হাওর বার্তা ডেস্কঃ কি আর কমু বাজান দুক্ষের কথা। কতবার লোকগুলান আইলো লিইখ্যা নিয়া গেলো। অথচ কোন সাহায্য দিলো না। সবাই আজকাল মিথ্যা কথা কয়। কেউ কথা রাখেনা। লোকের কথা আর কি কমু, নিজের পেডের সন্তানই রাখেনা। অসুখ হইলে খোঁজখবর নেয়না। এইহানে আমারে দ্যাখতেও আসেনা। মন চাইলে মাঝে মধ্যে আয়ে, ১০০ ট্যাকা দিইয়্যা যায়। এই পর্যন্তই ব্যস, তার দায়িত্ব-কর্তব্য’-অশ্রুভেজা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার ফয়জুন্নেসা।
৭০ বছরের এ বৃদ্ধা নিজ চোখে দেখেছেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সে সময়কার স্মৃতিচারণ করলেন তিনি।
বললেন, ‘ওই সব দিনগুলোর কথা কি আর ভোলন যায়, অহন মনে পড়লেই গায়ের লোম কাটা দেয়। লম্বা লম্বা সব জোয়ান। উর্দুতে কিসব কইতো। গালমন্দ নাকি প্রশংসা, কিছুই বুঝতাম না। তয় এতটুকু বুঝতাম, ব্যাটাগো নজর ভালা আছিল না।’
যুদ্ধের স্মৃতি এখনো ফয়জুন্নেসাকে তাড়া করে ফেরে। ঘুমের ঘরে এখনো সেই দিনগুলো তিনি দিব্যি দেখতে পান। হাওর বার্তাকে সঙ্গে শেয়ার করলেন তেমনই এক দিনের কথা।
বললেন, ‘রান্না ঘরে আছিলাম। পাশের বাসার একজন আইস্যা কইল, ভাবি জীবন বাঁচাইতে হইলে পালাও। জলদি দৌঁড় দাও। আমি আর কোনদিকে তাকাইনাই, পোলাপানগো নিয়া সোজা মারলাম ছুট। ওরা খুব কান্নাতাছিলো, আমি ওগো মুখ আটকাইয়া রাখি।’
গ্রামে থাকতে ভালো লাগেনি ফয়জুন্নেসার। বড় ‘সাধ’ করে তাই এসেছিলেন রাজধানীতে। ভেবেছিলেন ভাগ্যাকাশে সূর্য উদয় হবে। কিন্তু তা আর হয়নি। এরপর ৪০ বছর কেটে গেছে। ‘সুখেশ্বর’ তাদের পল্লীতে আসেন নি। আসেন নি ‘পরিবর্তন’ এর বার্তা নিয়ে। বরং হারিয়েছেন চাল ব্যবসায়ী স্বামীকে। একপ্রকার বিনা চিকিৎসাতেই মারা গেছেন তিনি। কারণ আর অন্যকিছু নয়, নিদারুণ দারিদ্র্যতা।
এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে তবুও দমে যাননি তিনি। দিনের পর দিন নিজের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে সবাইকে জানান দিয়েছেন, দারিদ্র্যতাকে সঙ্গে নিয়েও ‘জয়ী’ হওয়া যায়।
দু’মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। ছেলে রিক্সা চালালেও থাকেনা তার সঙ্গে। তাই বাধ্য হয়ে একাই থাকতে হয় ফয়জুন্নেসাকে। উত্তরা ৯নং সেক্টরের পশ্চিম আব্দুল্লাহপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন একটি বস্তিতে থাকেন তিনি।
সেখানে ‘সবেধন নীলমণি’ বলতে তার একটি মাত্রই ঘর। যদিও সেটিকে আদতে ‘ঘর’ বলা যায়না। ছোট্ট একটি খুঁপড়ির মত। যেখানে বর্ষা এলেই ঘর পানিতে ভেসে যায়। নেই বিদ্যুৎ সংযোগও। তবুও সেখানে থাকেন তিনি, ১ হাজার টাকার বিনিময়ে।
সরকারি জায়গায় থেকে টাকা কেন দেন, জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বললেন, ‘ট্যাকা ছাড়া কি আজকাল কিছু হয়। সবকিছুতেই ট্যাকা লাগে, ঘুষ লাগে। সবাইতো ট্যাকার পাগল। আর নেতারা তো কেবল ভোট আইলেই আমগো খোঁজ নেয়, বাকি সময় রাস্তা ভুইল্যাও এদিকে আসেনা।’
