ঢাকা ১২:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ভারতের সঙ্গে সংলাপ, শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইবে বাংলাদেশ টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনে প্রতিযোগিতার আয়োজন, যারা অংশ নিতে পারবেন ফেব্রুয়ারির কত তারিখে রোজা শুরু হতে পারে মনিরুলসহ চারজনের সাড়ে ১৯ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ হাঁটুব্যথা যে কারণে হয় এবং এ রোগের সঠিক চিকিৎসাপদ্ধতি সব ধর্মের মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে: আইজিপি মিষ্টির আসনে ৭০টি ফরম বিক্রি করল বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজ গঠনের আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার ৮-১০ লাখে যুব উন্নয়নের প্রশ্নপত্র ফাঁস, গ্রেপ্তার ৭ জনের ৫ জনই সরকারি কর্মচারী

বুকের শক্তিতে ৫ মণ পাথরের ঘানি টেনে বাঁচার লড়াই শম্ভু সাহার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৪ বার

কাঠের ঘানির চারপাশে ঘুরছেন এক দম্পতি। এতে ঘানি ঘুরছে। পিষ্ট হচ্ছে সরিষা। ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে তেল। গরু কেনার সামর্থ্য না থাকায় এভাবেই নিজেরাই ঘানি টেনে জীবিকার চাকা সচল রেখেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের শম্ভু পদ সাহা ও তার স্ত্রী গাজলী রানী সাহা। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই কাঠের ঘানিই এখনো তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

তবে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, কমেছে কর্মক্ষমতা। ফলে আগের মতো আর তেল তৈরি করতে পারেন না তারা। তাই শেষ বয়সে ঘানি টানার কষ্ট কিছুটা কমাতে একটি গরুর প্রত্যাশায় দিন গুনছেন এই দম্পতি। শম্ভু পদ সাহা ও গাজলী রানী সাহা উপজেলার উপজেলার হাজারবিঘী গ্রামের বাসিন্দা।

শম্ভু সাহা বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরি করছি। এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করি এবং পরিবারের খরচ চালাই। তিন সন্তানদেরও মানুষ করেছি এক টাকা থেকেই। কিন্তু ঘানি টানার জন্য আমার কোনো গরু নেই। তাই বাধ্য হয়েই নিজের বুকের শক্তিতে পাঁচ মণ ওজনের পাথর বোঝাই কাঠের ঘানি টেনে সরিষা মাড়াই করতে হয়। শোবার ঘর নেই। তাই এক ঘরেই ঘানি স্থাপন করতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ঘানি টানা খুবই কষ্টের কাজ। তারপরও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন এই পরিশ্রম করতে হচ্ছে। আগে ঘানি টানার কাজে গরু ব্যবহার করা হলেও এখন গরু না থাকায় নিজেকেই সেই কাজ করতে হয়।’

‘কাঠের ঘানির সঙ্গে পাথরের ভার নিয়ে শরীরের শক্তিতে ঘুরতে হয়, তারপর সরিষা থেকে তেল বের হয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এভাবেই কাজ করে আসছি। বয়স বাড়লেও কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই। কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও ঘানি টেনে তেল তৈরি করে যাচ্ছি। এই কাজের ওপর নির্ভর করেই আমার সংসার চলে। আর এ কাজে আমাকে সাহায্য করেন আমার স্ত্রী’, বলছিলেন শম্ভু সাহা।

শম্ভু সাহার স্ত্রী গাজলী রানী সাহা বলেন, ‘গরুর অভাবে প্রায় পাঁচ মণ ওজনের পাথরবোঝাই কাঠের ঘানি আমাদের নিজেদেরই টানতে হয়। আমার স্বামী যখন বুকের শক্তি দিয়ে এত ভারী ঘানি টানেন, তখন তার কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগে। এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। তাই স্বামীর কষ্ট কিছুটা কমাতে আমিও তার সঙ্গে ঘানি টানার কাজে সহযোগিতা করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর নিজের টাকায় সরিষা কেনারও সামর্থ্য নেই। তাই অন্যের সরিষা মাড়াই করে যা পাওয়া যায়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাতে হয়। সরিষা মাড়াইয়ের পর যে খৈল পাওয়া যায়, সেটাই আমাদের আয়ের অন্যতম ভরসা। সংসারের খরচ চালানো, খাবার জোগাড় করা সবকিছুই আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। এত পরিশ্রম করার পরও আয় খুব বেশি হয় না। তারপরও পেটের দায়ে কাজ করে যেতে হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আধুনিক যন্ত্রে উৎপাদিত সরিষার তেলের তুলনায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে তৈরি তেলের প্রতি মানুষের আলাদা আগ্রহ রয়েছে। শম্ভু সাহা দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের কোনো জমিজমা নেই, আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত। এ কারণে একটি গরু কিনে ঘানি টানার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই নিজেদের শারীরিক শক্তি দিয়ে প্রায় পাঁচ মণ ওজনের পাথরবোঝাই ঘানি টানতে হচ্ছে। তাদের এই কষ্ট সত্যিই কষ্টদায়ক।’

