোনো পাখি রাস্তায়, ক্ষেত খামারে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, তখন আর তাকে আটকে রাখার সাধ্য কার। তিনি সব কাজ ফেলে সেখানে যাবেন। পিতা-মাতার মমতা দিয়ে অসুস্থ পাখিটিকে উঠিয়ে আনবেন নিজের ঘরে। যতদিন না পাখিটি সুস্থ হয়ে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় ডানা মেলে উড়তে পারছে ততদিন তিনি তাকে লালন-পালন করবেন। এ সময়ে আপন সন্তানের যত নেয়ারও সময় পান না তিনি। ধ্যান জ্ঞান অসুস্থ পাখিটিকে সুস্থ করা নিয়ে। পরে সুস্থ পাখিটিকে অবমুক্ত করে দিয়েই তৃপ্তি অনুভব করেন তিনি। তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন মনের অজান্তে। লাভ করেন অনাবিল প্রশান্তি। এমনি করেই এ পর্যন্ত তিনি অবমুক্ত করেছেন ৩৫০টি পাখিকে। তাই তো এলাকাবাসী তাকে ডাকে পাখি বন্ধু হিসেবে। কৃষক বন্ধু হিসেবেও স্বীকৃত রয়েছে তার।

কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের সন্তান অধ্যাপক মতিন সৈকত। বাবা মৃত কেরামত আলী ও মাতা মৃত শাহানারা বেগম। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক মতিন সৈকতের স্ত্রী জাহানারা বেগম একজন গৃহিণী। তিনি দাউদকান্দি পীরচর আতিকিয়া সিনিয়র আলিম মাদরাসার বাংলা বিভাগের শিক্ষক। দাউদকান্দি উপজেলা প্লাবণভূমিতে মাছ চাষের মডেল এখন সারাদেশে। জল যেখানে মাছ সেখানে। চিল, ঈগল, বক, পানকৌড়ি, পরিযায়ীসহ বহু পাখির প্রধান খাদ্য মাছ হওয়ায় এখানে হাজারো পাখির বসবাস। মৎস্য খামারিরা চাষের ছোট মাছকে রক্ষার জন্য জাল এবং সুতা দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে রাখে। এতে অনেক পাখি আটকে আহত হয়ে ঝুলে থাকে। কখনো মারা যায়। মতিন সৈকত এসব পাখি খুঁজে বের করে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে ছেড়ে দেন।

২০০৬ সাল থেকে এই পর্যন্ত ১১ বছরে তিনি ৩৫০টি নানা প্রজাতির পাখি অবমুক্ত করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন পাখি, বন্যপ্রাণী উদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাল-নদ পুনঃখননে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মতিন সৈকতের দেখাদেখি স্থানীয় শিশু কিশোররা পাখি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এগিয়ে এসেছে। এলাকায় কোনো পাখি আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডাক পড়ে পাখিদের প্রিয় বন্ধু মতিন সৈকতের। ডাক পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেখানে থাকেন না কেন চলে আসেন তিনি।

মতিন সৈকত বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি অনেকে সখ করে পাখি পালে। কিন্ত পাখিটি যখন অসুস্থ হয় তখন তাকে ছেড়ে দেয়। আমার এ বিষয়টি খুব খরাপ লাগত। পাখিটি তো আর তার বাবা-মাকে খুঁজে পাবে না। তবে তার চিকিৎসা করাবে কে? এই চিন্তা থেকেই পাখির প্রতি আমার ভালোবাসা, ভালো লাগা কিংবা বলতে পারেন প্রেম শুরু হয়ে যায়। যে কোনো প্রজাতির পাখি অসুস্থ হয়েছে তা দেখলে কিংবা শুনলে আমার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আমাদের দাউদকান্দি যখন প্লাবণভূমিতে মৎস্য চাষ শুরু করে তখন লক্ষ করলাম যে, ছোট মাছকে রক্ষা করার জন্য মৎস্যচাষিরা পুকুরের ওপর জাল দিয়ে রাখে। আর সে জালে পা আটকে অসংখ্য পাখি অসুস্থ হয়ে যায়, জেলেদের হাতে মারা যায়। তাই আমি পাখিদের উদ্ধার অভিযানে নেমে যাই। আমার দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় থাকে যখন আমি বিভিন্ন জমি কিংবা পুকুরে ঘুরে বেড়াই। কাদা মাটি নিয়ে নেমে যাই জমির ভেতর। খুঁজে বের করি কোনো অসুস্থ কিংবা আটকে যাওয়া পাখি আছে কিনা। প্রথম প্রথম এলাকার লোকজন আড়ালে আবডালে আমাকে পাগল বলত। কেউ বা সখ করে বলত পাখির পাগল বলে। কিন্তু আমি কোনো সমালোচনাকেই মনে ধরিনি। আমার একটাই উদ্দেশ্য, অসুস্থ পাখিদের সুস্থ করে আকাশের দিকে ছেড়ে দেয়া। কারণ, পাখিদের আকাশে ওড়া কিংবা গাছের ডালে মানায় বেশ। এখন এলাকার লোক আর আমাকে পাগল বলে না। তারা আমাকে পাখি বন্ধু বলে ডাকে। এটাই আমার সবচেয়ে অর্জন বলে আমি মনে করি।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ কালবৈশাখীতে আহত ২০টি চিল খুঁজে বের করে বাড়িতে এনে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে ২৭ এপ্রিল দুপুরে তিনি অবমুক্ত করেন।

অধ্যাপক মতিন সৈকত শুধু যে পাখি প্রেমিক তা নয়, তিনি একজন খাঁটি কৃষক বন্ধু। কৃষি, কৃষকের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কারণেই তাকে কৃষক বন্ধুর খেতাবও এনে দিয়েছে। তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।