ঢাকা ০৫:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ম্যাজিস্ট্রেসি ছেড়ে রাজনীতিতে, সালাহউদ্দিনের একাল-সেকাল উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখছে বগুড়া প্রশাসনের নাকের ডগায় ভুয়া জার্মান ক্লাব বিদেশি ক্লাবের সাইনবোর্ডে রমরমা মাদক ব্যবসা ঢাকা উত্তরে দুই, দক্ষিণে চার নেতা আলোচনায় বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী নয় বছর পর খুলল ওসমানী উদ্যান পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘সেরা পরামর্শ’ দিয়েছিলেন: ইশরাক প্রশাসনের নাকের ডগায় অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়ি’ বলে অভয় দেওয়া হয় আমন্ত্রিতদের ৫৯২ কোটি টাকায় খনন হবে দুটি নতুন কূপ, বাড়বে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী সাইবার সুরক্ষাসহ গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন হচ্ছে: তথ্যমন্ত্রী

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সফর সার্থক সাফল্যের মাইলফলক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:১১:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫৫ বার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক অসাধারণ সাফল্যের অধ্যায় হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বমঞ্চের সমাবেশে অংশ নিয়ে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং কৌশলগত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, অর্থনৈতিক সংস্কার, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক সাফল্যের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সার্থক এবং ফলপ্রসূ হয়েছে। শুধু কি তাই, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে হিন্দুত্ববাদী ভারতের ‘৬ নম্বর সদস্য হওয়ার স্বপ্ন’ কূটনৈতিক চালে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।

অধিবেশনের তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম ভাষণ দেন। সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া এই ভাষণ জাতিসংঘের ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায় রচনা করেছে। কারণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে এর আগে কখনো একই পরিবারের তিন সদস্যÑ বাবা, মা ও ছেলেÑ রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হিসেবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেননি। তারেক রহমান তার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য হিসেবে এই বিরল ইতিহাস গড়েন। ভাষণের শুরুতেই তিনি ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মরণ করেন এবং বাংলাদেশ যে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে, সেই বার্তা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন জানাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে একটি দূরদর্শী আহ্বান জানিয়ে বলেন, মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাই হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিশ্লেষকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে বাংলাদেশের এই দৃঢ় অঙ্গীকার বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমর্যাদা অনেক উজ্জ্বল করেছে।

দেশ মেরামতে সরকারের ‘থ্রি-আর কৌশল’ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশকে মেরামতে সরকার রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে। তিনি জানান, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি গাছ রোপণ ও চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের রোডম্যাপকে প্রশংসনীয় বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, বিশ্বমঞ্চে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি আদায়ে এটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এর মধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেপ এরদোগানের সঙ্গে নিউইয়র্কের ‘তুর্কি হাউস’-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সমন্বয়ে বার্ষিক ‘২+২ আলোচনা’ ও রাজনৈতিক পরামর্শ সভা আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করে। এরদোগান বাংলাদেশে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা দাবি করেন। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বিশ্ব শান্তি রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথমবারের মতো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয় এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, শিক্ষা, পর্যটন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও গভীর করতে তার দেশ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জবাবে তারেক রহমানও দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক গতিপথে সন্তোষ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ভারতীয় চাণক্যনীতির ফাঁদে পা দিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা দীর্ঘ দেড় যুগ পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈরী সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, ইরানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এক ব্রিফিংয়ে জানান, বাংলাদেশ দ্রুত সমাধান চায় এবং ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাধান হওয়ার পর যাতে জাহাজগুলো নিরাপদে দেশে ফিরতে পারে, সে ব্যাপারে ইরানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ ও ক্যারিবীয় দেশ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে ‘দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠায় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম সোবার্স এমপি নিজ নিজ দেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন। হুমায়ুন কবির বলেন, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, জি-৭৭সহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের অংশীদার হিসেবে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করতে বাংলাদেশ আগ্রহী। এই সমঝোতা স্মারক দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়মিত পর্যালোচনা, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদী তিনি।

এছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এবং মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইডলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও-এর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, টিকাদান কর্মসূচি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গেটস ফাউন্ডেশনের চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

