ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাড়বকুণ্ডের লাল পেয়ারা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:২৮:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ অগাস্ট ২০১৭
  • ৫০০ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ডের বর্ষার অন্যতম ফল লাল পেয়ারা। এটি বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চাষ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। এই এলাকার উপর দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বয়ে যাওয়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ থাকাতে সহজেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই লাল পেয়ারা কিনতে। তাছাড়া এই লাল পেয়ার সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর কদরও বেশি। জানা যায়, সেই আদিকাল থেকে বাড়বকুণ্ডের পাহাড়ে এই পেয়ারার চাষ হলেও ১৯৭০ সালে থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই লাল পেয়ারা চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে পাহাড়ের প্রায় ৫০০ একর এলাকাজুড়ে এই পেয়ারার চাষ। তবে সরকারি সুুযোগ-সুবিধা থাকলে এই পেয়ারার চাষ আরো প্রসার হতো বলে চাষিরা মনে করেন। বাড়বকুণ্ডের ঐতিহ্যবাহী লাল পেয়ারাকে কেন্দ্র করে উপজেলার হাটবাজারে ফলের ব্যবসা এখন জমজমাট। প্রতিটি ফলের দোকানে অন্যসব ফলের সাথে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এই পেয়ারা। এতে স্থানীয় ক্রেতা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারদের আনাগোনা। ফলে ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে কৃষকদেরও। স্থানীয় পেয়ারার বাজারে গিয়ে জানা যায়, মহাসড়কের পাশেই বাড়বকুণ্ড বাজারে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকেই পাহাড় থেকে চাষীরা পেয়ারা এনে জড়ো করতে থাকে। কিন্তু তার আগেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে হাজির হন। সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যেই পেয়ারা বেচা-বিক্রি শেষ হয়ে যায়। অনেক পাইকার ক্রেতা চাষির কাঁধের উপর পেয়ারা থাকতেই দর-দাম করে কিনে নেয়। কে কার আগে পেয়ারা কিনে নেবে এ যেন এক প্রতিযোগিতার আসর। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিকভাবে দেশের অন্যান্য স্থানে উৎপাদিত পেয়ারাগুলোর বাইরের রং সবুজ ও ভেতরে সাদা রং-এর কুসুম থাকে। আর সেসব পেয়ারার আকৃতি হয় কিছুটা বড়। কিন্তু বাড়বকুণ্ডের পাহাড়ে উৎপাদিত লাল পেয়ারা মূল বৈশিষ্ট হলো এই পেয়ারাগুলোর আকৃতি অন্য পেয়ারার চেয়ে ছোট। এর বাইরের রং সবুজ ও হালকা হলুদ হলেও ভেতরের কুসুমটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় লালছে গোলাপী রংয়ের। আর এটি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। ফেনী থেকে আসা আরশাদুল্লা নামে এক পাইকারী ক্রেতা জানান, সীতাকুণ্ডের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘লাল পেয়ারা’। সুদীর্ঘকাল ধরে বাড়বকুন্ড পাহাড়ে এ পেয়ারা ব্যাপক হারে চাষাবাদ করছেন কৃষকরা। এটি খেতে খুব সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদাও রয়েছে বেশি। তিনি প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই পেয়ারা ফেনী শহরে নিয়ে বিক্রি করছেন। তিনি আরো জানান, পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিন সকালে এসে বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে এই পেয়ারা প্রতি কেজি ৩০/৪০ টাকা দরে ক্রয় করে ফেনী শহরে নিয়ে প্রতি কেজি ৬০/৭০ টাকা দরে বিক্রি করেন। একই কথা জানান, পাইকারী ক্রেতা নারায়নগঞ্জ থেকে আসা মহসিন ও খুলনা থেকে আসা রুবেল এবং কুমিল্লা থেকে আসা নাঈমও।
