ঢাকা ০৮:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কার ইশারায় জাহাজ চলছে হরমুজে, ১৯ দিনে পার হয়েছে ১০০

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:১৫:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
  • ৩ বার

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। তবে বিবিসি ভেরিফাই-এর এক বিশেষ তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।

বিবিসি ভেরিফাই বলছে, ইরানের হামলা ও অবরোধ সত্ত্বেও চলতি মাসের মাসের শুরু থেকে (১৯ দিনে) এ পর্যন্ত প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালি হয়ে চলাচল করত। কিন্তু শিপিং অ্যানালিস্ট প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মাত্র ৯৯টি জাহাজ এই সংকীর্ণ (মাত্র ৩৮ কিলোমিটার প্রশস্ত) জলপথ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ এখন প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৫ থেকে ৬টি জাহাজ যাতায়াত করছে। সেই হিসেবে মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে কারা, কীভাবে পার হচ্ছে এই নিষিদ্ধ পথ? বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে যে জাহাজগুলো এই পথ ব্যবহার করছে, তার এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনোভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ১৪টি জাহাজ সরাসরি ইরানের পতাকাবাহী। বাকিগুলোর বিরুদ্ধে তেহরানের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া ৯টি জাহাজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা চীনের এবং ৬টি জাহাজ ভারতের গন্তব্যে যাচ্ছিল।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন কিছু (গ্রিক মালিকানাধীন) জাহাজকেও ইরানের বন্দরে নোঙর করতে দেখা গেছে।

বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সফলভাবে হরমুজ পার হওয়া জাহাজগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। যেমন, গত ১৫ মার্চ পাকিস্তানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক নৌপথের পরিবর্তে ইরানের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে চলাচল করেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা থিংকট্যাংক র‍্যান্ড করপোরেশনের গবেষক ব্র্যাডলি মার্টিন বলেন, ‘জাহাজটি সম্ভবত ইরানের দেওয়া কোনো বিশেষ দিকনির্দেশনা মেনে চলছিল।’

শিপিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান মূলত হামলার ভয় এবং মাইন স্থাপনের আতঙ্ক ছড়িয়ে জাহাজগুলোকে তাদের নিজস্ব জলসীমায় ঢুকতে বাধ্য করছে।

উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম অ্যানালিটিক্সের মিশেল উইস বকম্যান বলেন, ‘ইরান এখন ভয় দেখিয়ে এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক চ্যানেল ব্যবহার না করে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে তারা তেহরানের সামুদ্রিক আইন ও নজরদারির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।’

এদিকে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। গত ১১ মার্চ থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘ময়ূরী নারী’ নামক একটি জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এই হামলায় ২৩ জন ক্রুর মধ্যে ৩ জন নিখোঁজ হন (যারা ইঞ্জিন রুমে আটকা পড়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে)। একই দিনে গ্রিক মালিকানাধীন ‘স্টার গুইনেথ’ এবং মার্কিন মালিকানাধীন ‘এমটি সেফসি বিষ্ণু’ নামে দুটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়।

ইরাকের উপকূলে নোঙর করা ‘এমটি সেফসি বিষ্ণু’ জাহাজে হামলায় একজন প্রাণ হারান এবং ২৮ জন ক্রু জ্বলন্ত জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হন। জাহাজটির মালিক এস ভি আঞ্চান ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবিসিকে বলেন, ‘বাণিজ্যিক নৌপথ কোনো যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে না। এখানকার কর্মীরা সৈন্য নন, তারা পেশাদার কর্মী। এরাই বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখেন।’

বিবিসি ভেরিফাই বলছে, শনাক্তকরণ এড়াতে বেশির ভাগ জাহাজই এখন তাদের ‘অটোমেটিক আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম’ (এআইএস) বা ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখে এই এলাকা পার হচ্ছে।

কেপলার-এর বিশ্লেষক দিমিত্রি আম্পাতজিদিস বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক জাহাজ এখন চোখ বন্ধ করে বা রাডার অফ করে এই প্রণালি পার হচ্ছে।’

জাহাজগুলো ওমান উপসাগরে প্রবেশের সময় ম্যাপ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং কয়েক ঘণ্টা বা দিন পর অন্য কোনো স্থানে আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে এই রহস্যময় পারাপার নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট এবং মাইনের এই বহুমুখী হুমকি মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি সরু এবং অগভীর হওয়ায় এবং এর উপকূলীয় এলাকা পাহাড়ঘেরা হওয়ায় ইরান খুব সহজেই ওপর থেকে হামলা চালাতে পারে। ফলে যারা এই অস্থির সময়েও হরমুজ অতিক্রম করতে পেরেছে বা পারছে, তারা ইরানের ইশারা বা আনুকূল্য পেয়েই এটা করছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

