ঢাকা ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাতক্ষীরায় প্রথমবার ‘বাইকুনুর’ আঙুর চাষে সাফল্য

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০২:৫৭:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • ১২ বার

সাতক্ষীরার মাটিতে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার ‘বাইকুনুর’ জাতের আঙুর চাষে সাফল্য পেয়েছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে তার বাগানে এসেছে বাম্পার ফলন। বাজারে প্রতি কেজি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া এ আঙুর ইতোমধ্যে ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, এ সফলতা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফল চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কাজীরহাট এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা জাহিদ হাসান প্রায় দুই বিঘা পাঁচ কাঠা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে রাশিয়ার বাইকুনুর জাতের আঙুরের বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল, সবুজ ও হালকা সোনালি রঙের আঙুর। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি মিষ্টি ও রসালো। প্রতিদিনই বাগানটি দেখতে ভিড় করছেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কৃষক, উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীরা।

জাহিদ হাসান বলেন, সাতক্ষীরার মাটি খুবই উর্বর। এখানকার ফলের স্বাদও আলাদা। নতুন কিছু করার লক্ষ্য নিয়েই ১০ মাস আগে বাইকুনুর জাতের আঙুর চাষ শুরু করি। শুরুতে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা, ছাঁটাই, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করায় প্রথম বছরেই আশাতীত ফলন পেয়েছি।

তিনি বলেন, আমার বাগানের আঙুরগুলো খুবই মিষ্টি। বর্তমানে পাইকারি ৩৮০ টাকা এবং খুচরা ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। প্রথম বছরেই ২ লাখ টাকার বেশি বিক্রির আশা করছি। ভবিষ্যতে ফলন আরও বাড়বে বলে আশা করছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেকেই চারা নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন। বর্তমানে ২০০ ও ২৫০ টাকা দামে দুই ধরনের চারা বিক্রি করছি। আমাদের দেশেই যদি এ আঙুরের চাষ ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বিদেশ থেকে আঙুর আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে

তিনি আরও জানান, বর্তমানে তার বাগানে স্থায়ীভাবে ১৭ থেকে ১৮ জন শ্রমিক কাজ করছেন। মৌসুমে কাজের চাপ বাড়লে আরও পাঁচ থেকে ছয়জন অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। একই খামারে তিনি ড্রাগন, কুল ও পেয়ারার চাষও করছেন। তবে অতিবৃষ্টির কারণে এবার প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম ফলন হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাগান দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, সাতক্ষীরায় এত বড় আঙুরের বাগান এই প্রথম দেখলাম। আঙুরগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি মিষ্টি। জাহিদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা ও পরিশ্রম থাকলে আমাদের এলাকাতেও বিদেশি জাতের ফলের সফল চাষ সম্ভব।

একই এলাকার তরুণ কৃষক মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, জাহিদের বাগান দেখে আমাদের মতো অনেক তরুণের আগ্রহ বেড়েছে। আগে মনে হতো আঙুর চাষ শুধু বিদেশেই সম্ভব। এখন আমরা নিজেরাও এ ধরনের উচ্চমূল্যের ফল চাষের কথা ভাবছি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে আরও অনেকেই এগিয়ে আসবে।

কলারোয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মৃণাল কান্তি মণ্ডল বলেন, সাতক্ষীরার মাটিতে প্রথমবারের মতো বাইকুনুর জাতের আঙুরের সফল উৎপাদন হয়েছে। এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। সঠিক প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করলে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরা ইতোমধ্যে আম, ড্রাগন, কুলসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফল উৎপাদনে পরিচিতি পেয়েছে। সেই তালিকায় উন্নত জাতের আঙুর যুক্ত হলে কৃষির বহুমুখীকরণ আরও শক্তিশালী হবে। জাহিদ হাসানের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে এ অঞ্চলে আঙুর চাষ লাভজনক খাতে পরিণত হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সাতক্ষীরায় প্রথমবার ‘বাইকুনুর’ আঙুর চাষে সাফল্য

আপডেট টাইম : ০২:৫৭:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সাতক্ষীরার মাটিতে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার ‘বাইকুনুর’ জাতের আঙুর চাষে সাফল্য পেয়েছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে তার বাগানে এসেছে বাম্পার ফলন। বাজারে প্রতি কেজি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া এ আঙুর ইতোমধ্যে ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, এ সফলতা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফল চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কাজীরহাট এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা জাহিদ হাসান প্রায় দুই বিঘা পাঁচ কাঠা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে রাশিয়ার বাইকুনুর জাতের আঙুরের বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল, সবুজ ও হালকা সোনালি রঙের আঙুর। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি মিষ্টি ও রসালো। প্রতিদিনই বাগানটি দেখতে ভিড় করছেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কৃষক, উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীরা।

জাহিদ হাসান বলেন, সাতক্ষীরার মাটি খুবই উর্বর। এখানকার ফলের স্বাদও আলাদা। নতুন কিছু করার লক্ষ্য নিয়েই ১০ মাস আগে বাইকুনুর জাতের আঙুর চাষ শুরু করি। শুরুতে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা, ছাঁটাই, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করায় প্রথম বছরেই আশাতীত ফলন পেয়েছি।

তিনি বলেন, আমার বাগানের আঙুরগুলো খুবই মিষ্টি। বর্তমানে পাইকারি ৩৮০ টাকা এবং খুচরা ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। প্রথম বছরেই ২ লাখ টাকার বেশি বিক্রির আশা করছি। ভবিষ্যতে ফলন আরও বাড়বে বলে আশা করছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেকেই চারা নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন। বর্তমানে ২০০ ও ২৫০ টাকা দামে দুই ধরনের চারা বিক্রি করছি। আমাদের দেশেই যদি এ আঙুরের চাষ ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বিদেশ থেকে আঙুর আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে

তিনি আরও জানান, বর্তমানে তার বাগানে স্থায়ীভাবে ১৭ থেকে ১৮ জন শ্রমিক কাজ করছেন। মৌসুমে কাজের চাপ বাড়লে আরও পাঁচ থেকে ছয়জন অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। একই খামারে তিনি ড্রাগন, কুল ও পেয়ারার চাষও করছেন। তবে অতিবৃষ্টির কারণে এবার প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম ফলন হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাগান দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, সাতক্ষীরায় এত বড় আঙুরের বাগান এই প্রথম দেখলাম। আঙুরগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি মিষ্টি। জাহিদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা ও পরিশ্রম থাকলে আমাদের এলাকাতেও বিদেশি জাতের ফলের সফল চাষ সম্ভব।

একই এলাকার তরুণ কৃষক মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, জাহিদের বাগান দেখে আমাদের মতো অনেক তরুণের আগ্রহ বেড়েছে। আগে মনে হতো আঙুর চাষ শুধু বিদেশেই সম্ভব। এখন আমরা নিজেরাও এ ধরনের উচ্চমূল্যের ফল চাষের কথা ভাবছি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে আরও অনেকেই এগিয়ে আসবে।

কলারোয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মৃণাল কান্তি মণ্ডল বলেন, সাতক্ষীরার মাটিতে প্রথমবারের মতো বাইকুনুর জাতের আঙুরের সফল উৎপাদন হয়েছে। এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি উদ্যোগ। সঠিক প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করলে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরা ইতোমধ্যে আম, ড্রাগন, কুলসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফল উৎপাদনে পরিচিতি পেয়েছে। সেই তালিকায় উন্নত জাতের আঙুর যুক্ত হলে কৃষির বহুমুখীকরণ আরও শক্তিশালী হবে। জাহিদ হাসানের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে এ অঞ্চলে আঙুর চাষ লাভজনক খাতে পরিণত হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।