ঢাকা ১২:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীরব অস্থিরতার পাঁয়তারা ফ্যাসিস্টদের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫৪:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ বার

সরকার যখন দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলার উন্নয়ন এবং পুলিশ বাহিনীর চেইন-অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার কাজ করছে তখনই বিভ্রান্ত ছড়ানো ও বাহিনীকে দুর্বল করতে ফ্যাসিস্টদের একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিছু সঠিক তথ্যের সাথে রং মিশিয়ে নানা গল্প তৈরি করে বাংলাদেশ পুলিশের ভেতরে নীরব অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আনতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছেন তখনই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ফ্যাসিস্ট চক্র। অত্যন্ত অপকৌশলে ফ্যাসিস্টদের সহযোগীরা এ অপতৎপরতার সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি এরই মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নিñিত হয়ে সর্তক থাকতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদর দফতরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে অপরাধ দমন, তদন্ত, অনুসন্ধান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বাহিনীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে যেন কোন প্রভাব না পড়ে সে জন্য সংশ্লিস্টদের বলা হয়েছে।

অন্যদিকে রোববার বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল ও বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য, গুজব ও কুৎসামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রচলিত আইন, বিধি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুলিশের ভঙ্গুর মনোবল যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে এবং বাহিনীর সদস্যরা নতুন উদ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে ফিরে আসছেন, ঠিক সেই সময়ে পলাতক, জনবিচ্ছিন্ন ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল একটি পরিকল্পিত অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি আলী হোসেন ফকির ইনকিলাবকে বলেন, পুলিশ দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলা উন্নয়ন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিরলসভাবে কাজ করছে। পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অপরাধ দমনে সক্রিয় রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা রোববার ইনকিলাবকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাহিনীর ভেতরে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা নিজের দায়িত্ব পালনের চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান সুরক্ষা, প্রশাসনিক প্রতিযোগিতা, বদলি ঠেকানো কিংবা কাঙ্খিত পদায়ন নিশ্চিত করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংগ্রহ, বিভিন্ন মহলে তথ্য সরবরাহ, এমন কি সামাজিক মাধ্যমে বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার ঘটনাও বাড়ছে। অত্যন্ত কৌশলে ফ্যাসিস্ট চক্র পুলিশ বাহিনীর ভেতরে পারস্পরিক আস্থার সংকট বাড়াতে সক্রিয় রয়েছে।

এ বিষয়ে পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা জরুরী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অতিরিক্ত আইজিপি ইনকিলাবকে বলেন, পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের এই সময়ে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও পেশাদারত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার না দিলে পুলিশের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পুলিশ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে শুধু বাহিনীর মনোবল নয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ একটি চেইন অব কমান্ডভিত্তিক বাহিনী। সেখানে ব্যক্তিগত গ্রুপিং বা বিভক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পেশাদারত্ব। বাহিনীর ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি একে অপরকে হেয় করা, অপপ্রচার কিংবা প্রশাসনিক অস্থিরতায় রূপ নেয়, তাহলে সেটি পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। অপপ্রচার যারা করছে তাদের উদ্দেশ্য বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা কিনা তা খুঁজে বের করতে হবে। সেটা বাহিনীর ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক। যারাই এর সঙ্গে জড়িত তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন ভাবেই ফ্যাসিস্ট চক্রের গভীর ষড়যন্ত্র পুলিশ বাহিনীর চেইব-অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্থ হতে দেয়া যাবে না। সব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, তা নয়। আবার সব অভিযোগও সত্য নয়। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের আগেই সামাজিক মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়ে যাচ্ছে। এমন কি যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তারাও নানা ধরনের অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুলিশ। সরকার পতনের পর পুলিশকে কাজে ফেরানো অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় পুলিশে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস। একদিকে অতীত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরানো হয়, অন্যদিকে নতুন করে পদায়ন ও পদোন্নতি দিয়ে ঢেলে সাজানো হয় এই বাহিনীকে, যা এখনও চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিট, শিল্পাঞ্চল পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিভিন্ন রেঞ্জ এবং জেলা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে নানা তৎপরতা চলছে। কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ সামনে আনার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। আবার স্বাভাবিক পদোন্নতি থেকে কাউকে কাউকে বঞ্চিত করার অভিযোগও সামনে আসছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নির্দিষ্ট প্রশাসনিক চ্যানেলে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন সামাজিক গমাধ্যম একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরনো ছবি, ভিডিও কিংবা বিভিন্ন তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাই নন, পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও পুলিশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর যে ডিজাস্টারটা হয়েছে, সেই ট্রমা থেকে পুরোপুরি বের হতে একটা সময় লাগবে। এরইমধ্যে এ বাহিনী অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে। এখন যারা পুলিশের নেতৃত্বে আছেন তাদের মধ্যে বিগত সময়ের সুবিধাভোগীরা রয়েছেন। পুলিশকে জনবান্ধব করতে হলে পেশাদার, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে মূল্যায়ন করা খুবই জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নীরব অস্থিরতার পাঁয়তারা ফ্যাসিস্টদের

