ঢাকা ১২:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জেলায় হবে নদী রক্ষা আদালত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১৮:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
  • ১ বার

প্রচলিত আইন সংশোধন করে দেশের নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে দখল এবং দূষণমুক্ত রাখতে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮ আইনের অধীন একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, অনুরূপ বিচারিক ক্ষমতা পাবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিটি জেলায় নদী রক্ষা আদালত স্থাপন করবে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া মতামতের জন্য সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামে এ খসড়ার বিষয়ে আগামী ১৬ এপ্রিলের মধ্যে মতামত পাঠাতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বর্তমান কমিশনের নদীদূষণ ও দখল রোধে সরকারকে সুপারিশ করা ছাড়া কোনো কাজ নেই। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কমিশন নদী, খাল, উপকূল দখল ও দূষণ রোধ এবং এসবের উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেবে। এ নির্দেশনা মানতে সংস্থাগুলো বাধ্য থাকবে। সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কমিশনের কাছে জবাবদিহি করবে। জানতে চাইলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমান আইন অনুসারে আমাদের সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। আমরা শুধু সুপারিশ করতে পারি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই সুপারিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে যেতে যেতে হারিয়ে যায়। ফলে নদী রক্ষায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না কমিশন। এসব বিবেচনা করে সরাসরি প্রয়োগ করার মতো কিছু ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে কমিশন থেকে।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা সংস্থা কর্তৃক নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূল অবৈধভাবে দখল, ভরাট বা অন্য কোনো অবৈধ পন্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা জলাধারের ক্ষতিসাধন করার অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এ ছাড়া শিল্পকারখানার পয়োপ্রণালি, অপরিশোধিত বর্জ্য নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূলে নিঃসরণ করলে; নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূলের পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করলে; নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূলে অবৈধ স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করলে বা পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে বা নৌ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটালে; নদী খাল বা উপকূলের আকৃতি, প্রকৃতি বা ধরন পরিবর্তন করলে এবং নদী, খাল বা উপকূল থেকে অননুমোদিতভাবে বালু, পাথর বা মাটি উত্তোলন করলে একই ধরনের শাস্তি আরোপ করার বিধান রাখা হয়েছে সংশোধিত আইনের খসড়ায়। সূত্র জানায়, বর্তমান আইনে নদী দখল ও দূষণকারীদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তির কথা নেই। তবে বিভিন্ন আইনে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার শাস্তির কথা আছে। পরিবেশ আইনেও নদী দখল-দূষণের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। পানি আইনেও নদীসংক্রান্ত অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু নদীর ক্ষেত্রে এ আইনগুলোর বাস্তবায়ন তারা করেনি। নদী দখল ও দূষণের জন্য কাউকে কারাদণ্ড পেতে হয়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনে দেশের সব নদীকে আইনি ব্যক্তি, আইনি সত্তা এবং জীবন্ত সত্তা হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। নদনদীর আইনগত অভিভাবক হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দায়িত্ব পালন করবে। বর্তমান আইনে কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে অভিহিত করা হলেও প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যেটি স্বাধীনভাবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে তল্লাশি ও মালামাল জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কমিশন অপরাধীর অপরাধ সংশ্লিষ্ট উপকরণ, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো তল্লাশি, জব্দ এবং বাজেয়াপ্ত করে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে পারবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ভবন ও অবকাঠামোতে বিদ্যমান কার্যক্রম সাময়িক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিতে পারবে। এই ধারার অধীন কোনো মালামাল বাজেয়াপ্ত হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে না বা ক্ষতিপূরণের জন্য কোনো আদালতে দাবি উত্থাপন করা যাবে না। কমিশন-সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯ সালে তুরাগ নদসংক্রান্ত একটি উচ্চ আদালতের রায়ে দেশের সব নদনদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘আইনি ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখন সেটি আইনে যুক্ত করা হচ্ছে। এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার জন্য একটি আইনের খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে বিভিন্ন মহলের চাপে সেই আইনটি অনুমোদন হয়নি।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জেলায় হবে নদী রক্ষা আদালত