আব্দুর রহিম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘মাথাব্যথা বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা হলে এই তেল মালিশ করি। ঠান্ডা-জ্বরের সময়ও অনেকে এই তেল ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ এভাবে ঘানিতে তৈরি সরিষার তেল ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু যারা এত কষ্ট করে এই তেল তৈরি করছেন, তাদের জীবনও অনেক কষ্টের। গরুর অভাবে স্বামী-স্ত্রীকে নিজেরাই ভারী ঘানি টানতে হয়। তাদের কষ্ট লাঘবে কেউ এগিয়ে এলে খুব ভালো হতো।’

দিন দিন বাজারে বাড়ছে ভেজাল তেলের দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন ধরনের ভেজাল তেলের ভিড়ে খাঁটি সরিষার তেল পাওয়া নিয়েও রয়েছে ক্রেতাদের উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরির এই প্রাচীন পদ্ধতি টিকিয়ে রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানি। অথচ একসময় গ্রামাঞ্চলে সরিষার তেল তৈরির অন্যতম মাধ্যম ছিল এই ঘানি। এই পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা।

দ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল উৎপাদন আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে এমন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। তাই এই ঘানি টিকিয়ে রাখা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগকে বাঁচিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা আর্থিক সংকটের কারণে ঘানি টানার জন্য গরু কিনতে পারছেন না, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লী উন্নয়ন বিভাগের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা বলেন, ‘দিন দিন গ্রাম থেকে শহর সব জায়গাতেই খাঁটি সরিষার তেলের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে বাজারে ভেজাল তেলের দৌরাত্ম্য বাড়ায় ভোক্তাদের জন্য মানসম্মত তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে তেল উৎপাদনের কারখানাগুলোকে সরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা গেলে খাঁটি সরিষার তেলের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি, এসব কারখানার আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এই পেশার প্রসার ঘটবে।’

এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান যুগে এসেও শম্ভু সাহাকে যেভাবে শারীরিক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে, তা সত্যিই কষ্টের। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

শুধু শম্ভু সাহা নন, তার দুই ভাই হরিপদ সাহা ও তারাপদ সাহাও একইভাবে বুকের শক্তিতে কাঠের ঘানি টেনে সরিষা পিষে আয় করছেন। এ আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালিয়ে আসছেন তিন ভাই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের সঙ্গে সংলাপ, শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইবে বাংলাদেশ

বুকের শক্তিতে ৫ মণ পাথরের ঘানি টেনে বাঁচার লড়াই শম্ভু সাহার

আপডেট টাইম : ১১:১৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

কাঠের ঘানির চারপাশে ঘুরছেন এক দম্পতি। এতে ঘানি ঘুরছে। পিষ্ট হচ্ছে সরিষা। ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে তেল। গরু কেনার সামর্থ্য না থাকায় এভাবেই নিজেরাই ঘানি টেনে জীবিকার চাকা সচল রেখেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের শম্ভু পদ সাহা ও তার স্ত্রী গাজলী রানী সাহা। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই কাঠের ঘানিই এখনো তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

তবে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, কমেছে কর্মক্ষমতা। ফলে আগের মতো আর তেল তৈরি করতে পারেন না তারা। তাই শেষ বয়সে ঘানি টানার কষ্ট কিছুটা কমাতে একটি গরুর প্রত্যাশায় দিন গুনছেন এই দম্পতি। শম্ভু পদ সাহা ও গাজলী রানী সাহা উপজেলার উপজেলার হাজারবিঘী গ্রামের বাসিন্দা।

শম্ভু সাহা বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরি করছি। এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করি এবং পরিবারের খরচ চালাই। তিন সন্তানদেরও মানুষ করেছি এক টাকা থেকেই। কিন্তু ঘানি টানার জন্য আমার কোনো গরু নেই। তাই বাধ্য হয়েই নিজের বুকের শক্তিতে পাঁচ মণ ওজনের পাথর বোঝাই কাঠের ঘানি টেনে সরিষা মাড়াই করতে হয়। শোবার ঘর নেই। তাই এক ঘরেই ঘানি স্থাপন করতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ঘানি টানা খুবই কষ্টের কাজ। তারপরও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন এই পরিশ্রম করতে হচ্ছে। আগে ঘানি টানার কাজে গরু ব্যবহার করা হলেও এখন গরু না থাকায় নিজেকেই সেই কাজ করতে হয়।’

