ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রের নেত্রী: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিযাত্রা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫২:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১ বার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিযাত্রা একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে জীবনযাপন থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী হয়ে ওঠার যে যাত্রা, তা কেবল একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক উত্থানের গল্প নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতন, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গেলে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তার সময়, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত ত্যাগকেও বিবেচনায় নিতে হয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিতে আসেননি। বরং একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাবিধুর জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সেই অর্থে তার রাজনীতিতে আগমন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিশেষ বাঁকবদলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে। একজন স্বামীহারা নারীর জন্য ব্যক্তিগত শোক সামলে ওঠাই যেখানে অত্যন্ত কঠিন, সেখানে তাকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় একটি গভীর জাতীয় রাজনৈতিক সংকট। জিয়াউর রহমানের কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু নিজের স্বামীকে হারানোর শোক বহন করেননি; সেই সময় গোটা জাতির যে শোক, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, সেটিও তিনি ধারণ করেছিলেন।

এই ঘটনাই তার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। ব্যক্তিগত পরিসরের একজন নারী ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার যাত্রা।

১৯৮২ সালে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বিস্তৃত হয়। ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত অস্থির। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়া এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশ একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছিল।

এই সময় খালেদা জিয়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতির মাঠে তার সক্রিয়তা তাকে শুধু বিএনপির নেত্রী হিসাবেই নয়, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দীর্ঘ আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ, গ্রেফতার, বাধা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে তার নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়, যা ছিল দৃঢ়তা ও আপসহীনতার সমন্বয়।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রায়ও তার রাজনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও তার রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।

তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত করা। এই নীতির মৌলিক জায়গাগুলোর মধ্যে ছিল ‘লুক ইস্ট পলিসি’র মাধ্যমে চীন থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং সার্ক ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তার প্রথম মেয়াদের সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। ১৯৯১-৯৫ মেয়াদে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে মিয়ানমার ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৩ জন শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, যা তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও মানবিক সংকট মোকাবিলার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ সময় করাচিতে আটকে পড়া বাঙালিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধেও তার সরকার কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়। ১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তানের তৎকালীন সরকার করাচি থেকে বাঙালিদের ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিলে বাংলাদেশ সরকার তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এবং কূটনৈতিক উপায়ে সেই প্রক্রিয়া প্রতিহত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি ছিল নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

একইভাবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ও যোগাযোগ-সংশ্লিষ্ট ইস্যু ছিল তিনবিঘা করিডর। ১৯৯২ সালের জুনে খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের সরকারের সময় তিনবিঘা করিডর দুই দেশের মানুষের ব্যবহারের জন্য পালাক্রমে ছয় ঘণ্টা করে উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা কার্যকর হয়। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণে এটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।

তবে একজন রাজনৈতিক নেতার জীবন শুধু ক্ষমতার সময় দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। বরং ক্ষমতার বাইরে থাকা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা এবং ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতাও একজন নেতার চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে এই দিকটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

তার জীবনের শেষ পর্যায় ছিল নানা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটে পূর্ণ। দীর্ঘদিনের মামলা, গ্রেফতার ও কারাবাস তার ব্যক্তিজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কারাগারে থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অসুস্থতা ও চিকিৎসার বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়।

কারাজীবনের অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে কারাবন্দিত্ব নিঃসন্দেহে একটি কঠিন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু তার রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে এই কারাবাস কেবল একজন ব্যক্তির বন্দিত্ব ছিল না; এটি তাদের কাছে রাজনৈতিক সংগ্রামেরই একটি অংশ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে তার অসুস্থতা ও চিকিৎসার প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগের বিষয়টি বহুবার সামনে এসেছে। চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি লন্ডনেও গিয়েছেন। কিন্তু বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসার ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

বিরোধী মহলে তাকে নিয়ে এমন আলোচনা ছিল যে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে হয়তো তিনি আর দেশে ফিরবেন না। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এই প্রত্যাবর্তন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান—বাংলাদেশই তার শেষ ঠিকানা—এই বিশ্বাসকেই যেন আরও শক্তিশালী করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার বাইরে দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, দেশে ফিরে আসার ঘটনা তার একটি প্রতীকী প্রকাশ।

