রফিকুল ইসলামঃ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ক্ষমতা, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায় তার অসহায়, অবহেলিত ও বিপন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সক্ষমতায়।
আর প্রশাসনের সার্থকতাও কেবল নিয়ম-নীতি বাস্তবায়ন, ফাইলের নিষ্পত্তি কিংবা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
একজন মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়ার আন্তরিকতা, অসহায় মানুষের নীরব আর্তনাদ উপলব্ধি করার সংবেদনশীলতা এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহসই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সাধারণ দায়িত্বপালনকারীর ঊর্ধ্বে মানবিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানমের একাধিক উদ্যোগ সেই মানবিক সত্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
৬৫ পেরোনো নাজমা আক্তারের জীবন যেন নিয়তির সঙ্গে এক দীর্ঘ নীরব সংগ্রামের নাম। বাবা নেই, মা নেই, ভাই নেই। নিজের সংসারও কখনো গড়ে ওঠেনি। জন্ম থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার অনেক কিছুই তার অধরা থেকে গেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপন বলতে রয়েছেন একমাত্র ছোট বোন আছমা আক্তার।
অথচ সেই জীবনেও এখন যুক্ত হয়েছে হৃদ্রোগ ও কিডনির জটিলতা। নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার—সবই প্রয়োজন। কিন্তু নিজের কোনো উপার্জন নেই। ছোট বোনের সামান্য আয়ে চলে দুই বোনের জীবন। কখনো ওষুধ কেনার টাকাও জোটে না। অসুস্থ শরীর আর অনিশ্চিত জীবনের ভার নিয়ে দিন কাটছিল নাজমার।
এমন একজন মানুষের জীবনে যখন সামান্য আর্থিক সহায়তাও হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন, তখন সেই সহযোগিতার মূল্য কেবল টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। প্রয়োজন হয় একটি সংবেদনশীল হৃদয়ের, যে হৃদয় অন্যের কষ্টকে নিজের অনুভূতির অংশ করে নিতে পারে। নাজমার জীবনে সেই আশ্বাস নিয়েই এগিয়ে এসেছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
গত ৫ই নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নাজমার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা। শুধু এককালীন সহযোগিতা নয়, তার চিকিৎসা, ওষুধপত্র ও জীবনযাপনের প্রয়োজন মেটাতে প্রতি মাসে এই অর্থ সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ফলে নাজমা ও তার ছোট বোনের কাছে এটি কেবল কিছু অর্থপ্রাপ্তি নয়; দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যে নির্ভরতার একটি নতুন ঠিকানা।
ঘটনার শুরু কয়েক মাস আগে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে আয়োজিত ‘মায়ার বাঁধন’ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে ফরিদা খানমের সঙ্গে পরিচয় হয় নাজমা ও তার ছোট বোনের।
অনুষ্ঠানের পরিবেশে অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একজন অসহায় নারীর জীবনসংগ্রাম তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তিনি জানতে চেয়েছেন নাজমার কথা, শুনেছেন তার অসুস্থতা, পারিবারিক বাস্তবতা ও অসহায়ত্বের গল্প।
একজন মানুষের দুর্দশার কথা শুনে সহানুভূতি প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এখানেই ফরিদা খানমের মানবিক সত্তার বিশেষত্ব। কারণ, সমাজে অসহায় মানুষের অভাব নেই। প্রতিদিন কত মানুষ কতভাবে বিপন্নতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাঁদের অনেকের কষ্ট আমাদের চোখের সামনেই ঘটে, অথচ ব্যস্ততা, উদাসীনতা কিংবা দায়িত্বের প্রচলিত গণ্ডি অতিক্রম করতে না পারার কারণে আমরা অনেক সময় সেসব দেখেও দেখি না।
কিন্তু প্রকৃত মানবিক মানুষ তিনি, যিনি ভিড়ের মধ্যে একজন অসহায় মানুষকে আলাদা করে চিনতে পারেন; যার কাছে অপরের দুঃখ নিছক সংবাদ নয়, দায়িত্ববোধের এক নীরব আহ্বান। ডিসি ফরিদা খানমের উদ্যোগে সেই মানবিক বোধেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
নাজমার ছোট বোন আছমা আক্তারের কথায় বিষয়টির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি জানিয়েছেন, বোনের দেখাশোনা করার মতো আর কেউ নেই। নিজের সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি বোনের চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বহন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতি মাসে শুধু ওষুধ কিনতেই প্রয়োজন হতো তিন থেকে চার হাজার টাকা। ফলে অনেক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সবকিছু পূরণ করা সম্ভব হতো না।
এখন ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সেই বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে। আছমা বোনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে পারছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছেন, এমনকি মাছ-মাংস, ফলমূলসহ পুষ্টিকর খাবারও কিনে দিতে পারছেন।
তাঁর আনন্দের কথায় ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের স্বস্তিবঞ্চিত জীবনে নতুন আশার আলো। একজন অসুস্থ মানুষের জন্য নিয়মিত ওষুধ ও পুষ্টিকর খাবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হয়তো অনেকের কাছে সাধারণ বিষয়। কিন্তু যার সংসারে প্রতিটি টাকা হিসাব করে খরচ করতে হয়, তার কাছে এই সুযোগের মূল্য অপরিসীম।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাজমার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য ডিসি দিয়ে ফরিদা খানম শুধু একজন অসুস্থ নারীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেননি, বরং তাঁর একমাত্র আশ্রয় ছোট বোন আছমার দীর্ঘদিনের দায়িত্বভারও কিছুটা লাঘব করেছেন।