‘কাঠের ঘানির সঙ্গে পাথরের ভার নিয়ে শরীরের শক্তিতে ঘুরতে হয়, তারপর সরিষা থেকে তেল বের হয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এভাবেই কাজ করে আসছি। বয়স বাড়লেও কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই। কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও ঘানি টেনে তেল তৈরি করে যাচ্ছি। এই কাজের ওপর নির্ভর করেই আমার সংসার চলে। আর এ কাজে আমাকে সাহায্য করেন আমার স্ত্রী’, বলছিলেন শম্ভু সাহা।

শম্ভু সাহার স্ত্রী গাজলী রানী সাহা বলেন, ‘গরুর অভাবে প্রায় পাঁচ মণ ওজনের পাথরবোঝাই কাঠের ঘানি আমাদের নিজেদেরই টানতে হয়। আমার স্বামী যখন বুকের শক্তি দিয়ে এত ভারী ঘানি টানেন, তখন তার কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগে। এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। তাই স্বামীর কষ্ট কিছুটা কমাতে আমিও তার সঙ্গে ঘানি টানার কাজে সহযোগিতা করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর নিজের টাকায় সরিষা কেনারও সামর্থ্য নেই। তাই অন্যের সরিষা মাড়াই করে যা পাওয়া যায়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাতে হয়। সরিষা মাড়াইয়ের পর যে খৈল পাওয়া যায়, সেটাই আমাদের আয়ের অন্যতম ভরসা। সংসারের খরচ চালানো, খাবার জোগাড় করা সবকিছুই আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। এত পরিশ্রম করার পরও আয় খুব বেশি হয় না। তারপরও পেটের দায়ে কাজ করে যেতে হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আধুনিক যন্ত্রে উৎপাদিত সরিষার তেলের তুলনায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে তৈরি তেলের প্রতি মানুষের আলাদা আগ্রহ রয়েছে। শম্ভু সাহা দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের কোনো জমিজমা নেই, আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত। এ কারণে একটি গরু কিনে ঘানি টানার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই নিজেদের শারীরিক শক্তি দিয়ে প্রায় পাঁচ মণ ওজনের পাথরবোঝাই ঘানি টানতে হচ্ছে। তাদের এই কষ্ট সত্যিই কষ্টদায়ক।’

আব্দুর রহিম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘মাথাব্যথা বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা হলে এই তেল মালিশ করি। ঠান্ডা-জ্বরের সময়ও অনেকে এই তেল ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ এভাবে ঘানিতে তৈরি সরিষার তেল ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু যারা এত কষ্ট করে এই তেল তৈরি করছেন, তাদের জীবনও অনেক কষ্টের। গরুর অভাবে স্বামী-স্ত্রীকে নিজেরাই ভারী ঘানি টানতে হয়। তাদের কষ্ট লাঘবে কেউ এগিয়ে এলে খুব ভালো হতো।’

দিন দিন বাজারে বাড়ছে ভেজাল তেলের দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন ধরনের ভেজাল তেলের ভিড়ে খাঁটি সরিষার তেল পাওয়া নিয়েও রয়েছে ক্রেতাদের উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল তৈরির এই প্রাচীন পদ্ধতি টিকিয়ে রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানি। অথচ একসময় গ্রামাঞ্চলে সরিষার তেল তৈরির অন্যতম মাধ্যম ছিল এই ঘানি। এই পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা।

দ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘কাঠের ঘানিতে সরিষা মাড়াই করে তেল উৎপাদন আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে এমন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। তাই এই ঘানি টিকিয়ে রাখা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগকে বাঁচিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা আর্থিক সংকটের কারণে ঘানি টানার জন্য গরু কিনতে পারছেন না, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লী উন্নয়ন বিভাগের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা বলেন, ‘দিন দিন গ্রাম থেকে শহর সব জায়গাতেই খাঁটি সরিষার তেলের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে বাজারে ভেজাল তেলের দৌরাত্ম্য বাড়ায় ভোক্তাদের জন্য মানসম্মত তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে তেল উৎপাদনের কারখানাগুলোকে সরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা গেলে খাঁটি সরিষার তেলের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি, এসব কারখানার আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এই পেশার প্রসার ঘটবে।’

এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান যুগে এসেও শম্ভু সাহাকে যেভাবে শারীরিক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে, তা সত্যিই কষ্টের। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

শুধু শম্ভু সাহা নন, তার দুই ভাই হরিপদ সাহা ও তারাপদ সাহাও একইভাবে বুকের শক্তিতে কাঠের ঘানি টেনে সরিষা পিষে আয় করছেন। এ আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালিয়ে আসছেন তিন ভাই।