ঢাকা ০৫:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বামীর মঙ্গল কামনায় নাইওর যাচ্ছেন নববধূ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:১৮:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৭
  • ৩৫৪ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ উত্তরাঞ্চলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের প্রথম তিন থেকে সাতদিন নববধূর মুখ দর্শন করলে স্বামীর অকল্যাণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিয়ের পর প্রথম পাওয়া ভাদ্র মাসের এই ক’দিন বাপের বাড়িতে অবস্থান করেন নববধূরা। পঞ্চগড়ে এই নাইওরকেই বলে ‘ভাদর কাটানি’।

গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাদর কাটানি’ উৎসব। তবে এ উৎসবের কোনো ঐতিহাসিক দলিল নেই।

স্থানীয়দের ধারণা, উত্তরাঞ্চলে একসময় বসবাসরত সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ে এ রেওয়াজ চালু করেছে। পরে সাধারণ মানুষের চর্চার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে বিয়ের ধুম পড়ে যায়। এরপর পুরো ভাদ্র মাস বিয়েশাদি বন্ধ!

গত বছরের আশ্বিন থেকে এ বছরের শ্রাবণ মাস পর্যন্ত যাদের বিয়ে হয়েছে, তারাই মূলত এ রীতি মেনে নাইওর যাচ্ছেন। এর জন্য শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝিতেই স্বামীর বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। নববধূরা সংসার গুছিয়ে নেন, যাতে তার অনুপস্থিতিতে স্বামীকে সমস্যায় পড়তে না হয়।

বাপের বাড়িতেও চলে নানা আয়োজন। সাধ্যমতো মেয়েকে খাওয়ানো-পরানোয় কমতি করেন না মা-বাবারা। নববধূকে আনতে যান তার ছোট ভাই, বোন, বান্ধবী, নানি, চাচি, ফুফু ও প্রতিবেশীরা। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় মুড়ি, পায়েস, নানা রকমের ফল, নানা পদের মিষ্টান্ন। স্বামীর বাড়িতেও অতিথিদের সাধ্যমতো আপ্যায়ন করা হয়। নাইওর শেষ হলে স্বামীর বাড়ির লোকজন বধূকে আনতে যান। তারাও সাধ্যমতো ফল, মিষ্টি, পায়েস, মুড়ি, মুড়কি, দই ইত্যাদি নিয়ে যান।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের গোলাবাড়ি এলাকার রবিলাল দেবের মেয়ে রঞ্জিতা রানীর ছয় মাস আগে বিয়ে হয়েছে। স্বামীর বাড়ি আটোয়ারী উপজেলার তড়িয়া ইউনিয়নের বারঘাটি গ্রাম। ‘ভাদর কাটানি’ করতে তিনিও চলে গেছেন বাপের বাড়ি। রঞ্জিতা রানী বলেন, অনেকেই বলে এটা কুসংস্কার, তার পরও আমাদের পূর্বপুরুষরা এটা করে এসেছেন। তাছাড়া অনেক দিন পর বাবার বাড়ি আসতে পেরে বেশ ভালোই লাগছে।

এ রীতিটি সাধারণত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও উত্তরাঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়েরও অনেকে পালন করে থাকেন। যেমন, সদর উপজেলা পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের ঝাকুয়াকালী এলাকার খোরশেদ আলমের মেয়ে খালেদা আক্তার। ভাদর কাটানি করতে তিনি নাইওরে এসেছেন।

স্মৃতিতে ঋদ্ধ দেবীগঞ্জ উপজেলার খোঁচাবাড়ী এলাকার সুরবালা (৫২) বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ ভারতের জলপাইগুড়ি থাকতেন। দেশ বিভাগের পর আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। ভারতে হিন্দু-মুসলমান প্রতিটি পরিবারে ভাদর কাটানি উৎসব ঘটা করে পালন করা হতো। এটা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি।

পঞ্চগড়ের ঘরে ঘরে এখন উৎসবের আমেজ। এরই মধ্যে অধিকাংশ নববধূ বাপের বাড়ি চলে গেছেন। রীতিটি মূলত গ্রামীণ হলেও শহরাঞ্চলেও অল্পবিস্তর লক্ষ করা যায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বামীর মঙ্গল কামনায় নাইওর যাচ্ছেন নববধূ