একজন রাজনৈতিক নেতার দেশপ্রেম কেবল বক্তৃতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। বরং কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার বাস্তব প্রকাশ ঘটে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে এমন কিছু সিদ্ধান্ত রয়েছে, যেগুলো তার সমর্থকদের কাছে দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক হলো—জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক করা। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু ভৌগোলিক সীমারেখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।

একইভাবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি জড়িত। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার স্বল্পভাষী অথচ স্পষ্ট বক্তব্যের ধরন। তিনি রাজনৈতিক বক্তৃতায় সবসময় দীর্ঘ বাগ্মিতার ওপর নির্ভর করেননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার রাজনৈতিক আচরণ এবং বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টাও তার রাজনৈতিক চরিত্রের একটি দিক হিসেবে দেখা যায়।

রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চাপ সহ্য করা সহজ নয়। অনেক মানুষ যখন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে নিজেদের সীমিত পরিসরে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেন, তখন খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে পরিবার কেবল ব্যক্তিগত পরিবার ছিল না—তার রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যায় গোটা দেশের মানুষ ও তার রাজনৈতিক কর্মীদেরও তিনি বৃহত্তর পরিবারের অংশ হিসেবে দেখেছেন—এমন ধারণা তার রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত হয়েছে।

এখানেই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিহিত। একজন নেতার ব্যক্তিগত ত্যাগ তখনই রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে, যখন তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তার সমর্থকরা তার কারাবাস, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকার পরিচালনা, বিরোধী রাজনীতি এবং বিভিন্ন সময়ে নেওয়া অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। ভবিষ্যতের গবেষকরা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশপন্থি তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আজীবন অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন।

তার রাজনৈতিক জীবনাদর্শ থেকে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষাগ্রহণ করে দেশ গঠনে অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। আমার দৃষ্টিতে, তার জীবনাদর্শ থেকে প্রথম শিক্ষা হলো সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আদর্শকে কেবল স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন চিন্তা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তাই বর্তমান প্রজন্মকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করলেই হবে না; তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে হবে, পড়তে হবে, গবেষণা করতে হবে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছায়নি; গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্র সেই চেতনাকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী করেছে। একইভাবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যূত্থান ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাগুলোকেও লিখিত ইতিহাস, মৌখিক ইতিহাস এবং ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে আমাদের সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ওরাল হিস্ট্রি বা মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমসাময়িক ঘটনাগুলো বুঝতে সহায়তা করবে। তবে তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি শিক্ষা হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা। রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সময় লাগে, মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করতে সময় লাগে এবং একটি প্রজন্মের অর্জনকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিচালনা করবে। আগামী ২০ বছর পর দেশের রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নেতৃত্বে যারা থাকবে, তাদের একটি বড় অংশ আজকের তরুণ। তাই তাদের প্রস্তুত হতে হবে এখন থেকেই।

আমাদের মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল না করে। একটি দেশের শক্তি তার মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে। তাই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তরুণ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তায় মনোযোগী হতে হবে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে ইতিহাস মূল্যায়ন করবে, তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার অধ্যায় দীর্ঘ, গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক। গৃহবধূ থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে তার উত্থান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা, দীর্ঘ কারাজীবন, অসুস্থতার সঙ্গে সংগ্রাম, বিদেশে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তার অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা—সব মিলিয়ে তার জীবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইতিহাসের মূল্যায়ন শুধু অতীতকে স্মরণ করার জন্য নয়; ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণের জন্যও প্রয়োজন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন থেকে নতুন প্রজন্ম যদি গণতন্ত্রের মূল্য, সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব, রাজনৈতিক সহনশীলতা, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তাহলেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে প্রতিফলিত হবে।

লেখক: উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রের নেত্রী: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিযাত্রা

