প্রায় ৩৫ বছর পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একাধিক বৈধ প্রার্থী সেদিন থাকলে সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে ভোট দেবেন।
সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা করায় ১৯৯১ সালের পর থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ধারা চলে আসছে, এবার তা ভাঙতে যাচ্ছে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল। এরপর প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে মো. সাহাবুদ্দিনও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এবার অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও সংসদে সংখ্যার হিসাবে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থীই এগিয়ে থাকবেন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২১০টি আসনে জয়ী হয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। ফলে সংসদে বিএনপির স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, “বিরোধী দল জানে, তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে যাবে। তারপরও প্রার্থী দেওয়া রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ১৯৯১ সালেও আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছিল এবং হেরেছিল। এবারও বিরোধী জোটের প্রার্থী হেরে যাবেন।”
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত। ক্ষমতাসীন দল যাকে চাইবে, তিনিই রাষ্ট্রপতি হবেন। তবে নির্বাচন হওয়াটা ভালো। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের বদলে এবার অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।”
কীভাবে হবে নির্বাচন
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে ভোট দেন। সর্বোচ্চ বৈধ ভোট পাওয়া প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর যদি একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। ওই প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
বিএনপির কোনও সংসদ সদস্য জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে মনজিল মোরসেদ বলেন, “বিএনপির কোনও সংসদ সদস্য জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে।”
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিএনপি ইতোমধ্যে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। দলের চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়ের আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
অপরদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং দায়িত্বের অংশ হিসেবে আমরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমাদের মধ্য থেকে সর্বসম্মতিক্রমে একজনকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”
এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ বলেন, “আমরা আমাদের অবস্থান থেকে কখনো জাতির সঙ্গে বেঈমানি করব না। আমরা জিতব না হারব, সেটা বিষয় নয়। জনগণের জন্য যা ভালো এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় যা প্রয়োজন, আমরা তার পক্ষে থাকব। আমি পুরো জাতির প্রতি কৃতজ্ঞ।”
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট জয়ের সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও কেন প্রার্থী দিয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মনজিল মোরসেদ বলেন, “রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তারা হয়তো এমনভাবে প্রার্থী দিয়েছে, যাতে কেউ তাদের অংশ না নেওয়া নিয়ে অভিযোগ বা প্রশ্ন তুলতে না পারে।”
শেষবার ভোটের লড়াই হয়েছিল ১৯৯১ সালে
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরিবর্তনের প্রস্তাব
জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২৯টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, ভবিষ্যতে একক সংসদের পরিবর্তে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার উচ্চ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
বর্তমান উন্মুক্ত ভোটের পরিবর্তে আইনসভার সদস্যদের গোপন ব্যালটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।
এ বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনাতেও এ বিষয়ে বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের কথা বলেছিল। সরকার পরিবর্তন ও অর্থবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপি ইতোমধ্যে সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি কমিটি করেছে। কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন প্রয়োজন, তারা তা পর্যালোচনা করবে। তবে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় অনেক কিছুই বলা হয়; বাস্তবে কতটা বাস্তবায়ন হয়, সেটাই দেখার বিষয়।”
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “গণভোটে অনেক সংস্কারের বিষয়ে প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয় পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হলে অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে। তবে এখন সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”
Reporter Name 




















