ঢাকা ০৪:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
পুলিশে যুক্ত হচ্ছে নতুন ইউনিট, শাখা থাকবে যেসব এলাকায় বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত : প্রধানমন্ত্রী পুলিশের কেউ ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত হলে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিটি থেকে ইউনাইটেডে করিম কাসিম নিউইয়র্কে ৪ দিনে ৩০ কর্মসূচি, ১১ দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর: মাহদী আমিন নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সফর সার্থক সাফল্যের মাইলফলক টিকাদানে গাফিলতির কারণে হামে শিশুদের প্রাণহানি হয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্ব পর্যটন দিবস : ১৩ ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার’ কোনো ‘প্ল্যান’ ছাড়াই যা করেন জয়া আহসান হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না

কৃষির ১১ প্রকল্পের পিডি বদলের উদ্যোগ আটকে দিলেন মন্ত্রী

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০২:৪৭:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৩ বার

নিয়মিত প্রক্রিয়া ছাড়াই জুম বৈঠক, তড়িঘড়ি করে তালিকা তৈরির অভিযোগ

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আওতায় চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আকস্মিকভাবে জুম প্ল্যাটফর্মে বৈঠক করে নতুন পিডি নিয়োগের তালিকা তৈরি করা হয়। পরে বিষয়টি কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে তিনি প্রস্তাবটি আটকে দেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিএইর অধীনে বাস্তবায়নাধীন ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য নতুন পিডি হিসেবে তিনজন করে কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পিডিদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে প্রস্তাবনায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল না।

সূত্রের দাবি, আগাম কোনো নোটিশ ছাড়াই গত রোববার পিডি পরিবর্তনের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে একটি জুম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। বৈঠকে একাধিক প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর দ্রুততার সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রস্তাবটি অনুমোদন না দিয়ে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

‘এভাবে একসঙ্গে পিডি বদলের নজির দেখিনি’
বৈঠকে অংশ নেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাকরি জীবনে একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের জন্য এ ধরনের প্রক্রিয়া তিনি দেখেননি।

তার ভাষ্য, সাধারণত কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে, প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে অথবা প্রশাসনিক প্রয়োজন দেখা দিলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগ্যতা, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত দক্ষতা ও পূর্ববর্তী কর্মসম্পাদন বিবেচনা করে নতুন পিডি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু এবার প্রস্তাবিত কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। একই সঙ্গে বর্তমান পিডিদের পরিবর্তনের কারণও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।

আগে থেকেই তালিকা প্রস্তুতের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, পিডি পরিবর্তনের জন্য আগে থেকেই একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরে সেটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অংশ হিসেবে জুম বৈঠক আয়োজন করা হয়।

ওই সূত্র আরও দাবি করে, প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক নেতাসহ দুজন ব্যক্তি কৃষি সচিবের সঙ্গে দেখা করে পিডি পরিবর্তনের একটি তালিকা দেন। এরপরই বৈঠক এবং পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যেসব প্রকল্পে পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব

ডিএই থেকে পাঠানো প্রস্তাবে একসঙ্গে ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার কম্পিটিটিভনেস, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্প।

কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ঘিরে প্রশ্ন

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাশরুম প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগের তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি বদলি হয়ে রংপুরে যাওয়া মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের পিডি হিসেবে দীর্ঘদিন অন্য একটি প্রকল্পে ডিপিডির দায়িত্ব পালন করা এম এম আব্দুর রাজ্জাকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পিডি আব্দুল কায়ূম মজুমদারকে পরিবর্তন করে তার স্থলে বান্দরবানে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তার অতীতের একটি বিভাগীয় শাস্তির বিষয় উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।

এ ছাড়া স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পরিচালক হিসেবে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার তুলনায় তার জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, পছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের পিডি পদে বসাতে ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির আলোচনা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আগেও পিডি পরিবর্তনে তদবির

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পিডি পরিবর্তন নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরের অভিযোগ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর এক দফায় ১২ জন পিডি পরিবর্তন করা হয়। এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিভিন্ন মহল থেকে পিডি পরিবর্তনের জন্য তদবিরের অভিযোগ ওঠে।

এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এব) এবং কৃষক দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও এ ধরনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এর আগে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার পিডি পরিবর্তনের তালিকা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

এদিকে ডিএইর মহাপরিচালকের সঙ্গে সোমবার রাতে এবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার, সদস্যসচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবসহ কয়েকজন নেতার বৈঠক হয়েছে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। বৈঠকে পিডি পদপ্রত্যাশী কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বর্তমান একজন পিডিও উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রটি দাবি করেছে। তবে বৈঠকের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পিডি নিয়োগে যাচাই-বাছাইয়ের দাবি