এছাড়াও অধিবেশন চলাকালীন বাংলাদেশ বিমান বোয়িংয়ের সাথে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ (৫টি ড্রিমলাইনার ও ৬টি ৭৩৭-৮ মডেল) কেনার সম্পূরক চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তি প্রসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বোয়িংয়ের এই চুক্তিকে স্বাগত জানান এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই চুক্তিকে বাংলাদেশের বিমান খাতের আধুনিকায়ন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কূটনৈতিক ক্যারিশমা দেখাতে সক্ষম হন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে ওই সব বৈঠকের ফলাফল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ৫টি প্রস্তাব পেশ করেন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মূল লক্ষ্য ও ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিশন বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন অব্যাহত রাখার তাগিদ দেন এবং বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অগ্রগতি তুলে ধরেন।

এদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রশ্নে এক দৃঢ় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে সূচনালগ্নেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিরাপত্তা পরিষদকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বমূলক করা অপরিহার্য। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আফ্রিকার মতো বিশাল মহাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত রয়েছে, যা জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই আফ্রিকাসহ প্রতিনিধিত্বহীন অঞ্চলগুলোর স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার যৌক্তিক দাবি তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ড. খলিলুর রহমানের এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের এমন অবস্থানের ফলে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পেতে দীর্ঘদিন ধরে লবিং করে আসা ভারতের স্বপ্ন অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে। কারণ, ভারত দীর্ঘদিন থেকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিল। এ জন্য প্রচুর অর্থব্যয়ে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল। কিন্তু সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আফ্রিকার ন্যায্য দাবিকে বাইপাসিং করে ভারতকে স্থায়ী সদস্যপদ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ড. খলিলুর রহমানের এই অবস্থান কেবল নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিকেই শক্তিশালী করেনি, বরং ভারতের একতরফা সদস্যপদ দাবির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফল কূটনৈতিক সফরের প্রশংসা করে প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় দেওয়া পূর্ণাঙ্গ ভাষণ ও দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার স্পষ্ট বার্তা শুনে ব্যাপক উৎসাহ ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন’।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে যুক্তি, কূটনীতি ও শিক্ষাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের তারেক রহমানের আহ্বান অত্যন্ত দূরদর্শী। বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণে বাংলাদেশের এই অঙ্গীকার বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করেছে। সামগ্রিকভাবে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক সাফল্যের অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা আগামী দিনে পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ম্যাজিস্ট্রেসি ছেড়ে রাজনীতিতে, সালাহউদ্দিনের একাল-সেকাল

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সফর সার্থক সাফল্যের মাইলফলক

আপডেট টাইম : ০১:১১:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক অসাধারণ সাফল্যের অধ্যায় হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বমঞ্চের সমাবেশে অংশ নিয়ে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং কৌশলগত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, অর্থনৈতিক সংস্কার, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক সাফল্যের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সার্থক এবং ফলপ্রসূ হয়েছে। শুধু কি তাই, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে হিন্দুত্ববাদী ভারতের ‘৬ নম্বর সদস্য হওয়ার স্বপ্ন’ কূটনৈতিক চালে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।

অধিবেশনের তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম ভাষণ দেন। সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া এই ভাষণ জাতিসংঘের ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায় রচনা করেছে। কারণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে এর আগে কখনো একই পরিবারের তিন সদস্যÑ বাবা, মা ও ছেলেÑ রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হিসেবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেননি। তারেক রহমান তার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য হিসেবে এই বিরল ইতিহাস গড়েন। ভাষণের শুরুতেই তিনি ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মরণ করেন এবং বাংলাদেশ যে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে, সেই বার্তা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন জানাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে একটি দূরদর্শী আহ্বান জানিয়ে বলেন, মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাই হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিশ্লেষকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে বাংলাদেশের এই দৃঢ় অঙ্গীকার বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমর্যাদা অনেক উজ্জ্বল করেছে।