আপডেট টাইম : ১১:৫৪:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

সরকার যখন দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলার উন্নয়ন এবং পুলিশ বাহিনীর চেইন-অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার কাজ করছে তখনই বিভ্রান্ত ছড়ানো ও বাহিনীকে দুর্বল করতে ফ্যাসিস্টদের একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিছু সঠিক তথ্যের সাথে রং মিশিয়ে নানা গল্প তৈরি করে বাংলাদেশ পুলিশের ভেতরে নীরব অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আনতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছেন তখনই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ফ্যাসিস্ট চক্র। অত্যন্ত অপকৌশলে ফ্যাসিস্টদের সহযোগীরা এ অপতৎপরতার সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি এরই মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নিñিত হয়ে সর্তক থাকতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদর দফতরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে অপরাধ দমন, তদন্ত, অনুসন্ধান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বাহিনীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে যেন কোন প্রভাব না পড়ে সে জন্য সংশ্লিস্টদের বলা হয়েছে।

অন্যদিকে রোববার বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল ও বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য, গুজব ও কুৎসামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রচলিত আইন, বিধি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুলিশের ভঙ্গুর মনোবল যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে এবং বাহিনীর সদস্যরা নতুন উদ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে ফিরে আসছেন, ঠিক সেই সময়ে পলাতক, জনবিচ্ছিন্ন ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল একটি পরিকল্পিত অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি আলী হোসেন ফকির ইনকিলাবকে বলেন, পুলিশ দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলা উন্নয়ন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিরলসভাবে কাজ করছে। পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী অপরাধ দমনে সক্রিয় রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা রোববার ইনকিলাবকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাহিনীর ভেতরে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা নিজের দায়িত্ব পালনের চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান সুরক্ষা, প্রশাসনিক প্রতিযোগিতা, বদলি ঠেকানো কিংবা কাঙ্খিত পদায়ন নিশ্চিত করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংগ্রহ, বিভিন্ন মহলে তথ্য সরবরাহ, এমন কি সামাজিক মাধ্যমে বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার ঘটনাও বাড়ছে। অত্যন্ত কৌশলে ফ্যাসিস্ট চক্র পুলিশ বাহিনীর ভেতরে পারস্পরিক আস্থার সংকট বাড়াতে সক্রিয় রয়েছে।

এ বিষয়ে পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা জরুরী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অতিরিক্ত আইজিপি ইনকিলাবকে বলেন, পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের এই সময়ে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও পেশাদারত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার না দিলে পুলিশের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পুলিশ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে শুধু বাহিনীর মনোবল নয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ একটি চেইন অব কমান্ডভিত্তিক বাহিনী। সেখানে ব্যক্তিগত গ্রুপিং বা বিভক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পেশাদারত্ব। বাহিনীর ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি একে অপরকে হেয় করা, অপপ্রচার কিংবা প্রশাসনিক অস্থিরতায় রূপ নেয়, তাহলে সেটি পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। অপপ্রচার যারা করছে তাদের উদ্দেশ্য বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা কিনা তা খুঁজে বের করতে হবে। সেটা বাহিনীর ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক। যারাই এর সঙ্গে জড়িত তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন ভাবেই ফ্যাসিস্ট চক্রের গভীর ষড়যন্ত্র পুলিশ বাহিনীর চেইব-অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্থ হতে দেয়া যাবে না। সব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, তা নয়। আবার সব অভিযোগও সত্য নয়। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের আগেই সামাজিক মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়ে যাচ্ছে। এমন কি যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তারাও নানা ধরনের অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুলিশ। সরকার পতনের পর পুলিশকে কাজে ফেরানো অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় পুলিশে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস। একদিকে অতীত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরানো হয়, অন্যদিকে নতুন করে পদায়ন ও পদোন্নতি দিয়ে ঢেলে সাজানো হয় এই বাহিনীকে, যা এখনও চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিট, শিল্পাঞ্চল পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিভিন্ন রেঞ্জ এবং জেলা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে নানা তৎপরতা চলছে। কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ সামনে আনার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। আবার স্বাভাবিক পদোন্নতি থেকে কাউকে কাউকে বঞ্চিত করার অভিযোগও সামনে আসছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নির্দিষ্ট প্রশাসনিক চ্যানেলে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন সামাজিক গমাধ্যম একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরনো ছবি, ভিডিও কিংবা বিভিন্ন তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাই নন, পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও পুলিশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর যে ডিজাস্টারটা হয়েছে, সেই ট্রমা থেকে পুরোপুরি বের হতে একটা সময় লাগবে। এরইমধ্যে এ বাহিনী অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে। এখন যারা পুলিশের নেতৃত্বে আছেন তাদের মধ্যে বিগত সময়ের সুবিধাভোগীরা রয়েছেন। পুলিশকে জনবান্ধব করতে হলে পেশাদার, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে মূল্যায়ন করা খুবই জরুরি।