দুই ট্রলি জব্দ, ডিলারসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা; কৃষকের বরাদ্দের সার কালোবাজারে ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থার দাবি
মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বৈরাটী ইউনিয়নে কৃষকদের জন্য সরকার নির্ধারিত ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় দুটি ট্রলি থেকে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি সার পরিবহনে ব্যবহৃত দুটি ট্রলিও জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় আটক দুইজনসহ অনুমোদিত সার ডিলার এবং আরও একজনকে আসামি করে মিঠামইন থানায় মামলা করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত
ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার নির্ধারিত বিতরণব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নিয়ে কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার সকাল ১১টার দিকে বৈরাটী বাজার থেকে সার অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পথে কাটখাল ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন কাটখাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. গাফফার। পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে সার পরিবহনের সময় শাহিন মিয়া ও জহির মিয়াকে আটক করে। পরে ট্রলি দুটিতে তল্লাশি চালিয়ে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, কৃষকদের জন্য নির্ধারিত এসব ভর্তুকিযুক্ত সার অনুমোদিত বিতরণব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
ডিলারসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা
মামলায় আটক শাহিন মিয়া ও জহির মিয়ার পাশাপাশি অনুমোদিত সার ডিলার মুস্তাফিজুল ইসলাম রতন এবং লিটনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মামলায় নাম আসা মুস্তাফিজুর ইসলাম রতন বৈরাটী ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং লিটন ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। তবে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
কৃষকের সার নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগ
সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি ও বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে সার সরবরাহ করে থাকে। কৃষকের জন্য নির্ধারিত সার যদি নির্ধারিত বিতরণব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তাহলে প্রকৃত কৃষকরা প্রয়োজনের সময় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন,
প্রয়োজনের সময় অনেক কৃষককেই সার সংগ্রহ করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। ফলে কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মাঠের কৃষকের ওপর।
তাদের দাবি, কৃষকের বরাদ্দের এক বস্তা সারও যেন কৃষকের হাতছাড়া না হয়। সরকারি ভর্তুকির সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
‘কৃষকের সার নিয়ে কারসাজি মেনে নেওয়া হবে না’
স্থানীয় কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ, কৃষকের মধ্যে সার সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
কৃষকদের ভাষ্য, সরকার কৃষকের স্বার্থে ভর্তুকি দিয়ে যে সার সরবরাহ করছে, তা যদি কোনো চক্রের মাধ্যমে বাজারের বাইরে চলে যায়, তাহলে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার থেকে বঞ্চিত হবেন, অন্যদিকে সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তারা বলেন, কৃষকের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের নিয়মিত বাজার তদারকি ও সার ডিলারদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
পুলিশের বক্তব্য
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ বলেন, কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার পাচারের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, অভিযানে জব্দ করা ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার ও দুটি ট্রলি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্তে ঘটনার সঙ্গে আরও কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকের দাবি—সারের বরাদ্দ কৃষকের ঘরেই পৌঁছাতে হবে
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এমনিতেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ফসল উৎপাদন করেন। বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও সেচের বাড়তি খরচের কারণে উৎপাদন ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে কৃষকের জন্য সরকার নির্ধারিত ভর্তুকিযুক্ত সার যদি নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তার বোঝা শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়েই পড়ে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, কৃষকের নামে বরাদ্দকৃত সার কোনোভাবেই কালোবাজারে যেতে দেওয়া যাবে না। সার ডিলারদের গুদাম, মজুত, বিক্রির হিসাব ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়মিত মনিটরিং করার পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে—তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের অভিযোগ, কৃষকের অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি হলে তা শুধু একটি অনিয়ম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাওরাঞ্চলের কৃষকের জীবিকা ও খাদ্য উৎপাদনের বিষয়।
তাই ১১১ বস্তা সার জব্দের ঘটনাটি যথাযথ তদন্ত করে সারের উৎস, গন্তব্য, পরিবহন অনুমোদন, ডিলারের ভূমিকা এবং এর পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না—সবকিছু খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষকদের প্রত্যাশা, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকির সার যাতে কোনোভাবেই কালোবাজারি বা অবৈধ বাণিজ্যের হাতিয়ার না হয়, সে জন্য প্রশাসন আরও কঠোর নজরদারি করবে।
কৃষকের সার কৃষকের কাছেই—এই নীতিই হোক হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাপনার মূল কথা।
Reporter Name 





