বাড়বকুণ্ডের পেয়ারা চাষী নুরুল আবছার, সহিদুল্লাহ, আলাউদ্দিন সহ অনেকে জানান, তারা বাপ-দাদার আমল থেকে পাহাড়ে পেয়ারার চাষ করে আসছেন। প্রতি মৌসুমে বাগান মেরামতের খরচ পুষিয়ে তারা পেয়ারা বিক্রি করে প্রায় ১ থেকে ২লাখ পর্যন্ত আয় করেন। তবে এটি তাদের সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগেই করেন। সরকার যদি পেয়ারা চাষে একটু সহযোগিতা করেন তাহলে এই পেয়ারা চাষ আরো প্রসার হবে এবং দেশে-বিদেশে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। কৃষিবিদদের মতে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড লাল পেয়ারা শুধু সুস্বাদুই নয়। এর পুষ্টিগুণও অন্য পেয়ারার চেয়ে বেশি। সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুশান্ত সাহা বলেন, বাড়বকুন্ডের লাল পেয়ারায় ভিটামিন সি’র সাথে লাল কুসুমের কারণে ভিটামিন এ যুক্ত হয়েছে। এদিকে জমজমাট বেচাকেনার কথা জানান, ভ্রাম্যমাণ লাল পেয়ারা বিক্রেতারাও। গতকাল সীতাকুন্ড বাজারে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতাদের কাছে পেয়ারা বিক্রি করতে করতে তারা বলেন, বর্ষার মৌসুমে যতদিন লাল পেয়ারা থাকে ততদিন অন্য ফল বিক্রির দরকার পড়ে না। শুধু পেয়ারা বিক্রি করেই সংসার চালানো যায়। তাই আমরা শুধু লাল পেয়ারা বিক্রি করছি। অন্যদিকে লাল পেয়ারা কিনতে আসা ঢাকা শহরে বসবাসকারী শাহ নেওয়াজ নামে এক ক্রেতা বলেন, আমার বাড়ী সীতাকুণ্ডে। আমাদের উপজেলায় বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে উৎপাদিত এই পেয়ারা সত্যিই ভালো লাগে। এটি আকারে কিছুটা ছোট হলেও খেতে খুবই সুস্বাদু। চাকুরীজীবী ব্যস্ত জীবন তাই সুযোগ পেলেই পেয়ারার মৌসুমে এসে বাড়বকুণ্ড ও সীতাকুণ্ড বাজার থেকে তিনি এই পেয়ারা কিনে নিয়ে যান।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাড়বকুণ্ডের লাল পেয়ারা

আপডেট টাইম : ০৩:২৮:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ অগাস্ট ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ডের বর্ষার অন্যতম ফল লাল পেয়ারা। এটি বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চাষ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। এই এলাকার উপর দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বয়ে যাওয়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ থাকাতে সহজেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই লাল পেয়ারা কিনতে। তাছাড়া এই লাল পেয়ার সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর কদরও বেশি। জানা যায়, সেই আদিকাল থেকে বাড়বকুণ্ডের পাহাড়ে এই পেয়ারার চাষ হলেও ১৯৭০ সালে থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই লাল পেয়ারা চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে পাহাড়ের প্রায় ৫০০ একর এলাকাজুড়ে এই পেয়ারার চাষ। তবে সরকারি সুুযোগ-সুবিধা থাকলে এই পেয়ারার চাষ আরো প্রসার হতো বলে চাষিরা মনে করেন। বাড়বকুণ্ডের ঐতিহ্যবাহী লাল পেয়ারাকে কেন্দ্র করে উপজেলার হাটবাজারে ফলের ব্যবসা এখন জমজমাট। প্রতিটি ফলের দোকানে অন্যসব ফলের সাথে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এই পেয়ারা। এতে স্থানীয় ক্রেতা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারদের আনাগোনা। ফলে ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে কৃষকদেরও। স্থানীয় পেয়ারার বাজারে গিয়ে জানা যায়, মহাসড়কের পাশেই বাড়বকুণ্ড বাজারে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকেই পাহাড় থেকে চাষীরা পেয়ারা এনে জড়ো করতে থাকে। কিন্তু তার আগেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে হাজির হন। সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যেই পেয়ারা বেচা-বিক্রি শেষ হয়ে যায়। অনেক পাইকার ক্রেতা চাষির কাঁধের উপর পেয়ারা থাকতেই দর-দাম করে কিনে নেয়। কে কার আগে পেয়ারা কিনে নেবে এ যেন এক প্রতিযোগিতার আসর। