জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এক মাসের অধিক সময় ধরে চলা এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ ওই বছরের ৫ আগস্ট টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্শতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।
শুরুতে আন্দোলনটি কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে পরিচালিত হয়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এটি এগিয়ে যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সরকারকে সেসব দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু একটানা চলতে থাকা আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে সরকার সবকিছু লেজেগোবরে করে ফেলে। সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এতে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, অভিনয়শিল্পী এবং সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয় এবং সবাই একে একে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ শুরু করে।
দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপিও শুরুতে নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে। পরে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে দলীয় নেতাকর্মীদের সরাসরি ছাত্র-জনতার সব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি দলটির সিনিয়র নেতারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে নানা দিকনির্দেশনা দেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা করতে থাকেন।
বিএনপির নেতারা বলছেন, শুরুতে আন্দোলনের নেতৃত্ব পুরোপুরি শিক্ষার্থীদের হাতেই ছিল। সে কারণে বিএনপি সরাসরি দলীয় ব্যানারে কর্মসূচি না দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি শুধু সংহতি জানায়। যাতে আন্দোলনের ন্যায্য দাবির প্রতি সরকার প্রশ্ন তুলতে না পারে। যেন বলতে না পারে এর পেছনে বিএনপি আছে। পরে আন্দোলন বিস্তৃত হলে নেতাকর্মীরা সব কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

৬ জুলাই প্রথম আনুষ্ঠানিক সমর্থন বিএনপির
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রথমে পর্যবেক্ষণ করে বিএনপি। এরপর ৬ জুলাই প্রথম আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায় দলটি। ২০২৪ সালের ওইদিন (৬ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামগীর বলেন, “একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। তাই, সাধারণ ছাত্র সমাজের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিগুলোর সঙ্গে বিএনপি একমত। আশা করি, সময় থাকতে সরকার ছাত্র সমাজের ন্যায়সঙ্গত যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেবে।”
আন্দোলনে ঢুকে পড়ার অভিযোগ তৎকালীন সরকারের, বিএনপির অস্বীকার
আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অভিযোগ তুলেছিল, এতে বিএনপি ও জামায়াতের ‘সন্ত্রাসীরা’ ঢুকে পড়েছে এবং তারা গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। ১৭ জুলাই আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, ‘পরিস্থিতি ঘোলাটে করে বিএনপি-জামায়াত তাদের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী সারা বাংলাদেশ থেকে এনে ঢাকা শহরে গুপ্তহত্যা করা শুরু করেছে।’ একই দিন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদও অভিযোগ করেন, ‘তারেক রহমান বিভিন্নজনকে নির্দেশ দিচ্ছেন কোটা আন্দোলনকারীদের ভেতর ঢুকে পড়ার জন্য।’
তবে একই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, আমরা এই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নই। আমরা তাদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছি। সেই সমর্থন আমরা দিয়েই যাব।
এ নিয়ে গতমাসে (জুলাই, ২০২৬) বিবিসি বাংলার এক রিপোর্টে বিএনপির মহাসচিবকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। সেসময় প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়া হয়নি কেন তেমন প্রশ্ন তোলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভাজন তৈরির চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের কালচারে (রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে) একটা প্রবলেম আছে। ছাত্ররা অনেক সময় ওউন করতে (নিজস্ব মনে করা) চায় না অন্য দলকে এবং সমর্থন দিলে এমন একটা কথা বলে দেয় যে তাদের সমর্থন আমাদের দরকার নেই। এইসব কারণে যেটাকে বলে সরাসরি সমর্থন দেওয়া… এটা আর মাঠে সমর্থন দেওয়া… আমরা তো মাঠে ছিলামই।’
ছাত্র আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের সঙ্গে বিএনপির এবং তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ বা সংযোগ সবসময় ছিল বলে দাবি করেন মির্জা ফখরুল।
সেই সময় ঢাকা থেকে বিএনপির সাড়ে তিন হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং সে আন্দোলনকে বিএনপি ওউন করে বলেও উল্লেখ করেন দলটির মহাসচিব।

জুলাই আন্দোলনের শেষ দিনের কর্মসূচি ‘মার্চ টু ঢাকা’ ৬ আগস্টের পরিবর্তে একদিন আগে ৫ আগস্ট আনার ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখানে আমরা ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করি। আমাদের কিন্তু ছাত্রনেতাদের সঙ্গে প্রত্যেক দিনই আলোচনা চলছিল। প্রত্যেক রাতে কথা হতো, দিনে কথা হতো। কখনো রাতে ওরা আসত আমার এখানে (বাসায়)। মাহফুজ সাহেব (মাহফুজ আলম) ৩ আগস্ট আমার বাসায় এসেছে।’
‘জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান
আন্দোলনের শেষের দিকে সারা দেশে হত্যা ও গ্রেপ্তারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি ছাত্র নেতাদের চিকিৎসা নিতে না দিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে ডিবি পুলিশ আটকে রাখে। ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তৎকালীন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ কয়েকজন তুলে নিয়ে আটকে রাখে ডিবি। ওইদিন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ এবং সব রাজনৈতিক দলের জাতীয় ঐক্য গঠনের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেন।