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, দরপত্র ও ক্রয় কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের কাজ তদারক এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই পিডি নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও পূর্ববর্তী কর্মসম্পাদন যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাদের অভিযোগ, এবার এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই একযোগে ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রীর সিদ্ধান্তে থেমে গেল উদ্যোগ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেখে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে তিনি প্রস্তাবটির বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।

তবে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, প্রকল্পের অগ্রগতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

পুলিশে যুক্ত হচ্ছে নতুন ইউনিট, শাখা থাকবে যেসব এলাকায়

কৃষির ১১ প্রকল্পের পিডি বদলের উদ্যোগ আটকে দিলেন মন্ত্রী

আপডেট টাইম : ০২:৪৭:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিয়মিত প্রক্রিয়া ছাড়াই জুম বৈঠক, তড়িঘড়ি করে তালিকা তৈরির অভিযোগ

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আওতায় চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আকস্মিকভাবে জুম প্ল্যাটফর্মে বৈঠক করে নতুন পিডি নিয়োগের তালিকা তৈরি করা হয়। পরে বিষয়টি কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে তিনি প্রস্তাবটি আটকে দেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিএইর অধীনে বাস্তবায়নাধীন ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য নতুন পিডি হিসেবে তিনজন করে কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পিডিদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে প্রস্তাবনায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল না।

সূত্রের দাবি, আগাম কোনো নোটিশ ছাড়াই গত রোববার পিডি পরিবর্তনের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে একটি জুম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। বৈঠকে একাধিক প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর দ্রুততার সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রস্তাবটি অনুমোদন না দিয়ে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

‘এভাবে একসঙ্গে পিডি বদলের নজির দেখিনি’
বৈঠকে অংশ নেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাকরি জীবনে একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের জন্য এ ধরনের প্রক্রিয়া তিনি দেখেননি।

তার ভাষ্য, সাধারণত কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে, প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে অথবা প্রশাসনিক প্রয়োজন দেখা দিলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগ্যতা, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত দক্ষতা ও পূর্ববর্তী কর্মসম্পাদন বিবেচনা করে নতুন পিডি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু এবার প্রস্তাবিত কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। একই সঙ্গে বর্তমান পিডিদের পরিবর্তনের কারণও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।

আগে থেকেই তালিকা প্রস্তুতের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, পিডি পরিবর্তনের জন্য আগে থেকেই একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরে সেটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অংশ হিসেবে জুম বৈঠক আয়োজন করা হয়।

ওই সূত্র আরও দাবি করে, প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক নেতাসহ দুজন ব্যক্তি কৃষি সচিবের সঙ্গে দেখা করে পিডি পরিবর্তনের একটি তালিকা দেন। এরপরই বৈঠক এবং পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যেসব প্রকল্পে পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব

ডিএই থেকে পাঠানো প্রস্তাবে একসঙ্গে ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার কম্পিটিটিভনেস, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্প।

কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ঘিরে প্রশ্ন

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাশরুম প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগের তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি বদলি হয়ে রংপুরে যাওয়া মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের পিডি হিসেবে দীর্ঘদিন অন্য একটি প্রকল্পে ডিপিডির দায়িত্ব পালন করা এম এম আব্দুর রাজ্জাকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পিডি আব্দুল কায়ূম মজুমদারকে পরিবর্তন করে তার স্থলে বান্দরবানে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তার অতীতের একটি বিভাগীয় শাস্তির বিষয় উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।

এ ছাড়া স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পরিচালক হিসেবে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার তুলনায় তার জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, পছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের পিডি পদে বসাতে ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির আলোচনা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আগেও পিডি পরিবর্তনে তদবির

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পিডি পরিবর্তন নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন মহল থেকে তদবিরের অভিযোগ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর এক দফায় ১২ জন পিডি পরিবর্তন করা হয়। এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিভিন্ন মহল থেকে পিডি পরিবর্তনের জন্য তদবিরের অভিযোগ ওঠে।

এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এব) এবং কৃষক দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও এ ধরনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এর আগে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার পিডি পরিবর্তনের তালিকা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

এদিকে ডিএইর মহাপরিচালকের সঙ্গে সোমবার রাতে এবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার, সদস্যসচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবসহ কয়েকজন নেতার বৈঠক হয়েছে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। বৈঠকে পিডি পদপ্রত্যাশী কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বর্তমান একজন পিডিও উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রটি দাবি করেছে। তবে বৈঠকের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পিডি নিয়োগে যাচাই-বাছাইয়ের দাবি

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, দরপত্র ও ক্রয় কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের কাজ তদারক এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই পিডি নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও পূর্ববর্তী কর্মসম্পাদন যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাদের অভিযোগ, এবার এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই একযোগে ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রীর সিদ্ধান্তে থেমে গেল উদ্যোগ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেখে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে তিনি প্রস্তাবটির বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।

তবে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, প্রকল্পের অগ্রগতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।