দেশ মেরামতে সরকারের ‘থ্রি-আর কৌশল’ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশকে মেরামতে সরকার রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে। তিনি জানান, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি গাছ রোপণ ও চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের রোডম্যাপকে প্রশংসনীয় বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, বিশ্বমঞ্চে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি আদায়ে এটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এর মধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেপ এরদোগানের সঙ্গে নিউইয়র্কের ‘তুর্কি হাউস’-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সমন্বয়ে বার্ষিক ‘২+২ আলোচনা’ ও রাজনৈতিক পরামর্শ সভা আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করে। এরদোগান বাংলাদেশে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা দাবি করেন। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বিশ্ব শান্তি রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথমবারের মতো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয় এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, শিক্ষা, পর্যটন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও গভীর করতে তার দেশ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জবাবে তারেক রহমানও দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক গতিপথে সন্তোষ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ভারতীয় চাণক্যনীতির ফাঁদে পা দিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা দীর্ঘ দেড় যুগ পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈরী সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, ইরানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এক ব্রিফিংয়ে জানান, বাংলাদেশ দ্রুত সমাধান চায় এবং ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাধান হওয়ার পর যাতে জাহাজগুলো নিরাপদে দেশে ফিরতে পারে, সে ব্যাপারে ইরানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ ও ক্যারিবীয় দেশ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে ‘দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠায় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম সোবার্স এমপি নিজ নিজ দেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন। হুমায়ুন কবির বলেন, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, জি-৭৭সহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের অংশীদার হিসেবে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করতে বাংলাদেশ আগ্রহী। এই সমঝোতা স্মারক দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়মিত পর্যালোচনা, বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদী তিনি।

এছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এবং মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইডলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও-এর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, টিকাদান কর্মসূচি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গেটস ফাউন্ডেশনের চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

এছাড়াও অধিবেশন চলাকালীন বাংলাদেশ বিমান বোয়িংয়ের সাথে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ (৫টি ড্রিমলাইনার ও ৬টি ৭৩৭-৮ মডেল) কেনার সম্পূরক চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তি প্রসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বোয়িংয়ের এই চুক্তিকে স্বাগত জানান এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই চুক্তিকে বাংলাদেশের বিমান খাতের আধুনিকায়ন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কূটনৈতিক ক্যারিশমা দেখাতে সক্ষম হন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে ওই সব বৈঠকের ফলাফল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ৫টি প্রস্তাব পেশ করেন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মূল লক্ষ্য ও ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিশন বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন অব্যাহত রাখার তাগিদ দেন এবং বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অগ্রগতি তুলে ধরেন।

এদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রশ্নে এক দৃঢ় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে সূচনালগ্নেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিরাপত্তা পরিষদকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বমূলক করা অপরিহার্য। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আফ্রিকার মতো বিশাল মহাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত রয়েছে, যা জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই আফ্রিকাসহ প্রতিনিধিত্বহীন অঞ্চলগুলোর স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার যৌক্তিক দাবি তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ড. খলিলুর রহমানের এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের এমন অবস্থানের ফলে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পেতে দীর্ঘদিন ধরে লবিং করে আসা ভারতের স্বপ্ন অনেকটাই পেছনে পড়ে গেছে। কারণ, ভারত দীর্ঘদিন থেকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিল। এ জন্য প্রচুর অর্থব্যয়ে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল। কিন্তু সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আফ্রিকার ন্যায্য দাবিকে বাইপাসিং করে ভারতকে স্থায়ী সদস্যপদ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ড. খলিলুর রহমানের এই অবস্থান কেবল নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিকেই শক্তিশালী করেনি, বরং ভারতের একতরফা সদস্যপদ দাবির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফল কূটনৈতিক সফরের প্রশংসা করে প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় দেওয়া পূর্ণাঙ্গ ভাষণ ও দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার স্পষ্ট বার্তা শুনে ব্যাপক উৎসাহ ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন’।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে যুক্তি, কূটনীতি ও শিক্ষাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের তারেক রহমানের আহ্বান অত্যন্ত দূরদর্শী। বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণে বাংলাদেশের এই অঙ্গীকার বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করেছে। সামগ্রিকভাবে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক সাফল্যের অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা আগামী দিনে পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করবে।