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিকভাবে দেশের অন্যান্য স্থানে উৎপাদিত পেয়ারাগুলোর বাইরের রং সবুজ ও ভেতরে সাদা রং-এর কুসুম থাকে। আর সেসব পেয়ারার আকৃতি হয় কিছুটা বড়। কিন্তু বাড়বকুণ্ডের পাহাড়ে উৎপাদিত লাল পেয়ারা মূল বৈশিষ্ট হলো এই পেয়ারাগুলোর আকৃতি অন্য পেয়ারার চেয়ে ছোট। এর বাইরের রং সবুজ ও হালকা হলুদ হলেও ভেতরের কুসুমটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় লালছে গোলাপী রংয়ের। আর এটি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। ফেনী থেকে আসা আরশাদুল্লা নামে এক পাইকারী ক্রেতা জানান, সীতাকুণ্ডের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘লাল পেয়ারা’। সুদীর্ঘকাল ধরে বাড়বকুন্ড পাহাড়ে এ পেয়ারা ব্যাপক হারে চাষাবাদ করছেন কৃষকরা। এটি খেতে খুব সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদাও রয়েছে বেশি। তিনি প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই পেয়ারা ফেনী শহরে নিয়ে বিক্রি করছেন। তিনি আরো জানান, পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিন সকালে এসে বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে এই পেয়ারা প্রতি কেজি ৩০/৪০ টাকা দরে ক্রয় করে ফেনী শহরে নিয়ে প্রতি কেজি ৬০/৭০ টাকা দরে বিক্রি করেন। একই কথা জানান, পাইকারী ক্রেতা নারায়নগঞ্জ থেকে আসা মহসিন ও খুলনা থেকে আসা রুবেল এবং কুমিল্লা থেকে আসা নাঈমও।
বাড়বকুণ্ডের পেয়ারা চাষী নুরুল আবছার, সহিদুল্লাহ, আলাউদ্দিন সহ অনেকে জানান, তারা বাপ-দাদার আমল থেকে পাহাড়ে পেয়ারার চাষ করে আসছেন। প্রতি মৌসুমে বাগান মেরামতের খরচ পুষিয়ে তারা পেয়ারা বিক্রি করে প্রায় ১ থেকে ২লাখ পর্যন্ত আয় করেন। তবে এটি তাদের সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগেই করেন। সরকার যদি পেয়ারা চাষে একটু সহযোগিতা করেন তাহলে এই পেয়ারা চাষ আরো প্রসার হবে এবং দেশে-বিদেশে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। কৃষিবিদদের মতে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড লাল পেয়ারা শুধু সুস্বাদুই নয়। এর পুষ্টিগুণও অন্য পেয়ারার চেয়ে বেশি। সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুশান্ত সাহা বলেন, বাড়বকুন্ডের লাল পেয়ারায় ভিটামিন সি’র সাথে লাল কুসুমের কারণে ভিটামিন এ যুক্ত হয়েছে। এদিকে জমজমাট বেচাকেনার কথা জানান, ভ্রাম্যমাণ লাল পেয়ারা বিক্রেতারাও। গতকাল সীতাকুন্ড বাজারে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতাদের কাছে পেয়ারা বিক্রি করতে করতে তারা বলেন, বর্ষার মৌসুমে যতদিন লাল পেয়ারা থাকে ততদিন অন্য ফল বিক্রির দরকার পড়ে না। শুধু পেয়ারা বিক্রি করেই সংসার চালানো যায়। তাই আমরা শুধু লাল পেয়ারা বিক্রি করছি। অন্যদিকে লাল পেয়ারা কিনতে আসা ঢাকা শহরে বসবাসকারী শাহ নেওয়াজ নামে এক ক্রেতা বলেন, আমার বাড়ী সীতাকুণ্ডে। আমাদের উপজেলায় বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে উৎপাদিত এই পেয়ারা সত্যিই ভালো লাগে। এটি আকারে কিছুটা ছোট হলেও খেতে খুবই সুস্বাদু। চাকুরীজীবী ব্যস্ত জীবন তাই সুযোগ পেলেই পেয়ারার মৌসুমে এসে বাড়বকুণ্ড ও সীতাকুণ্ড বাজার থেকে তিনি এই পেয়ারা কিনে নিয়ে যান।