কার ইশারায় জাহাজ চলছে হরমুজে, ১৯ দিনে পার হয়েছে ১০০

আপডেট টাইম : ০৭:১৫:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। তবে বিবিসি ভেরিফাই-এর এক বিশেষ তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।

বিবিসি ভেরিফাই বলছে, ইরানের হামলা ও অবরোধ সত্ত্বেও চলতি মাসের মাসের শুরু থেকে (১৯ দিনে) এ পর্যন্ত প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালি হয়ে চলাচল করত। কিন্তু শিপিং অ্যানালিস্ট প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মাত্র ৯৯টি জাহাজ এই সংকীর্ণ (মাত্র ৩৮ কিলোমিটার প্রশস্ত) জলপথ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ এখন প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৫ থেকে ৬টি জাহাজ যাতায়াত করছে। সেই হিসেবে মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে কারা, কীভাবে পার হচ্ছে এই নিষিদ্ধ পথ? বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে যে জাহাজগুলো এই পথ ব্যবহার করছে, তার এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনোভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ১৪টি জাহাজ সরাসরি ইরানের পতাকাবাহী। বাকিগুলোর বিরুদ্ধে তেহরানের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া ৯টি জাহাজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা চীনের এবং ৬টি জাহাজ ভারতের গন্তব্যে যাচ্ছিল।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন কিছু (গ্রিক মালিকানাধীন) জাহাজকেও ইরানের বন্দরে নোঙর করতে দেখা গেছে।

বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সফলভাবে হরমুজ পার হওয়া জাহাজগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। যেমন, গত ১৫ মার্চ পাকিস্তানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক নৌপথের পরিবর্তে ইরানের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে চলাচল করেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা থিংকট্যাংক র‍্যান্ড করপোরেশনের গবেষক ব্র্যাডলি মার্টিন বলেন, ‘জাহাজটি সম্ভবত ইরানের দেওয়া কোনো বিশেষ দিকনির্দেশনা মেনে চলছিল।’

শিপিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান মূলত হামলার ভয় এবং মাইন স্থাপনের আতঙ্ক ছড়িয়ে জাহাজগুলোকে তাদের নিজস্ব জলসীমায় ঢুকতে বাধ্য করছে।

উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম অ্যানালিটিক্সের মিশেল উইস বকম্যান বলেন, ‘ইরান এখন ভয় দেখিয়ে এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক চ্যানেল ব্যবহার না করে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে তারা তেহরানের সামুদ্রিক আইন ও নজরদারির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।’

এদিকে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। গত ১১ মার্চ থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘ময়ূরী নারী’ নামক একটি জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এই হামলায় ২৩ জন ক্রুর মধ্যে ৩ জন নিখোঁজ হন (যারা ইঞ্জিন রুমে আটকা পড়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে)। একই দিনে গ্রিক মালিকানাধীন ‘স্টার গুইনেথ’ এবং মার্কিন মালিকানাধীন ‘এমটি সেফসি বিষ্ণু’ নামে দুটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়।

ইরাকের উপকূলে নোঙর করা ‘এমটি সেফসি বিষ্ণু’ জাহাজে হামলায় একজন প্রাণ হারান এবং ২৮ জন ক্রু জ্বলন্ত জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হন। জাহাজটির মালিক এস ভি আঞ্চান ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবিসিকে বলেন, ‘বাণিজ্যিক নৌপথ কোনো যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে না। এখানকার কর্মীরা সৈন্য নন, তারা পেশাদার কর্মী। এরাই বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখেন।’

বিবিসি ভেরিফাই বলছে, শনাক্তকরণ এড়াতে বেশির ভাগ জাহাজই এখন তাদের ‘অটোমেটিক আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম’ (এআইএস) বা ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখে এই এলাকা পার হচ্ছে।

কেপলার-এর বিশ্লেষক দিমিত্রি আম্পাতজিদিস বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক জাহাজ এখন চোখ বন্ধ করে বা রাডার অফ করে এই প্রণালি পার হচ্ছে।’

জাহাজগুলো ওমান উপসাগরে প্রবেশের সময় ম্যাপ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং কয়েক ঘণ্টা বা দিন পর অন্য কোনো স্থানে আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে এই রহস্যময় পারাপার নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট এবং মাইনের এই বহুমুখী হুমকি মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি সরু এবং অগভীর হওয়ায় এবং এর উপকূলীয় এলাকা পাহাড়ঘেরা হওয়ায় ইরান খুব সহজেই ওপর থেকে হামলা চালাতে পারে। ফলে যারা এই অস্থির সময়েও হরমুজ অতিক্রম করতে পেরেছে বা পারছে, তারা ইরানের ইশারা বা আনুকূল্য পেয়েই এটা করছে।