পুলিশে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা করছে সরকার, তখনই বাহিনীর ভেতরে উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে উঠেছেন কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তারা। জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি ও মেট্টোপলিটনের কমিশনার পদে পদায়ন পাওয়া কিছু পেশাদার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দেয়া হচ্ছে। আর এসব ট্যাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। তবে কোন কোন পুলিশ কর্মকর্তা অপেশাদার এবং চরম দুর্নীতিবাজ এসব পুলিশ কর্মকর্তাদের শেল্টার দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির পুলিশ বাহিনীকে জবাবদিহিতার মধ্যে এনে পুলিশকে জনগণের কল্যাণে পেশাদার বাহিনী হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে হারানো ইমেজ ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন।
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে ডেকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু সতর্কবার্তার পরও আচরণে পরিবর্তন না আসায় তাদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রচার শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এ নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়।
ভুক্তভোগী একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের বিএনপি ও জামায়াত-শিবির বলে ‘ট্যাগ’ দিয়ে বারবার পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিএনপি সরকার গঠনের পর ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদেরও শিবির ‘ট্যাগ’ দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে জেলার পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন কমিশনার ও রেঞ্জ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অজানা শঙ্কা কাজ করছে। যেকোনো সময় অপপ্রচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় তারা উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন। এতে বাহিনীর স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। এদের মধ্যে বিশেষভাবে ২৫তম ব্যাচ ও ২২তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তা পোস্টিং-সংক্রান্ত দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। আগে থেকেই বিভাগীয় মামলায় জড়িত থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন না পেয়ে তারা একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন এবং এর মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চালান।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নিজেদের ও অনুসারী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়ে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদবির করছেন কিছু পুলিশ কর্মকর্তা। এ ধরনের তদবিরের কারণে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রত হচ্ছেন। পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন সরকারি কাজও ব্যাহত হচ্ছে। তাই অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদবির না করতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। আইজিপির স্বাক্ষরে ৯ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তরের জারি করা ওই নির্দেশনায় বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত কিছু সদস্য অফিস চলাকালে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করছেন। বিষয়টি সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
নির্দেশনায় বলা হয়, এ ধরনের তদবিরের কারণে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রত হচ্ছেন। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন সরকারি কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে এমন কার্যকলাপ নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি স্মারক এবং পুলিশ সদর দপ্তরের আগের একটি নির্দেশনার মাধ্যমে বিষয়টি ইতিমধ্যে সব ইউনিটকে ও সব কটি জেলার পুলিশ সুপারকে জানানো হয়েছিল; কিন্তু একই ঘটনা আবারও ঘটছে বলে লক্ষ করা গেছে। সে জন্য আবারও এই নির্দেশনা দেওয়া হলো। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো পুলিশ সদস্য কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। পাশাপাশি পদোন্নতি বা অন্য কোনো বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় তদবির করা থেকেও বিরত থাকার জন্য পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে প্রত্যাহার হওয়া কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তারা বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৫তম ব্যাচের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে বিভাগীয় মামলার কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। তিনি এখন নিজেকে বঞ্চিত দাবি করে পেশাদার কর্মকর্তাদের শিবির ‘ট্যাগ’ দিচ্ছেন। দুর্নীতির অভিযোগে কয়েক মাস আগে ঢাকার নিকটবর্তী একটি জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত একজন কর্মকর্তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়; তিনিও এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে জানা গেছে। একইভাবে ২২তম ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা এই গোষ্ঠীকে উসকে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার কথাও বলা হচ্ছে। এদের সঙ্গে ২০তম ব্যাচের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবেই এই গোষ্ঠী বিভিন্ন কর্মকর্তাকে হয়রানি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে সহকর্মীদের বিব্রত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কাল্পনিক দুর্নীতি বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের হেয় করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই চক্রের অপতৎপরতা বন্ধ করা না গেলে বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। এতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
Reporter Name 






