আপডেট টাইম : ১১:৫২:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিযাত্রা একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে জীবনযাপন থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী হয়ে ওঠার যে যাত্রা, তা কেবল একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক উত্থানের গল্প নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতন, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গেলে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তার সময়, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত ত্যাগকেও বিবেচনায় নিতে হয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিতে আসেননি। বরং একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাবিধুর জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সেই অর্থে তার রাজনীতিতে আগমন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিশেষ বাঁকবদলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে। একজন স্বামীহারা নারীর জন্য ব্যক্তিগত শোক সামলে ওঠাই যেখানে অত্যন্ত কঠিন, সেখানে তাকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় একটি গভীর জাতীয় রাজনৈতিক সংকট। জিয়াউর রহমানের কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু নিজের স্বামীকে হারানোর শোক বহন করেননি; সেই সময় গোটা জাতির যে শোক, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, সেটিও তিনি ধারণ করেছিলেন।

এই ঘটনাই তার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। ব্যক্তিগত পরিসরের একজন নারী ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার যাত্রা।

১৯৮২ সালে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বিস্তৃত হয়। ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত অস্থির। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়া এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশ একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছিল।

এই সময় খালেদা জিয়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতির মাঠে তার সক্রিয়তা তাকে শুধু বিএনপির নেত্রী হিসাবেই নয়, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দীর্ঘ আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ, গ্রেফতার, বাধা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে তার নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়, যা ছিল দৃঢ়তা ও আপসহীনতার সমন্বয়।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রায়ও তার রাজনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও তার রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।

তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত করা। এই নীতির মৌলিক জায়গাগুলোর মধ্যে ছিল ‘লুক ইস্ট পলিসি’র মাধ্যমে চীন থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা এবং সার্ক ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তার প্রথম মেয়াদের সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। ১৯৯১-৯৫ মেয়াদে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে মিয়ানমার ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৩ জন শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, যা তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও মানবিক সংকট মোকাবিলার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ সময় করাচিতে আটকে পড়া বাঙালিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধেও তার সরকার কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়। ১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তানের তৎকালীন সরকার করাচি থেকে বাঙালিদের ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিলে বাংলাদেশ সরকার তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এবং কূটনৈতিক উপায়ে সেই প্রক্রিয়া প্রতিহত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি ছিল নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

একইভাবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ও যোগাযোগ-সংশ্লিষ্ট ইস্যু ছিল তিনবিঘা করিডর। ১৯৯২ সালের জুনে খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের সরকারের সময় তিনবিঘা করিডর দুই দেশের মানুষের ব্যবহারের জন্য পালাক্রমে ছয় ঘণ্টা করে উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা কার্যকর হয়। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণে এটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।

তবে একজন রাজনৈতিক নেতার জীবন শুধু ক্ষমতার সময় দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। বরং ক্ষমতার বাইরে থাকা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করা এবং ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতাও একজন নেতার চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে এই দিকটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

তার জীবনের শেষ পর্যায় ছিল নানা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটে পূর্ণ। দীর্ঘদিনের মামলা, গ্রেফতার ও কারাবাস তার ব্যক্তিজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কারাগারে থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অসুস্থতা ও চিকিৎসার বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়।

কারাজীবনের অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে কারাবন্দিত্ব নিঃসন্দেহে একটি কঠিন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু তার রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে এই কারাবাস কেবল একজন ব্যক্তির বন্দিত্ব ছিল না; এটি তাদের কাছে রাজনৈতিক সংগ্রামেরই একটি অংশ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে তার অসুস্থতা ও চিকিৎসার প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগের বিষয়টি বহুবার সামনে এসেছে। চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি লন্ডনেও গিয়েছেন। কিন্তু বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসার ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।

