বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন রূপরেখা নির্ধারণ করতে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের কূটনীতি সামলানোর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বেইজিং সফর।
এই সফরে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় চীনের কাছে ২০০ কোটি ডলারের সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে বলে জানা গেছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর আমন্ত্রণে আগামী ৫ থেকে ৬ মে বেইজিং সফর করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ঢাকা-বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সূত্রগুলো তার এই সফরের সূচি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এই সফরে তার সফরসঙ্গী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। বেইজিং সফরকালে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠক করবেন খলিলুর রহমান।
বাংলাদেশ নিয়ে চীনের আগ্রহ থাকলেও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে বড় ধরনের এনগেজমেন্টে যেতে পারেনি বেইজিং। বর্তমানে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এ সরকারের সঙ্গে অতীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে চীনের। তবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিকে নতুন করে চীন নিয়ে ভাবতে হবে। নতুন প্রেক্ষাপট ও চলমান বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে আগামী দিনগুলোতে সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে। আর এই সফর হতে পারে ইতিবাচক আলোচনার একটি বড় মাধ্যম।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে আলোচনার বিষয়ে ঢাকা-বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন, বাংলাদেশ-চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের বাস্তবায়ন, চীনে কাঁঠাল রপ্তানি, গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রামের মধ্যে ফ্লাইট চালু, চীনা শিল্প স্থানান্তর, রোহিঙ্গা সংকট ও চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন চাওয়ার ওপর জোর দেবে ঢাকা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা, উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সহযোগিতা জোরদার করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভসহ অন্যান্য উদ্যোগ ব্যবহার করে বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্ব দিতে পারে।
এছাড়া রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করতে পারে।
ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার সহায়তা দরকার। চীনের কাছে এই সহায়তা চাইতে পারে বাংলাদেশ। হয়তো বেইজিং সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রয়োজনের বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারেন।
সরকারের এক কর্মকর্তা বলেন, এপ্রিলে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রসচিবদের মধ্যে ঢাকায় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে চীনের অনুরোধে তা স্থগিত করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নিয়ে কাজ চলছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস ঢাকা পোস্টকে বলেন, “সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তত সবাই চাইবে একটা ওয়ার্কিং রিলেশনস থাকুক। সম্পর্ক কখনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেলে ওখানে অন্য একজন চলেই আসে। ভারতের সঙ্গে খুব চ্যালেঞ্জিং হলে সেখানে চীন বা পাকিস্তান বা যুক্তরাষ্ট্র চলে আসবে। ঠিক চীনের সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং হলেও অন্য কেউ চলে আসবে। সেজন্য আমাদের নিজেদেরই একটু চিন্তাভাবনা করে দেখা দরকার কার সঙ্গে আমরা কতটুকু যেতে পারব বা যেতে চাই। সেটার একটা রূপরেখা আগামী পাঁচ বছরের জন্য বানিয়ে ফেলা উচিত। স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘ সময়ের সম্পর্ক বিবেচনায় রাজনৈতিক কৌশল বা কমপ্রিহেনসিভ একটা রূপরেখা তো আমাদের দাঁড় করানো উচিত সব কিছু মিলিয়ে; সব দেশের সঙ্গে।”
তিনি আরও বলেন, ‘চীন সব সময় ভালো সম্পর্ক রাখার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিগত সময়ে যারা সরকারে ছিল, তাদের সঙ্গেও সম্পর্কে ভারসাম্য ছিল চীনের। চীন আমাদের সবচেয়ে বড় রপ্তানি সাপ্লায়ার। বাংলাদেশে চীনের প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগ আছে, একটি চাইনিজ ইপিজেড করা হয়েছে। এগুলো আগে থেকে আছে, এগুলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অবশ্যই আমাদের চীনের সঙ্গে সব সময় ইতিবাচক একটি এনগেজমেন্টে থাকতে হবে।’
এপ্রিলের শুরুতে শুভেচ্ছা সফরে দুই দিনের জন্য ভারত গিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি ব্রাসেলস সফরে রয়েছেন। ব্রাসেলস থেকে তিনি ভোট চাইতে যাবেন আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দপ্তর আদ্দিস আবাবায়। সেখান থেকে দেশে ফেরার দিন দশকের মাথায় বেইজিং সফরে যাবেন খলিলুর রহমান।
ঢাকার প্রতি চীনের আগ্রহ রয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চায় দেশটি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আমন্ত্রণে বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বর্তমানে চীন সফরে রয়েছে। প্রতিনিধিদলের প্রধান বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ (রোববার) রাতে চীনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।
এছাড়া বেইজিংয়ে দুই দিনব্যাপী একটি সম্মেলনে অংশ নিতে সোমবার (২০ এপ্রিল) চীন যাবেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এরপর আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে বেইজিং যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা।
Reporter Name 






















