জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টন কিংবা মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে “দাগ নম্বর” একটি অপরিহার্য পরিচিতি চিহ্ন। খতিয়ান, দলিল বা মৌজা ম্যাপে থাকা এই নম্বরের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট জমির অবস্থান ও সীমানা শনাক্ত করা হয়। তবে বাটা দাগ, ছুট দাগ কিংবা হাল-সাবেক দাগের পার্থক্য নিয়ে অনেকেরই ধারণা স্পষ্ট নয়।
দাগ নম্বর আসলে কী
মানুষের পরিচয় যেমন নামে প্রকাশ পায়, জমির খণ্ডের পরিচয় প্রকাশ পায় দাগ নম্বরে। সরকারের জরিপ বিভাগ দেশের সব ভূমিকে খণ্ডে ভাগ করে প্রতিটি অংশে একটি করে ক্রমিক নম্বর বসায় — গ্রাম, মৌজা ও পাড়াভিত্তিক এই বিন্যাস অনুযায়ী। একই মালিকের একাধিক প্লট থাকলেও প্রতিটি আলাদা দাগ নম্বর পায়, আর এই নম্বর দিয়েই দাগের সীমানা নির্ধারিত হয়। মালিকের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার, দান বা বিক্রির কারণে জমি ভাগ হলে জরিপ বিভাগ প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নম্বর দিয়ে থাকে।
নম্বর দেওয়ার নিয়ম
মৌজা নকশায় দাগ নম্বর মালিকানার ক্রম অনুসারে বসে না, বরং শুরু হয় মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে, জমির ভৌগোলিক অবস্থানের ক্রমানুসারে। ফলে এক ব্যক্তির একই মৌজায় আটটি জমি থাকলেও সেগুলো পরপর ১ থেকে ৮ নম্বর পাবে না। একই দাগে একাধিক মালিক থাকলে প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। এই নম্বর পরবর্তী জরিপ না হওয়া পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে।
বাটা দাগ ও ছুট দাগ
নকশা তৈরির সময় ভুলবশত কোনো প্লট নম্বর বাদ পড়ে গেলে সংশোধনের জন্য বিশেষ কৌশলে যে নম্বর বসানো হয়, তাকে বলে বাটা দাগ। এক্ষেত্রে শেষ প্লট নম্বরের পরের সংখ্যা নিচে এবং বাদ পড়া প্লটের ঠিক আগের নম্বর ওপরে বসিয়ে ভগ্নাংশের মতো একটি নম্বর তৈরি হয় — সেটাই ওই বাদ পড়া প্লটের পরিচয়।
অন্যদিকে “ছুট” মানে বাদ পড়া। নতুন মৌজা ম্যাপ তৈরির সময় প্লটের অস্তিত্ব থাকলেও নম্বর বাদ পড়ে গেলে, অথবা অস্তিত্বহীন কোনো নম্বর বাদ দেওয়ার দরকার হলে, সেটিকে ছুট দাগ বলা হয়। যেমন ২৪, ২৫, ২৭, ২৮ — এখানে ২৬ নম্বরটি ছুট। এই ধরনের অস্তিত্বহীন নম্বর দিয়ে জমি বেচাকেনা বা বন্ধক দিলে ক্রেতা বা বন্ধকগ্রহীতা বাস্তবে সেই দাগ খুঁজেই পাবেন না।
কখনো কখনো একই মালিকের পাশাপাশি দুটি জমি একত্র করে একটি নম্বরে আনা হলে, বাড়তি নম্বরটি বাদ (ছুট) দিতে হয়।
সাব দাগ বা বাই নম্বর
কেউ একটি প্লটের অংশবিশেষ (যেমন এক-তৃতীয়াংশ) বিক্রি করলে ক্রেতার নামে নতুন একটি সাব বা বাই নম্বর তৈরি হয় — যেমন মূল দাগ ৩০১ হলে নতুন অংশ হবে ৩০১/১। পরবর্তী জরিপে এই সাব নম্বরই স্বতন্ত্র দাগ নম্বর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে জরিপ বিভাগ ছাড়া অন্য কারও করা এই ধরনের ভাগকে আইনগতভাবে দাগ নম্বর হিসেবে গণ্য করা হয় না; একে বড়জোর “খণ্ড দাগ” বলা যায়।
হাল ও সাবেক দাগ-খতিয়ান
খতিয়ান ও দাগ নম্বরের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও দুটি সবসময় এক নাও হতে পারে। বর্তমানে কার্যকর নম্বরকে বলে হাল দাগ বা হাল খতিয়ান। জমি বিক্রি হয়ে গেলে পুরনো নম্বরটি হয়ে যায় সাবেক দাগ বা সাবেক খতিয়ান, আর নতুন দলিলে যুক্ত নম্বরটি হয় হাল নম্বর।
দলিল যাচাইয়ের সময় তাই হাল ও সাবেক — উভয় খতিয়ান এবং দাগ নম্বরের মধ্যে ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখা জরুরি।
Reporter Name 























