বাহ্যিকভাবে পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করা হলেও, ২০ জুলাই দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার মতো এক যুগান্তকারী ঘটনা। একটি প্রবাদ আছে—পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে তা একসময় ফেটে পড়ে। ২০ জুলাইয়ের শিক্ষার্থীদের এই গণবিক্ষোভ যেন ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য তেমনই এক বিশাল ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন ও ঔদ্ধত্যের ওপর ভর করে চেপে বসা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে কি শেষমেশ এক অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে?
বিষয়টি বোঝার জন্য কিছুটা পেছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সূত্রপাত হয়েছিল গত ১৭ জুলাই। মাত্র ১১ মাসের মাথায় দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পেছনে কারণ দর্শানো হয়েছিল পুলিশের ভেতরের দুর্নীতির কথা। অথচ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূল ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার একটি হাস্যকর চেষ্টা মাত্র। কারণ, কোনো অধস্তন কর্মকর্তার দুর্নীতির দায় যদি শীর্ষ পদে আঘাত করে, তবে নীতিগতভাবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগও বহু আগেই হওয়া উচিত ছিল।
দিল্লির শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা পরিবর্তনের আসল কারণ ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। লাদাখের পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুক যখন যন্তর মন্তরে অনশনে বসেছিলেন, তখন পুলিশ কমিশনারকে বলির পাঁঠা বানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শাসক দল ভেবেছিল, ওয়াংচুকের আন্দোলন হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই দমে যাবে। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জনগণের ভেতর জমে থাকা গভীর ক্ষোভকে অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।
যখন আন্দোলন ক্রমশ শক্তিশালী হতে শুরু করল এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার উপক্রম হলো, তখনই তাড়াহুড়ো করে পুলিশ কমিশনার বদলে ফেলা হয়। নির্দেশ দেওয়া হলো জঘন্য উপায়ে বলপ্রয়োগ করার। হাসপাতালে পাঠাও ওয়াংচুককে, বন্ধ করে দাও প্রতিবাদীর মুখ! এই কাণ্ডজ্ঞানহীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হলো।
ক্ষমতাসীন দল দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসে ভুগেছে। তাদের ধারণা ছিল, ভারতের রাজপথ কেবল তাদেরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে, কারণ সেখানে আর কাউকে নামতেই দেওয়া হবে না। উমর খালিদের মতো তরুণ সোচ্চার কণ্ঠগুলোকে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি রেখে তারা সমাজের বুকে ভীতি সঞ্চার করতে চেয়েছিল। তবে ক্ষমতার অহংকারে শাসককুল হয়তো ভুলে গিয়েছিল—চাপ দিয়ে ক্ষোভ সাময়িকভাবে চেপে রাখা যায়, কিন্তু নিঃশেষ করা যায় না।
গত ২০ জুলাই নিট পরীক্ষার দুর্নীতি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সোনম ওয়াংচুকের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী এবং তরুণ দিল্লিতে সমবেত হয়। সংসদ অভিমুখে তাদের প্রতিবাদের জোয়ার আছড়ে পড়ে। সেই উত্তাল রাজপথে নামানো হয় নির্মম পুলিশ বাহিনী।
নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে, টেনে-হিঁচড়ে ভ্যানে তুলে সরকার দেখাতে চেয়েছিল নিজেদের আইনশৃঙ্খলা ধরে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু তা উল্টে গেল তাদের বিরুদ্ধেই। যে ছবিগুলো সেদিন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে—ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অমানুষিক তাণ্ডব—তা কোটি কোটি মানুষের হৃদয় কাঁপিয়ে দিয়েছে। হিন্দি দৈনিক ‘দৈনিক ভাস্কর’-এর পাতায় আট কলাম জুড়ে শিরোনাম হলো, “১৪ বছরের মধ্যে সংসদের সামনে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।” এই একটি শিরোনামই প্রমাণ করে, শাসকদের সাজানো ‘সব ঠিক হ্যায়’-এর গল্প কত বড় একটা তাসের ঘর ছিল।
ক্ষমতার চূড়ায় এখন শুধুই অনিশ্চয়তার ভয়
সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক এলিয়াস ক্যানেটি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ *’ক্রাউডস অ্যান্ড পাওয়ার’-এ লিখেছিলেন, ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা একনায়কদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, “আদেশের ক্ষমতা যার হাতে সবচেয়ে বেশি, আদেশ পালন করার মতো ওপরে যার কেউ নেই, তার ভেতরে তৈরি হয় এক গভীর অনিশ্চয়তা ও ভয়।
আজ দিল্লির দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের ভেতরে ঠিক এই একই ভয়ের জন্ম হয়েছে। ২০ জুলাইয়ের ঘটনা প্রমাণ করেছে যে ভারতের তরুণ সমাজ এখন আর চুপ করে ভয় পেয়ে বসে থাকার পাত্র নয়। তাদের নিজেদের হতাশা, চাকরিহীনতা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আজ এক বিশাল সম্মিলিত প্রতিবাদে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একের পর এক অদূরদর্শী পদক্ষেপ এবং ক্ষমতার দম্ভ কেবল ছাত্রদের ক্ষুব্ধ করেনি, বরং সরকারের ভেতরেও এক গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেভাবে পুলিশি বলপ্রয়োগ করে একটি অনশনকে সংসদ অভিযানের মতো বিশৃঙ্খলায় পরিণত করলেন, তাতে উপ-প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যে অঘোষিত দৌড়ে তিনি ছিলেন, তা একপ্রকার হাতছাড়া হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বিরুদ্ধে আজ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম মাত্রায় পৌঁছেছে।
২০ জুলাই কেবল আরেকটি প্রতিবাদের দিন ছিল না; এটি ছিল সেই দিন, যেদিন সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। এটি সেই ঐতিহাসিক বিন্দু, যাকে বলা যায়—‘এ রুবিকন ওয়াজ ক্রসড’ (পিছু হটার আর পথ রইল না)।
হয়তো এই সরকারের পতন রাতারাতি ঘটবে না, কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে যে চিড় ২০ জুলাই ধরেছে, তা আর সহজে মেরামত করা যাবে না। এখন থেকে দিল্লির জোটসঙ্গী বা অন্যান্য সহযোগী দলগুলোও হয়তো এই স্বৈরাচারী শাসককুলের পাশাপাশি দাঁড়াতে একশবার ভাববে। সাধারণ মানুষের ভয় ভাঙার এই সূচনাই হতে পারে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনের প্রথম বড় পদক্ষেপ।
Reporter Name 






