আপডেট টাইম : ০৩:১৮:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ উত্তরাঞ্চলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের প্রথম তিন থেকে সাতদিন নববধূর মুখ দর্শন করলে স্বামীর অকল্যাণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিয়ের পর প্রথম পাওয়া ভাদ্র মাসের এই ক’দিন বাপের বাড়িতে অবস্থান করেন নববধূরা। পঞ্চগড়ে এই নাইওরকেই বলে ‘ভাদর কাটানি’।

গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাদর কাটানি’ উৎসব। তবে এ উৎসবের কোনো ঐতিহাসিক দলিল নেই।

স্থানীয়দের ধারণা, উত্তরাঞ্চলে একসময় বসবাসরত সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ে এ রেওয়াজ চালু করেছে। পরে সাধারণ মানুষের চর্চার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে বিয়ের ধুম পড়ে যায়। এরপর পুরো ভাদ্র মাস বিয়েশাদি বন্ধ!

গত বছরের আশ্বিন থেকে এ বছরের শ্রাবণ মাস পর্যন্ত যাদের বিয়ে হয়েছে, তারাই মূলত এ রীতি মেনে নাইওর যাচ্ছেন। এর জন্য শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝিতেই স্বামীর বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। নববধূরা সংসার গুছিয়ে নেন, যাতে তার অনুপস্থিতিতে স্বামীকে সমস্যায় পড়তে না হয়।

বাপের বাড়িতেও চলে নানা আয়োজন। সাধ্যমতো মেয়েকে খাওয়ানো-পরানোয় কমতি করেন না মা-বাবারা। নববধূকে আনতে যান তার ছোট ভাই, বোন, বান্ধবী, নানি, চাচি, ফুফু ও প্রতিবেশীরা। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় মুড়ি, পায়েস, নানা রকমের ফল, নানা পদের মিষ্টান্ন। স্বামীর বাড়িতেও অতিথিদের সাধ্যমতো আপ্যায়ন করা হয়। নাইওর শেষ হলে স্বামীর বাড়ির লোকজন বধূকে আনতে যান। তারাও সাধ্যমতো ফল, মিষ্টি, পায়েস, মুড়ি, মুড়কি, দই ইত্যাদি নিয়ে যান।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের গোলাবাড়ি এলাকার রবিলাল দেবের মেয়ে রঞ্জিতা রানীর ছয় মাস আগে বিয়ে হয়েছে। স্বামীর বাড়ি আটোয়ারী উপজেলার তড়িয়া ইউনিয়নের বারঘাটি গ্রাম। ‘ভাদর কাটানি’ করতে তিনিও চলে গেছেন বাপের বাড়ি। রঞ্জিতা রানী বলেন, অনেকেই বলে এটা কুসংস্কার, তার পরও আমাদের পূর্বপুরুষরা এটা করে এসেছেন। তাছাড়া অনেক দিন পর বাবার বাড়ি আসতে পেরে বেশ ভালোই লাগছে।

এ রীতিটি সাধারণত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও উত্তরাঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়েরও অনেকে পালন করে থাকেন। যেমন, সদর উপজেলা পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের ঝাকুয়াকালী এলাকার খোরশেদ আলমের মেয়ে খালেদা আক্তার। ভাদর কাটানি করতে তিনি নাইওরে এসেছেন।

স্মৃতিতে ঋদ্ধ দেবীগঞ্জ উপজেলার খোঁচাবাড়ী এলাকার সুরবালা (৫২) বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ ভারতের জলপাইগুড়ি থাকতেন। দেশ বিভাগের পর আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। ভারতে হিন্দু-মুসলমান প্রতিটি পরিবারে ভাদর কাটানি উৎসব ঘটা করে পালন করা হতো। এটা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি।

পঞ্চগড়ের ঘরে ঘরে এখন উৎসবের আমেজ। এরই মধ্যে অধিকাংশ নববধূ বাপের বাড়ি চলে গেছেন। রীতিটি মূলত গ্রামীণ হলেও শহরাঞ্চলেও অল্পবিস্তর লক্ষ করা যায়।