৪২২ নিহত, ৯ হাজার গ্রেপ্তারের দাবি
বিএনপির দাবি, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের ৪২২ জন নেতাকর্মী নিহত হন। আর গ্রেপ্তার হন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ক্রীড়া সম্পাদক আমিনুল হকসহ প্রায় ৯ হাজার নেতাকর্মী।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বিএনপি নেতাকর্মীদের এই নিহতের সংখ্যাটি তুলে ধরেন। এর আগে ওই বছরের ২৮ জুলাই এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেছিলেন, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বিএনপির ৯ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
‘আমরা না থাকলে ১৯ জুলাই গ্রেপ্তার হলাম কীভাবে’
জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে নানা সময় বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। এ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমরা যদি এই আন্দোলনে না-ই থাকতাম, তাহলে ১৯ জুলাই কীভাবে গ্রেপ্তার হলাম? তার আগেই ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে কর্মসূচিগুলো ঘোষণা করা হয়েছিল, বিএনপি সেগুলোর প্রতি সংহতি জানিয়েছে। নেতাকর্মীদের অংশ নিতে বলেছে এবং তারা অংশও নিয়েছে। সে সময় তো আমি নিজেই অজ্ঞাত স্থান থেকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেছি। সেই রেকর্ডগুলো এখনো আছে, সাংবাদিকদের কাছেও আছে। তাহলে নতুন করে এত কিছু বলার কী আছে? আমাদের এতগুলো ছেলে মারা গেল কীভাবে?’
রাজনীতিতে অপপ্রচার করে অসত্যকে প্রতিষ্ঠা করা একটা অশুভ প্রচেষ্টা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘এসব ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা ধোপে টেকে না। মানুষ দেখেছে কীভাবে জুলাই আন্দোলনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি শুধু জুলাই আন্দোলনেই ছিল না। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রকাশ যখন গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে সামনে আসতে শুরু করে, তখন থেকেই বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিরা গুম হয়েছেন, অসংখ্য যুবক গুমের শিকার হয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ নেতারা নিখোঁজ হয়েছেন, ছাত্ররা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছে। বিএনপি শুধু জুলাই-আগস্টের কয়েক দিনের আন্দোলনের দল নয়; গত ১৭ বছর ধরে নিরন্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করে এসেছে।’
বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, ‘বিএনপি দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে এবং এতে অংশগ্রহণ করেছে। বিএনপির এই সমর্থন ও অংশগ্রহণে ছাত্রদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়েছে, আরও পূর্ণতা পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন বিজয় অর্জন করেছে।’
‘মাস্টারমাইন্ড’ বির্তক
জুলাই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ কে—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো নানা আলোচনা চলছে। একদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে এক বক্তব্যে ইঙ্গিত দেন, আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক বক্তব্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দাবি করেন, এই আন্দোলনের একমাত্র মাস্টারমাইন্ড হচ্ছেন তারেক রহমান। কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যা করা দরকার সবই করেছেন তিনি।
তবে, গত বছর বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, তিনি নিজেকে জুলাই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ মনে করেন না। বরং এটি ছিল গণতন্ত্রপন্থী মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন, যেখানে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অবদান রেখেছেন।

ছাত্রদলের ১৪২ জন শহীদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের শতাধিক আহত
জুলাই আন্দোলনে বিএনপির সিনিয়র নেতারা সরাসরি রাজপথে খুব বেশি সক্রিয় না থাকলেও দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই আন্দোলনে অংশ নেন বলে সংগঠনগুলো দাবি করে। তাদের ভাষ্য, আন্দোলনের প্রথম দিকে অপেক্ষাকৃত নবীন ও কম পরিচিত নেতাকর্মীদের কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে তাদের নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ছাত্রদলের দাবি, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সংগঠনটির ১৪২ জন নেতাকর্মী শহীদ হন।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই ধাপে ধাপে ছাত্রদল এতে সম্পৃক্ত হয়। প্রথমদিকে সংগঠনের অপেক্ষাকৃত নবীন ও কম পরিচিত নেতাকর্মীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে আন্দোলনের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ সারা দেশের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে যুক্ত হন।
তার ভাষ্য, হাইকোর্টের রায়ের পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রদলের যোগাযোগ শুরু হয়। এরপর ২ জুলাই থেকে সংগঠনটি আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। প্রথমে অপেক্ষাকৃত নবীন নেতাকর্মীদের মাধ্যমে অংশগ্রহণ শুরু হলেও ৫ থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পৃক্ততা আরও বাড়ে। ৮ জুলাই নয়াপল্টনে ছাত্রদল মিছিল করে এবং ১১ জুলাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনে প্রকাশ্যে থাকার ঘোষণা দেয়।
নাসির বলেন, ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম নিহত হওয়ার পর আন্দোলনে ছাত্রদলের অংশগ্রহণ আরও জোরালো হয়। তার দাবি, এরপর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা, মহানগর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন এবং নিজ নিজ এলাকায় নেতৃত্ব দেন।
তিনি আরও দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরামের পাশাপাশি মাগুরা জেলা ছাত্রদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতাও ছিলেন। তার মতে, আন্দোলনে সংগঠনটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা প্রাণ হারিয়েছেন।