আপডেট টাইম : ১১:১৮:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

প্রচলিত আইন সংশোধন করে দেশের নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে দখল এবং দূষণমুক্ত রাখতে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮ আইনের অধীন একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, অনুরূপ বিচারিক ক্ষমতা পাবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিটি জেলায় নদী রক্ষা আদালত স্থাপন করবে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া মতামতের জন্য সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামে এ খসড়ার বিষয়ে আগামী ১৬ এপ্রিলের মধ্যে মতামত পাঠাতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বর্তমান কমিশনের নদীদূষণ ও দখল রোধে সরকারকে সুপারিশ করা ছাড়া কোনো কাজ নেই। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কমিশন নদী, খাল, উপকূল দখল ও দূষণ রোধ এবং এসবের উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেবে। এ নির্দেশনা মানতে সংস্থাগুলো বাধ্য থাকবে। সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কমিশনের কাছে জবাবদিহি করবে। জানতে চাইলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমান আইন অনুসারে আমাদের সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। আমরা শুধু সুপারিশ করতে পারি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই সুপারিশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে যেতে যেতে হারিয়ে যায়। ফলে নদী রক্ষায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না কমিশন। এসব বিবেচনা করে সরাসরি প্রয়োগ করার মতো কিছু ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে কমিশন থেকে।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা সংস্থা কর্তৃক নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূল অবৈধভাবে দখল, ভরাট বা অন্য কোনো অবৈধ পন্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা জলাধারের ক্ষতিসাধন করার অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এ ছাড়া শিল্পকারখানার পয়োপ্রণালি, অপরিশোধিত বর্জ্য নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূলে নিঃসরণ করলে; নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূলের পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করলে; নদী, খাল বা সমুদ্র উপকূলে অবৈধ স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করলে বা পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে বা নৌ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটালে; নদী খাল বা উপকূলের আকৃতি, প্রকৃতি বা ধরন পরিবর্তন করলে এবং নদী, খাল বা উপকূল থেকে অননুমোদিতভাবে বালু, পাথর বা মাটি উত্তোলন করলে একই ধরনের শাস্তি আরোপ করার বিধান রাখা হয়েছে সংশোধিত আইনের খসড়ায়। সূত্র জানায়, বর্তমান আইনে নদী দখল ও দূষণকারীদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তির কথা নেই। তবে বিভিন্ন আইনে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার শাস্তির কথা আছে। পরিবেশ আইনেও নদী দখল-দূষণের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। পানি আইনেও নদীসংক্রান্ত অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু নদীর ক্ষেত্রে এ আইনগুলোর বাস্তবায়ন তারা করেনি। নদী দখল ও দূষণের জন্য কাউকে কারাদণ্ড পেতে হয়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনে দেশের সব নদীকে আইনি ব্যক্তি, আইনি সত্তা এবং জীবন্ত সত্তা হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। নদনদীর আইনগত অভিভাবক হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দায়িত্ব পালন করবে। বর্তমান আইনে কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে অভিহিত করা হলেও প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যেটি স্বাধীনভাবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে তল্লাশি ও মালামাল জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কমিশন অপরাধীর অপরাধ সংশ্লিষ্ট উপকরণ, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো তল্লাশি, জব্দ এবং বাজেয়াপ্ত করে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে পারবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ভবন ও অবকাঠামোতে বিদ্যমান কার্যক্রম সাময়িক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিতে পারবে। এই ধারার অধীন কোনো মালামাল বাজেয়াপ্ত হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে না বা ক্ষতিপূরণের জন্য কোনো আদালতে দাবি উত্থাপন করা যাবে না। কমিশন-সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯ সালে তুরাগ নদসংক্রান্ত একটি উচ্চ আদালতের রায়ে দেশের সব নদনদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘আইনি ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখন সেটি আইনে যুক্ত করা হচ্ছে। এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার জন্য একটি আইনের খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে বিভিন্ন মহলের চাপে সেই আইনটি অনুমোদন হয়নি।