কারণ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব যাঁরা পালন করেন, তাঁদের জীবনেও থাকে অসংখ্য না-বলা কষ্ট। নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে প্রিয়জনের সেবা করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁদেরও শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়।
এখন নাজমার জন্য সহায়তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে আছমার ত্যাগ ও দায়িত্ববোধকেও যেন সম্মান জানানো হয়েছে।
মানবিকতার সৌন্দর্য এখানেই—একজনের পাশে দাঁড়ালে কখনো কখনো একাধিক মানুষের জীবনে স্বস্তির বাতাস বয়ে যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবন্ধিতা কোনো অপরাধ নয়, কোনো মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠিও নয়। বরং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব অন্য অনেক ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি। তাঁদের চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি অধিকার ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই, যাঁরা একাকিত্ব, অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের ত্রিমুখী চাপে জীবন কাটান, তাঁদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা।
নাজমার মতো মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে একেবারে কম নয়। অনেকেই আছেন, যাঁদের জীবনসংগ্রামের গল্প কোনো সংবাদপত্রের পাতায় ওঠে আসে না। কেউ বৃদ্ধ বয়সে সন্তানহীনতার নিঃসঙ্গতায় ভোগেন, কেউ প্রতিবন্ধিতা নিয়ে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, কেউবা দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান। তাঁদের অনেকেরই সরকারি দপ্তরে যাওয়ার সামর্থ্য, প্রয়োজনীয় তথ্য কিংবা নিজের অধিকারের কথা তুলে ধরার সক্ষমতা নেই। ফলে তাঁরা নীরবে কষ্ট সহ্য করেন।
এ বাস্তবতায় প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আবেদনকারীর অপেক্ষায় থাকা নয়; বরং সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর মানসিকতা তৈরি করা। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, জনসংযোগ, স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম কিংবা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে গিয়ে অসহায় মানুষের খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতায় এমন মানুষের একটি তালিকা তৈরি করা সম্ভব, যাঁদের জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য কিংবা নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তাঁর এই পদক্ষেপ দেখিয়েছে, প্রশাসনের মানবিক ভূমিকা পালনের জন্য সব সময় বড় কোনো প্রকল্প কিংবা বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো প্রয়োজন হয় একটি আন্তরিক উদ্যোগ, একজন মানুষের কষ্ট মনোযোগ দিয়ে শোনার মানসিকতা এবং সামর্থ্যের মধ্যে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস।
তবে এ ধরনের মানবিক উদ্যোগকে কেবল ব্যক্তিনির্ভর রাখলে চলবে না। একজন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কিন্তু দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এমন উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে অসহায়, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ, স্বজনহীন ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত উপকারভোগীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। সহায়তার অর্থ নিয়মিত পৌঁছাচ্ছে কি না, চিকিৎসা হচ্ছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে উপকৃত হচ্ছেন কি না, তাও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সহায়তার সঙ্গে মর্যাদার সম্পর্ক। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময় তাঁদের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সাহায্য যেন কখনো প্রচারের উপকরণ কিংবা করুণা প্রদর্শনের উপলক্ষ না হয়ে ওঠে। বরং একজন নাগরিক হিসেবে তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হয়ে উঠুক। নাজমার পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাটি আমাদের সেই মানবিক শিক্ষাও দেয়।
ডিসি ফরিদা খানম নিজেও বলেছেন, জেলা প্রশাসনের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। তারপরও সমাজের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর এই আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একটি মানবিক সমাজ শুধু সরকারের একার প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে না। রাষ্ট্র, প্রশাসন, বিত্তবান শ্রেণি, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ববোধই পারে অসহায় মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে।
আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের সামান্য সহযোগিতা অন্য একজনের জীবনে বড় আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে। কারও জন্য একটি মাসের ওষুধের ব্যবস্থা, কারও জন্য পুষ্টিকর খাবার, কারও জন্য চিকিৎসার ব্যয় কিংবা কারও জন্য নিরাপদ আশ্রয়—এসব উদ্যোগ হয়তো সহায়তাকারীর কাছে সামান্য, কিন্তু উপকারভোগীর কাছে তা হতে পারে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
