নারীদের জন্য আবারও পৃথক বাসসেবা চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। এবার ‘গোলাপি বাস’ নামে মহিলা চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে পরিচালিত এ সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে ১৪টি বাস নামানো হবে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন রুটে ১০টি, বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুটি করে বাস চলবে। আজ তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ট্রাক ডিপোতে এ সেবার উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করা হচ্ছে।
তবে যাত্রীরা বলছেন, বাস না থাকার ফলে এ উদ্যোগ অতীতে ব্যর্থ হয়েছে। গাড়ি, চালক-কন্ডাক্টর পর্যাপ্ত না পেলে আবারও অকার্যকর হতে পারে এ সেবা। তড়িঘড়ি না করে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে চালু করলে এ সেবাটি মাইলফলক হয়ে থাকত। ঢাকায় নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা নতুন নয়। ২০০১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিআরটিসি এ ধরনের সেবা চালু করেছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বর্তমানে নয়টি দ্বিতল বাস নয়টি রুটে
নারী বাসসেবা দিচ্ছে। বাসগুলো সকালে একটি এবং বিকালে একটি- দিনে মোট দুই ট্রিপ করে। বাকি সময়ে সাতটি বাস সাধারণ নগর পরিবহনে ব্যবহার করা হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ, বাসের সংখ্যা কম এবং সময়সূচিও তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অফিস সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গাড়ির দেখা মেলে না। কিছু রুটে বাস চলে। বর্তমান নারী বাসসেবায় চালক সবাই পুরুষ। নয়জন কন্ডাক্টরের মধ্যে নারী মাত্র দুজন। এমনকি নারী যাত্রী কম থাকলে নারী-নির্ধারিত বাসের ওপরের তলায় পুরুষ যাত্রী তোলা হয় বলে বিআরটিসির একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন। ফলে আগের সেবার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার নতুন ‘গোলাপী বাস’ কতটা কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
১৪ বাসের রুট : নতুন উদ্যোগে ঢাকায় ১০টি বাস বিভিন্ন ডিপোর আওতাধীন রুটে চলবে। মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, কল্যাণপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ, মোহাম্মদপুর, জোয়ারসাহারা ও গাজীপুর ডিপোর আওতাধীন রুটগুলো এ সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মতিঝিল ডিপোর বাস নতুনবাজার-মতিঝিল ও তালতলা-মতিঝিল রুটে চলবে। যাত্রাবাড়ী ডিপোর বাস চলবে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও রুটে। কল্যাণপুর ডিপোর বাস চলবে মিরপুর-১০-মতিঝিল এবং মিরপুর ডিপোর বাস মিরপুর-১২-মতিঝিল রুটে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আবদুল্লাহপুর-মতিঝিল এবং গাজীপুর-বিমানবন্দর রুটে নারী বাস চলবে।
বিআরটিসির তালিকায় ঢাকার নারী বাসসেবার সঙ্গে আরও কয়েকটি রুটের বিস্তারিত স্টপেজ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে নতুনবাজার-মতিঝিল রুটে নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান ও মতিঝিল রয়েছে। তালতলা-মতিঝিল রুটে খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, মুগদা, কমলাপুর, আরামবাগ ও শাপলা চত্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। মিরপুরের রুটগুলোতে মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগ ও মতিঝিলের মতো এলাকা যুক্ত। আবদুল্লাহপুর-মতিঝিল রুটে বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, কুড়িল, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান ও মতিঝিল রয়েছে।
ঢাকার বাইরে প্রথম পর্যায়ে বগুড়া ও চট্টগ্রামে নারী বাস চালু হচ্ছে। বগুড়ায় দুটি বাস শেরপুর-মাটিডালি রুটে চলবে। চট্টগ্রামে দুটি বাস চলবে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে। চট্টগ্রামের রুটে কালুরঘাট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, ইপিজেড, কাটগড় ও পতেঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রয়েছে। অর্থাৎ এবার শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে নারী বাসসেবার আওতা আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন ‘গোলাপী বাসে’ যাত্রীদের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। একতলা ও দ্বিতল-দুই ধরনের বাসই ব্যবহার করা হবে। টিকিট কাটার ক্ষেত্রে পস মেশিন ব্যবহারের সুবিধাও থাকবে। এর ফলে নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি যাত্রী ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
নতুন করে নারী বাসসেবা চালুর উদ্যোগের সঙ্গে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বিআরটিসির সক্ষমতার ঘাটতি। করপোরেশনে ১৬ জন নারী চালক থাকলেও ভারী যান চালানোর পেশাদারি লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ছয়জনের। তারা হলেনÑ মনোয়ারা বেগম, রাবেয়া বেগম, জান্নাতুল ফেরদৌস, উম্মে হাবিবা, রাবেয়া খাতুন ও ফাহিমা আক্তার। ফলে মহিলা চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে ১৪টি বাস চালানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় নারী চালক প্রস্তুত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ ঘাটতি পূরণে প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স উন্নীতকরণ এবং নতুন নারী চালক নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে বিআরটিসি। ইতোমধ্যে বিআরটিসি অস্থায়ী ভিত্তিতে মহিলা চালক নিয়োগ দিয়েছে।
সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী, হালকা যান চালানোর পেশাদারি লাইসেন্সধারী কোনো ব্যক্তি অন্তত তিন বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়া ভারী যান চালানোর লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন না। তবে সরকারি অনুমোদিত কর্মসূচির আওতায় ভারী যান চালানোর জন্য এক বছর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলে এবং আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ২৩ বছর হলে নির্দিষ্ট শর্তে ভারী যান চালানোর লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায়।
বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) শুকদেব ঢালী জানিয়েছেন, নারী চালকের ঘাটতি পূরণে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নতুন নারী চালক নিয়োগ করা হবে এবং বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে। সুতরাং এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।
সূত্র বলছে, শুধু বাস নামালেই নারী বাসসেবা সফল হয় না। পর্যাপ্ত বাস, নিয়মিত ও ঘন ঘন ট্রিপ, সুবিধাজনক সময়সূচি এবং নির্ধারিত রুটে সেবা সবকিছু নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান সেবায় দিনে মাত্র দুই ট্রিপ চলা, দুপুরে বাস না থাকা এবং নারী যাত্রী কম থাকলে পুরুষ যাত্রী ওঠানোর মতো ঘটনা সেবাটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। নতুন সেবায় এসব সমস্যা কাটানো না গেলে ১৪টি ‘গোলাপী বাস’ ও আগের উদ্যোগগুলোর মতো সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে।
Reporter Name 
