নাসির বলেন, তিনি নিজেও ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিব যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন এবং কারফিউ চলাকালেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কর্মসূচি পালন করেন। একই সঙ্গে আন্দোলনের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বিষয়েও ছাত্রদল কাজ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি এ.এ. জহির উদ্দিন তুহিন দাবি করেন, বিএনপি ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দল জুলাই আন্দোলনে নিয়মিত রাজপথে অবস্থান করে প্রতিটা কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, ১৬ জুলাই কেন্দ্রীয় কার্যালয় হতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে বিএনপি একাত্মতা প্রকাশ করে। সেই মিছিলে স্বেচ্ছাসেবক দলের সর্বোচ্চ উপস্থিতি ছিল। ১৮ জুলাই কম্পিলিট শাট ডাউন কর্মসূচীতে শনির আখড়া, কাজলা, দনিয়া পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ।
১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর পুরানা পল্টন, পল্টন কালভার্ট রোড, রাজারবাগ শান্তিনগর, নয়াপল্টন দলীয় অফিস পুরো এলাকায় সারাদিন পুলিশ ও বিজিবির সাথে সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেয় স্বেচ্ছাসেবক দল।
২ আগস্ট এক দফা দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত পদযাত্রায় অংশগ্রহণ, ৩রা আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, ৪ঠা আগস্ট যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও শাহবাগ দুই জায়গায় ভাগ হয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল দায়িত্ব পালন করে। অসংখ্য নেতাকর্মী দিনব্যাপী রাজপথে থেকে কর্মসূচি সফল করে এবং সবার আগে যাত্রাবাড়ী এলাকা মুক্ত করে।
৫ আগস্ট সকাল থেকে শহীদ মিনারে জড়ো হওয়ার কথা থাকলেও পুলিশের নির্বিচার গুলির মুখে ঢাকা মেডিকেলে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ অবস্থান নেয় এবং লড়াই করে হাসিনামুক্ত নতুন বাংলাদেশ জন্ম দেয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় সংগঠনটির শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এবং দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জহির উদ্দিন বলেন, ১ দফা দাবিতে ৪ আগস্ট সফল অসহযোগ আন্দোলনের দিন হাসিনা সারাদেশে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে। এতকিছুর পরও আমরা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, ৫ তারিখ শেখ হাসিনার পতন হবে। আমাদের ১৭ বছরের নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ বিফলে যাবে না। তবে, শেখ হাসিনা এভাবে চোরের মতো পালিয়ে যাবে সেটা অবশ্য চিন্তা করিনি।
জুলাইয়ের লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করবে বিএনপি সরকার
প্রথমে কোটা সংস্কার আন্দোলন থাকলেও জুলাই ধীরে ধীরে দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রের সংস্কারের আন্দোলন হয়ে ওঠে। শেষদিকে আপামর জনসাধারণ যারাই মাঠে নেমেছেন, তাদের মধ্যে নতুন বাংলাদেশ দেখার আশা কাজ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। বিএনপি মনে করছে, অন্তর্বর্তী সরকার ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলো বিএনপি সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করবে।
জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অন্তর্বর্তী সরকার কতুটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। একটি সরকার তো নির্ভুলভাবে সবকিছু করতে পারে না। কোথাও-কোথাও কিছু ফাঁক বা ত্রুটি থাকতেই পারে। সেটাকে আমি তেমন বড় কিছু মনে করি না। অন্তর্বর্তী সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। যদি কোনো ফাঁকফোকর থেকে থাকে, সেগুলো বর্তমান বিএনপি সরকার পূরণ করবে।’
জুলাই আন্দোলনের বড় অর্জন ভোটাধিকার আদায় হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের যে বড় দাবি তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি- বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমন দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। সরকার গঠনের তো মাত্র ৫ মাস হয়েছে। রাতারাতি কি সবকিছু করা সম্ভব? এগুলো রাষ্ট্র ও সংবিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়। সংবিধানে পরিবর্তন আনতে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমেরিকা বা ভারতের সংবিধান স্বাধীনতার শুরুতে যেমন ছিল, আজও কি ঠিক তেমন আছে? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সংশোধন হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। জুলাই আন্দোলনে যে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার ছিল এবং যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। যেগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, সেগুলো সংবিধানে যাবে। আর যেগুলো সাধারণ আইনের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেগুলো আইন আকারে করা হবে। সব বিষয় তো সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়।’
জানতে চাইলে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির বলেন, ‘২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তার মতে, অনির্বাচিত সরকারের কারণেই জনগণকে ওই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা, এটি সম্ভব হয়েছে। এর বাইরে মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের রাষ্ট্র গঠন, উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অর্থ পাচার রোধ- এসবই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল।’
নাসির বলেন, ‘এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি ধীরে-ধীরে কাজ করছে। আমরা আশা করি অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ করে সরকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।’
Reporter Name 

























