একসময় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন রাজশাহীর বাগমারার ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে তার জীবনযাত্রা। গড়ে তুলেছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি, ব্যবহার করছেন বিলাসবহুল গাড়ি, গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ও এনজিও। আর এই বিত্ত-বৈভবের পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাগমারায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি। পলাতক নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেওয়া, গোপন বৈঠক আয়োজন এবং সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অটোরিকশাচালক থেকে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই ফিরোজই কি বাগমারায় আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের নেপথ্যের মূল কারিগর?
অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহী জেলা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দিকনির্দেশনায় ফিরোজ শুরু করেছেন ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতা। এলাকার পাশাপাশি ফিরোজ সাভারে বিশাল বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাগমারা থেকে পলাতক নেতাকর্মীদের ঠাঁই দিয়েছেন। তার কাছে আসছে আওয়ামী লীগের বিপুল অঙ্কের তহবিল। তবে ১২ আগস্ট নিজস্ব এনজিও কার্যালয়ে গোপন বৈঠক চলাকালে ফিরোজের শীর্ষ সহযোগীরা পালিয়ে গেলেও তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, ফিরোজ এখন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রধান আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা। মাত্র তিন বছরের মধ্যে অটোরিকশাচালক থেকে অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক তিনি। এলাকায় তৈরি করেছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি। ব্যবহার করছেন লেটেস্ট মডেলের দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। রয়েছে কয়েক কোটি টাকার এনজিও ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়রা বলছেন, ওইদিন দুপুর ১২টায় ‘বাগমারা সবুজ বাংলা লি.’ নামে ফিরোজের মালিকানাধীন এনজিওতে বৈঠক শুরু হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক এমপি কারাবন্দি আবুল কালাম আজাদের শীর্ষ ক্যাডার তাহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাকিরুল ইসলাম সান্টুর ব্যক্তিগত সহকারী সাজেদুর রহমান, সাবেক সর্বহারা সদস্য আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত শহিদুল ইসলাম শহিদ, বাগামারাজুড়ে পুকুর খননের মূলহোতা সাবেক এমপি কালামের আরেক সহযোগী আমজাদ হোসেন এবং ছাত্রলীগকর্মী রেজোয়ান ও রাসেল।
২০২৪ এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকা থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করেন ফিরোজ। সাভারে বিশাল বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিজে থাকার পাশাপাশি পলাতক নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেন। তবে কয়েক মাস পরেই এলাকায় যাতায়াত শুরু করেন ফিরোজ। নিজস্ব বাহিনীকে আবারও সক্রিয় করে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফিরোজের সঙ্গে বর্তমানে সাংগঠনিক তৎপরতায় রয়েছেন ঝিকরা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মানিক হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জলিল মাস্টার, উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মালেক মণ্ডল, তাহেরপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানাসহ শীর্ষ নেতারা।
ঝিকড়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফিরোজ। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন। এছাড়া ফিরোজ তার ফেসবুক আইডি থেকেও জোর সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এদিকে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতে খোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ। এসবের মধ্যে ‘বাগমারা উপজেলা যুবলীগ’ অন্যতম। পেজটি নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবলীগ নেতা সোহেল রানা। এ পেজ থেকে নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং সরকারবিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘১২ আগস্ট গোপন বৈঠক চলাকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২৪ জুলাই ভবানীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে ককটেল হামলার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া ফিরোজের যেসব সহযোগী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছেন, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’
উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ঝিকরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান রতন বলেন, ‘ফিরোজ ক্যাসিনো এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার অঢেল সম্পদের বিষয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। তাহেরপুরের সাবেক এমপি কালামের ক্যাডার সোহেলসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজনকে নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। ১৫ আগস্ট ফিরোজ ও সোহেলের বাগমারাজুড়ে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল। তবে তার আগেই তাকে গ্রেফতারের কারণে জনমনে আতঙ্ক দূর হয়েছে।’
Reporter Name 
























