বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন বরাবরই গুরুত্ব বহন করে। কারণ, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে বসবেন, তা শুধু ক্ষমতাসীন জোটের রাজনৈতিক বার্তাই নয়, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।
নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া বঙ্গভবনের শীর্ষ পদের জন্য বেশ কয়েকটি নাম গুঞ্জনে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত পাল্লা ভারী বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দিকেই।
দলটির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা হিসেবে মির্জা ফখরুলকেই প্রার্থী মনোনীত করার ব্যাপারে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে জোর আলোচনা চলছে।
গত ২৪ জুলাই দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি হওয়া অনেকটাই নিশ্চিত।
বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, দল এবার কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তি নয়, বরং দলের ভেতর থেকেই একজন পরীক্ষিত রাজনীতিবিদকে বঙ্গভবনে পাঠাতে চায়। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ দেড় দশক আওয়ামী-বিরোধী আন্দোলনে দলের হাল ধরা এবং কঠিন সময়ে সংগঠনকে ধরে রাখার অবদান বিবেচনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই শীর্ষ নেতৃত্বের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন।
চমকের সম্ভাবনা কোথায়?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখার নজির রয়েছে। অনেক সময় আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের বাইরে থেকেও নতুন নাম সামনে এসেছে। ফলে এবারও শেষ মুহূর্তে কোনো চমক থাকছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পায় দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা; সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে দক্ষতা; সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব; সরকারের প্রতি আস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা; দেশি-বিদেশি মহলে ইতিবাচক ভাবমূর্তি।
কেমন রাষ্ট্রপতি চাই?
যদিও রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত, তবু সংবিধান রক্ষা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জাতীয় সংকটকালে নৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন একজন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন, যিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবেন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতার পরিচয় দেবেন।
মির্জা ফখরুলই কেন রাষ্ট্রপতি বিবেচনায় এগিয়ে
বিএনপিতে একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি দলটির বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং জনগণের মাঝে মির্জা ফখরুলের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে করে দলটি । এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের দলের মহাসচিবকে সম্মান দিতে চাইছে বলে বলছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা।
তাদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়াকে বয়সের শেষ প্রান্তে কারাগারে থাকতে হয়েছে। তাদের আরেক শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ছিলেন লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে।
শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে লম্বা সময় ধরে বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে মির্জা ফখরুলই ছিলেন দৃশ্যমান মূল নেতৃত্বে।
বিএনপি শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, লন্ডনে নির্বাসনে থেকেই তারেক রহমান তাদের দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু দেশে রাজনীতির মাঠে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করা এবং বিএনপিকে ঐকবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুলের এ ভূমিকাকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ণ করেন বলে দলটির নেতারা বলছেন। তারা বলছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে মহাসচিব হিসেবে দলের ভেতরে-বাইরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরে যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে তাকে সম্মান দেওয়ার বিষয় বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রপতি।
এছাড়া, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরত আনা হয়েছে। অতীতে সেই সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছিল রাষ্ট্রপতির ভূমিকা।
এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেও বিএনপি সরকার এবার দলের ভেতর থেকে সক্রিয় রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করার অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
আলোচনায় আছে আরও যাদের নাম
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া আরও অনেকের নাম আলোচনায় ছিল গণমাধ্যমে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। তারা হলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খান।
এছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় ছিল। তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুলের নাম যে গুরুত্ব পাচ্ছে, সেক্ষেত্রে দুই ধরনের বিশ্লেষণও রয়েছে বিএনপিতে। দলটির কেউ কেউ মনে করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এতদিনের ভূমিকার জন্য তাকেই বঙ্গভবনের বাসিন্দা করে সম্মানিত করা উচিত।
আলোচনায় এসেছে ড. ইউনূসের নামও
ক্ষমতাসীন বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ড. ইউনূসের নাম আলোচনায় আসার পেছনে তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া এই অর্থনীতিবিদ ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব মূলত সাংবিধানিক হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কোনো ব্যক্তিকে এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হলে সরকারের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
তবে ড. ইউনূসের নাম আলোচনায় আসায় বিএনপির ভেতরে তৈরি হয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক হিসাব। একদিকে রয়েছে তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনে দলের সঙ্গে থাকা পরীক্ষিত নেতাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর দাবি।
বিরোধী দল জামায়াত থেকে নেই কোন প্রার্থী
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন বলে বলা আছে। ফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি যাকে প্রার্থী মনোনয়ন করবে, তিনিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
এই বিষয়কে উল্লেখ করে কোনো প্রার্থী না দেওয়ার কথা বলছে জামায়াত। কারণ তারা প্রার্থী দিলে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এই যুক্তিই তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সরকারি দল বিএনপি সংসদের বিরোধী দলগুলোর কোনো মতামত নিচ্ছে না।
যদিও বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদের শাসনের পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একবারই ১৯৯১ সালে সংসদে ভোটাভুটি হয়েছিল। তখন জাতীয় সংসদে সরকারি দল বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: বিএনপি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
অন্যদিকে বিএনপি প্রধানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে এমন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যিনি রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত এবং দলের আদর্শের প্রতি আস্থাশীল।
তবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, দলের গঠনতন্ত্র ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যথাসময়ে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত ব্যক্তির নাম জানানো হবে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে ৩৪৯ সংসদ সদস্যের (এমপি) নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেবল সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে থাকেন। এ জন্য তাদের তালিকা নিয়েই ভোটার তালিকা প্রকাশ করে ইসি।
এরআগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ভোট গ্রহণের তারিখ ২০ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী থাকলে সেদিন বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৩ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
Reporter Name 





