বিরোধী মহলে তাকে নিয়ে এমন আলোচনা ছিল যে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে হয়তো তিনি আর দেশে ফিরবেন না। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এই প্রত্যাবর্তন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান—বাংলাদেশই তার শেষ ঠিকানা—এই বিশ্বাসকেই যেন আরও শক্তিশালী করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার বাইরে দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, দেশে ফিরে আসার ঘটনা তার একটি প্রতীকী প্রকাশ।

একজন রাজনৈতিক নেতার দেশপ্রেম কেবল বক্তৃতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। বরং কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার বাস্তব প্রকাশ ঘটে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে এমন কিছু সিদ্ধান্ত রয়েছে, যেগুলো তার সমর্থকদের কাছে দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক হলো—জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক করা। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু ভৌগোলিক সীমারেখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।

একইভাবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি জড়িত। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার স্বল্পভাষী অথচ স্পষ্ট বক্তব্যের ধরন। তিনি রাজনৈতিক বক্তৃতায় সবসময় দীর্ঘ বাগ্মিতার ওপর নির্ভর করেননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার রাজনৈতিক আচরণ এবং বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টাও তার রাজনৈতিক চরিত্রের একটি দিক হিসেবে দেখা যায়।

রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চাপ সহ্য করা সহজ নয়। অনেক মানুষ যখন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে নিজেদের সীমিত পরিসরে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেন, তখন খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে পরিবার কেবল ব্যক্তিগত পরিবার ছিল না—তার রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যায় গোটা দেশের মানুষ ও তার রাজনৈতিক কর্মীদেরও তিনি বৃহত্তর পরিবারের অংশ হিসেবে দেখেছেন—এমন ধারণা তার রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত হয়েছে।

এখানেই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিহিত। একজন নেতার ব্যক্তিগত ত্যাগ তখনই রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে, যখন তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তার সমর্থকরা তার কারাবাস, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকার পরিচালনা, বিরোধী রাজনীতি এবং বিভিন্ন সময়ে নেওয়া অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। ভবিষ্যতের গবেষকরা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশপন্থি তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আজীবন অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন।

তার রাজনৈতিক জীবনাদর্শ থেকে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষাগ্রহণ করে দেশ গঠনে অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। আমার দৃষ্টিতে, তার জীবনাদর্শ থেকে প্রথম শিক্ষা হলো সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আদর্শকে কেবল স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন চিন্তা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তাই বর্তমান প্রজন্মকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করলেই হবে না; তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে হবে, পড়তে হবে, গবেষণা করতে হবে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছায়নি; গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্র সেই চেতনাকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী করেছে। একইভাবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যূত্থান ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাগুলোকেও লিখিত ইতিহাস, মৌখিক ইতিহাস এবং ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে আমাদের সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ওরাল হিস্ট্রি বা মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমসাময়িক ঘটনাগুলো বুঝতে সহায়তা করবে। তবে তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি শিক্ষা হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা। রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সময় লাগে, মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করতে সময় লাগে এবং একটি প্রজন্মের অর্জনকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিচালনা করবে। আগামী ২০ বছর পর দেশের রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নেতৃত্বে যারা থাকবে, তাদের একটি বড় অংশ আজকের তরুণ। তাই তাদের প্রস্তুত হতে হবে এখন থেকেই।

আমাদের মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল না করে। একটি দেশের শক্তি তার মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে। তাই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তরুণ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তায় মনোযোগী হতে হবে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে ইতিহাস মূল্যায়ন করবে, তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার অধ্যায় দীর্ঘ, গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক। গৃহবধূ থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে তার উত্থান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা, দীর্ঘ কারাজীবন, অসুস্থতার সঙ্গে সংগ্রাম, বিদেশে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসা এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তার অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা—সব মিলিয়ে তার জীবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইতিহাসের মূল্যায়ন শুধু অতীতকে স্মরণ করার জন্য নয়; ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণের জন্যও প্রয়োজন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন থেকে নতুন প্রজন্ম যদি গণতন্ত্রের মূল্য, সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব, রাজনৈতিক সহনশীলতা, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তাহলেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে প্রতিফলিত হবে।

লেখক: উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়