ইসলামসহ সব ধর্মেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা, প্রবীণদের সম্মান জানানো এবং মানুষের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
মানবসেবাকে ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মানুষের কল্যাণে ব্যয় ও সৎকর্মের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি সদয় আচরণের যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। সুতরাং মানুষের সেবা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানবিক বিবেকের পরিচয়।
ডিসি ফরিদা খানমের এই উদ্যোগকে তাই শুধু একজন জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা হবে না। বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সরকারি পদ-পদবি মানুষের সেবা করার একটি বড় সুযোগ।
ক্ষমতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। প্রশাসনের চেয়ার তখনই সম্মানিত হয়, যখন সেই চেয়ারে বসা মানুষটি সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারেন।
অবশ্য নাজমার জীবনের সব সংকট ১০ হাজার টাকার মাসিক সহায়তায় দূর হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর হৃদ্রোগ ও কিডনির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা। বয়স ও প্রতিবন্ধিতার কারণে তাঁর জন্য বাড়তি যত্নও প্রয়োজন।
তাই জেলা প্রশাসনের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বিত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হবে। বিশেষ করে তাঁর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ও প্রয়োজনীয় সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
তবু এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থের পরিমাণে নয়, বরং একজন অসহায় মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে। নাজমা এখন জানেন, তাঁর চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য প্রতি মাসে কিছু অর্থের ব্যবস্থা থাকবে।
আছমাও জানেন, বোনের দায়িত্ব পালনে তিনি আর সম্পূর্ণ একা নন। এই নিশ্চয়তা তাঁদের জীবনে যে মানসিক স্বস্তি এনে দিয়েছে, তার মূল্য কোনো হিসাবের খাতায় লেখা সম্ভব নয়।
আমরা প্রায়ই উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির কথা বলি। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটিও তার সুফল অনুভব করেন।
যে রাষ্ট্রে একজন প্রতিবন্ধী বৃদ্ধার ওষুধ কেনার নিশ্চয়তা থাকে, যে প্রশাসনে একজন কর্মকর্তার হৃদয় অসহায় মানুষের জন্য কাঁদে, যে সমাজে সামর্থ্যবানরা অন্যের দুঃখকে নিজের দায়িত্ব বলে ভাবতে শেখেন—সেই রাষ্ট্র ও সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের এই উদ্যোগ তাই প্রশংসার পাশাপাশি অনুসরণেরও দাবি রাখে।
তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের অনুপ্রাণিত করুক। প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি উপজেলায় এমন মানবিক উদ্যোগের বিস্তার ঘটুক।
কোনো অসুস্থ বৃদ্ধা যেন অর্থের অভাবে ওষুধবঞ্চিত না থাকেন, কোনো প্রতিবন্ধী মানুষ যেন আপনজনের অভাবে অবহেলায় হারিয়ে না যান, কোনো অসহায় মানুষ যেন রাষ্ট্রের কাছে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ না হন।
শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
নাজমা আক্তারের জীবনে ডিসি ফরিদা খানমের এই উদ্যোগ হয়তো একটুকরো আশ্রয়, কিন্তু এর আবেদন অনেক বিস্তৃত। এটি আমাদের শেখায়, মানবিক হতে বিশাল আয়োজন লাগে না; লাগে একটি উদার হৃদয়, অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা এবং সেই কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসার আন্তরিকতা।
একজন জেলা প্রশাসকের দায়িত্বের পরিধি অনেক বড়। সেই দায়িত্বের ভেতর যখন মানুষের প্রতি মমত্ববোধ যুক্ত হয়, তখন প্রশাসন কেবল রাষ্ট্রের প্রতিনিধি থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের আস্থার ঠিকানা।
নাজমার জীবনে সেই আস্থার আলো জ্বালিয়ে ফরিদা খানম যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় প্রশাসনিক সাফল্য আর কিছু হতে পারে না।
ডিসি ফরিদা খানম, আপনার পদ-পদবি হয়তো আপনাকে প্রশাসনিক পরিচয়ে পরিচিত করেছে, কিন্তু আপনার মানবিক হৃদয় আপনাকে মানুষের ভালোবাসায় স্মরণীয় করে রাখবে।
ক্ষমতার আসনে বসেও যাঁরা মানুষের চোখের জল দেখতে পান, অসহায়ের নীরব আর্তনাদ শুনতে পান এবং সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে মানবতার সেবক।
আপনার প্রতিটি মানবিক উদ্যোগ অসহায় মানুষের জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালাক, আপনার হাত ধরে আরও অনেক নাজমা ফিরে পাক বেঁচে থাকার সাহস। আপনার মতো সংবেদনশীল, বিবেকবান ও মানবিক কর্মকর্তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠুক জনবান্ধব প্রশাসন, মানবিক সমাজ ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র।
মনে রাখবেন, পদ-পদবি একদিন হারিয়ে যায়, কর্মজীবনের অধ্যায়ও একসময় শেষ হয়; কিন্তু মানুষের বিপদের দিনে বাড়িয়ে দেওয়া একটি সহমর্মিতার হাত, মুছে দেওয়া এক ফোঁটা অশ্রু কিংবা বাঁচার স্বপ্ন দেখানো একটি উদ্যোগ মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকে।
আপনার মানবিক কর্মই হোক আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয়, মানুষের ভালোবাসাই হোক আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়,ঢাকা।
Reporter Name 






















