হাওর বার্তা প্রতিবেদকঃ সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নানা বিধিনিষেধ থাকলেও মাত্র ৬৯ দিনের ব্যবধানে ছয়টি দেশ সফর করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব রেবেকা খান—এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর ধারাবাহিক বিদেশ সফর নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রেবেকা খান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-১ অধিশাখা ও সীমান্ত শাখার দায়িত্বে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে, জুন ও জুলাই মাসে সরকারি আদেশের (জিও) মাধ্যমে তিনি ভারত, চীন, অস্ট্রিয়া, তুরস্ক, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপ সফর করেন। এসব সফরের উদ্দেশ্য ছিল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবপাচার প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন, বিমসটেকের বৈঠক এবং আইনি সহায়তা বিষয়ক আঞ্চলিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ।
তবে দেশের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপের মধ্যেই একজন কর্মকর্তার ঘনঘন বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যেসব দেশে সফরঃ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত ৮ থেকে ১১ মে চীনে সফর করেন রেবেকা খান। বিজিবির মহাপরিচালকসহ তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে তিনি সেখানে একটি পণ্য বাজারজাতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পণ্য প্রদর্শনী কেন্দ্র পরিদর্শনে অংশ নেন। এ সফরের অনুমোদনে ৬ মে জিও জারি করা হয়।
এরপর ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সমন্বয় বিষয়ক মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নেন তিনি। এ সফরের জন্য ২৩ মে জিও জারি করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) আয়োজিত অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক দুটি বৈঠকে অংশ নিতে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় যান রেবেকা খান। ২৯-৩০ জুন অভিবাসী পাচার সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৩তম সভা এবং ১ জুলাই অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক বৈশ্বিক জোটের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সভা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে। এ সফরের জন্য ২৫ মে জিও জারি করা হয়।
এ ছাড়া ২৫-২৬ জুন তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সভায়ও অংশ নেন তিনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতি উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিএমডিপি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। তিন সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের একজন ছিলেন রেবেকা খান।
মালদ্বীপের রাজধানী মালেতেও সফর করেন এই কর্মকর্তা। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ডিজিটাল আলামত সংগ্রহে যৌথ আইনি সহায়তা বিষয়ক আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয় ১৩ থেকে ১৬ জুলাই। চার সদস্যের প্রতিনিধি দলের হয়ে ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেন তিনি।
এর আগে ১১-১২ জুন থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের ‘সাব-গ্রুপ অন হিউম্যান ট্রাফিকিং’-এর চতুর্থ বৈঠকেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন রেবেকা খান। এ সফরের অনুমোদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৫ শাখা থেকে ২৬ মার্চ জিও জারি করা হয়েছিল।
কর্মকর্তার দাবি, ছয় জিওর দুটি বাতিলঃ
ঘনঘন বিদেশ সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে যুগ্মসচিব রেবেকা খান দাবি করেন, মন্ত্রী ও সচিবের অনুমোদন ছাড়া বিদেশ সফরের জিও জারি হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছয়টি জিওর মধ্যে দুটি পরবর্তী সময়ে বাতিল করে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁর কয়েকটি সফর রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ ছিল। বিশেষ করে বিজিবির সঙ্গে নয়াদিল্লি সফর এবং বিমসটেকের বৈঠকে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। থাইল্যান্ডে তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে একটি উপস্থাপনাও করেন বলে জানান।
রেবেকা খান আরও দাবি করেন, তাঁর বিদেশ সফর নিয়ে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। রাজনৈতিক-১ শাখায় একজনকে পদায়নের জন্য একটি পক্ষ চেষ্টা করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সচিবের মন্তব্যঃ
বিদেশ সফর নিয়ে জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘনঘন বিদেশ সফর, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং এসব সফরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠলেও রেবেকা খানের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর সফরগুলোর অধিকাংশই ছিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের অংশ।
বলা হচ্ছে, বিদেশ সফরের প্রতিটি সরকারি আদেশ, সফরের উদ্দেশ্য, ব্যয় এবং কারা সফরে গেছেন—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার বিষয়। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সব পক্ষের বক্তব্য ও সরকারি নথি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
Reporter Name 






