স্থানীয় প্রভাবশালি কিংবা রাজনৈতিক মহলও তাদের মত মানুষের পাশে নেই অভিযোগ করে এ বৃদ্ধা বলেন, ‘দ্যাশে ভালা মানুষ নেই। সবাই ধান্দাবাজ হইয়্যা গ্যাছে। গরীবগো নিয়্যা কেউ ভাবেনা, সবাই আছে নিজেগো ভোগ-বিলাস নিয়্যা ব্যস্ত। এই যে ঈদটা গেল, কই কেউ তো আইলো না দু’পুটলা মাংস নিয়া। খালি বড় বড় কথা আর বক্তৃতা। ওসব গরীবরা বোঝে, ভালা কইরাই বোঝে।’
জীবনের এতগুলো দিন পেরিয়ে গেলেও কপালে এখনো জোটেনি তার বয়স্ক ভাতা। আর মিলবেও কিনা, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। কারণ, তিনি যা বলেন সত্যটাই বলেন। আর সেটি একেবারে মুখের ওপরেই। তাই সে রাজনৈতিক নেতা হোক কিংবা সমাজপতি।
স্থানীয়রা ফয়জুন্নেসাদের বারবার উচ্ছেদের চেষ্টা করেন, এমন অভিযোগ বস্তিবাসির। তারা বলেন, ‘গরীব বইল্যা আমাগো উফরে ওরা এমন করে। আমাদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। বলার মতোও কেউ নাই। আফনে (সাংবাদিক) আইছেন, তাই আফনের মাধ্যমেই সবাইকে আমাগো দুর্দশার কথা জানাইলাম। ইচ্ছে হইলে, মন চাইলে গরীবগো দিকে একটু তাকাইয়েন। এতে আল্লাহ আফনেগো রহম করবো।’
বয়সের ভারে ‘ঠিকমত’ হাঁটাচলা করতে পারেন না এ বৃদ্ধা। শুয়ে-বসে সময় কাটান। বস্তির মানুষের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করেন। স্বামীর স্মৃতিচারণ করেন। ফিরে যান যৌবনের সেই সোনালী দিনগুলোতে। একলা বসে কাঁদেন নিভৃতে। আবার চোখ মুছে উঠে গিয়ে ঠিকই বসে পড়েন দু’মুঠো ডাল-ভাত রাঁধতে। যেগুলোর যোগান দেন, তার মেয়েরাই।
ফয়জুন্নেসার খুব ইচ্ছে করে, নিজের টাকায় সন্তান-নাতিদের পেটপুরে খাওয়াতে। উৎসব-পার্বণে তাদের পোশাক কিনে দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনা। অর্থদেবতা ভুলেও তার দরিদ্র পল্লীতে আসেন না। ভুলেও বলেন না, ‘চোখের জল মোছ ফয়জুন্নেসা, এই দেখ আমি এসেছি। আর তোর কোন দুঃখ নেই। এবার হাস। প্রাণ খুলে হাস। এই নে টাকা। বদলে ফেল ভাগ্য।’
তবে আশা ছাড়েননি ফয়জুন্নেসা। ছাড়েননি স্বপ্ন দেখাও। তিনি বলেন, ‘চাইলেই সরকার ‘আলাদিনের চেরাগ’র মত গরীবের ভাগ্য বদলাইতে পারে, পারে মুখে হাসি ফোটাইতেও। কিন্তু প্রশ্ন হইলো গিয়া, তারা কি সেইড্যা করবো? কত ট্যাকাই তো নেতারা মাইর্যা খায়, তার থেইক্যা এক অংশ পরিমাণ দিলেও তো আমরা দু’বেলা খাইয়্যা-পইর্যা বাঁইচ্যা থাকতে পারি। শেখের (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) বেডি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) একটু কইয়্যা দিলেই, আমরা ‘ভালা’ থাকতে পারি। তাইলে কেউ আর আমগো উচ্ছেদ করতো আইবো না। চান্দা নিতে আইবো না।
Reporter Name 
























