ঢাকা ১২:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বপ্রথম যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১ বার
মুমিনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাতে প্রবেশ করা। সেই জান্নাত, যার সৌন্দর্য মানুষের কল্পনারও ঊর্ধ্বে; যেখানে নেই মৃত্যু, নেই দুঃখ-কষ্ট, নেই রোগ-শোক, নেই বিচ্ছেদ কিংবা বার্ধক্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই মহিমান্বিত জান্নাতে সবার আগে কারা প্রবেশ করবেন?সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়বেন রাসুলুল্লাহ (সা.)

সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.) হবেন জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই এ সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়ব।’ (সহিহ মুসলিম)

কী অপূর্ব মর্যাদা! পৃথিবীতে তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী; আর আখিরাতে তিনিই হবেন জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী।

সবার পরে এলেও জান্নাতে অগ্রগামী হবে উম্মতে মুহাম্মদি

উম্মতে মুহাম্মদির জন্যও রয়েছে বিশেষ সম্মান। আগের উম্মতদের তুলনায় এই উম্মতের আগমন পৃথিবীর ইতিহাসে পরে হলেও কিয়ামতের দিন তারা জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমরা সর্বশেষ আগমনকারী, কিন্তু কিয়ামতের দিন অগ্রগামী।’ এরপর তিনি বলেন, অন্য জাতিগুলোকে আমাদের আগে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের তাদের পরে কিতাব দেওয়া হয়েছে।

(সহিহ বুখারি)উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে সর্বপ্রথম—আবু বকর (রা.)

উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করবেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ সাহাবি ও প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) তাঁর হাত ধরে তাঁকে জান্নাতের সেই দরজা দেখিয়েছেন, যেদিক দিয়ে তাঁর উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন আবু বকর (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি চাই, আপনার সঙ্গে আমিও যেন সেই দরজা দেখতে পারি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে আবু বকর! জেনে রাখো, আমার উম্মতের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম এতে প্রবেশ করবে।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৫২)

সর্বপ্রথম প্রবেশকারী দল—দরিদ্র মুহাজিররা

শুধু ব্যক্তি নয়, জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী একটি বিশেষ দলের কথাও রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্ণনা করেছেন।

তাঁরা হলেন দরিদ্র মুহাজিরগণ। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারা সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ তিনি বললেন, দরিদ্র মুহাজিররা। তাঁরা এমন মানুষ ছিলেন, যারা আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ ছেড়ে হিজরত করেছিলেন।সীমান্ত পাহারা দেওয়া, বিপদ মোকাবিলা করা এবং আল্লাহর পথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করাই ছিল তাঁদের জীবন। তাঁদের অনেক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল; কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য থেকে তাঁরা বিচ্যুত হননি। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ফেরেশতাদের তাঁদের কাছে গিয়ে সালাম জানাতে বলবেন। ফেরেশতারা তাঁদের কাছে গিয়ে বলবে, ‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, কারণ তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলে। কতই না উত্তম এই পরিণাম!’ (মুসনাদ আহমদ: ৬৫৭০)

দরিদ্ররা কেন এত মর্যাদা পাবেন?

দারিদ্র্য নিজে কোনো গুণ নয়, যেমন সম্পদ নিজে কোনো অপরাধ নয়। ইসলামে মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও আনুগত্য। তবে যারা দারিদ্র্যের মধ্যেও ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর আনুগত্য ধরে রাখে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের উৎসর্গ করে, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। এক বর্ণনায় এসেছে, দরিদ্র মুহাজিররা ধনীদের চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) দরিদ্র মুহাজিরদের একটি দলের কাছে এসে বললেন, ‘দরিদ্র মুহাজিরগণ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের চেহারা উজ্জ্বল হোক। তোমরা ধনীদের অর্ধেক দিন—অর্থাৎ চল্লিশ বছর—আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুনানে দারেমি, হাদিস : ২৭২১)

জান্নাতের প্রথম দলটির চেহারা কেমন হবে?

জান্নাতে প্রবেশকারী প্রথম দলটির সৌন্দর্য ও মর্যাদার বর্ণনাও হাদিসে এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বপ্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে।’ তাদের পরবর্তী দলটি হবে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার মতো দীপ্তিমান। তাদের সেখানে কোনো প্রাকৃতিক অপবিত্রতা থাকবে না। থাকবে না পেশাব-পায়খানা। তাদের পাত্র হবে স্বর্ণের। তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণ ও রুপার। তাদের ঘাম থেকে মিশকের সুগন্ধ ছড়াবে। তারা পরস্পরের মধ্যে কোনো বিরোধ, বিদ্বেষ কিংবা হিংসা রাখবে না। তাদের অন্তর হবে এক ব্যক্তির অন্তরের মতো—অর্থাৎ সম্পূর্ণ নির্মল ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ। তারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৩৪)

আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত নসিব করুন এবং সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী সৌভাগ্যবান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সর্বপ্রথম যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন

আপডেট টাইম : ১২:১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মুমিনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাতে প্রবেশ করা। সেই জান্নাত, যার সৌন্দর্য মানুষের কল্পনারও ঊর্ধ্বে; যেখানে নেই মৃত্যু, নেই দুঃখ-কষ্ট, নেই রোগ-শোক, নেই বিচ্ছেদ কিংবা বার্ধক্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই মহিমান্বিত জান্নাতে সবার আগে কারা প্রবেশ করবেন?সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়বেন রাসুলুল্লাহ (সা.)

সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.) হবেন জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই এ সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়ব।’ (সহিহ মুসলিম)

কী অপূর্ব মর্যাদা! পৃথিবীতে তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী; আর আখিরাতে তিনিই হবেন জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী।

সবার পরে এলেও জান্নাতে অগ্রগামী হবে উম্মতে মুহাম্মদি

উম্মতে মুহাম্মদির জন্যও রয়েছে বিশেষ সম্মান। আগের উম্মতদের তুলনায় এই উম্মতের আগমন পৃথিবীর ইতিহাসে পরে হলেও কিয়ামতের দিন তারা জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমরা সর্বশেষ আগমনকারী, কিন্তু কিয়ামতের দিন অগ্রগামী।’ এরপর তিনি বলেন, অন্য জাতিগুলোকে আমাদের আগে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের তাদের পরে কিতাব দেওয়া হয়েছে।

(সহিহ বুখারি)উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে সর্বপ্রথম—আবু বকর (রা.)

উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করবেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ সাহাবি ও প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) তাঁর হাত ধরে তাঁকে জান্নাতের সেই দরজা দেখিয়েছেন, যেদিক দিয়ে তাঁর উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন আবু বকর (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি চাই, আপনার সঙ্গে আমিও যেন সেই দরজা দেখতে পারি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে আবু বকর! জেনে রাখো, আমার উম্মতের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম এতে প্রবেশ করবে।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৫২)

সর্বপ্রথম প্রবেশকারী দল—দরিদ্র মুহাজিররা

শুধু ব্যক্তি নয়, জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী একটি বিশেষ দলের কথাও রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্ণনা করেছেন।

তাঁরা হলেন দরিদ্র মুহাজিরগণ। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারা সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ তিনি বললেন, দরিদ্র মুহাজিররা। তাঁরা এমন মানুষ ছিলেন, যারা আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ ছেড়ে হিজরত করেছিলেন।সীমান্ত পাহারা দেওয়া, বিপদ মোকাবিলা করা এবং আল্লাহর পথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করাই ছিল তাঁদের জীবন। তাঁদের অনেক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল; কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য থেকে তাঁরা বিচ্যুত হননি। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ফেরেশতাদের তাঁদের কাছে গিয়ে সালাম জানাতে বলবেন। ফেরেশতারা তাঁদের কাছে গিয়ে বলবে, ‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, কারণ তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলে। কতই না উত্তম এই পরিণাম!’ (মুসনাদ আহমদ: ৬৫৭০)

দরিদ্ররা কেন এত মর্যাদা পাবেন?

দারিদ্র্য নিজে কোনো গুণ নয়, যেমন সম্পদ নিজে কোনো অপরাধ নয়। ইসলামে মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও আনুগত্য। তবে যারা দারিদ্র্যের মধ্যেও ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর আনুগত্য ধরে রাখে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের উৎসর্গ করে, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। এক বর্ণনায় এসেছে, দরিদ্র মুহাজিররা ধনীদের চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) দরিদ্র মুহাজিরদের একটি দলের কাছে এসে বললেন, ‘দরিদ্র মুহাজিরগণ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের চেহারা উজ্জ্বল হোক। তোমরা ধনীদের অর্ধেক দিন—অর্থাৎ চল্লিশ বছর—আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুনানে দারেমি, হাদিস : ২৭২১)

জান্নাতের প্রথম দলটির চেহারা কেমন হবে?

জান্নাতে প্রবেশকারী প্রথম দলটির সৌন্দর্য ও মর্যাদার বর্ণনাও হাদিসে এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বপ্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে।’ তাদের পরবর্তী দলটি হবে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার মতো দীপ্তিমান। তাদের সেখানে কোনো প্রাকৃতিক অপবিত্রতা থাকবে না। থাকবে না পেশাব-পায়খানা। তাদের পাত্র হবে স্বর্ণের। তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণ ও রুপার। তাদের ঘাম থেকে মিশকের সুগন্ধ ছড়াবে। তারা পরস্পরের মধ্যে কোনো বিরোধ, বিদ্বেষ কিংবা হিংসা রাখবে না। তাদের অন্তর হবে এক ব্যক্তির অন্তরের মতো—অর্থাৎ সম্পূর্ণ নির্মল ও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ। তারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৩৪)

আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত নসিব করুন এবং সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী সৌভাগ্যবান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।