বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত, ন্যায় ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। জনগণের ভালোবাসায় ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়েই আগামী পাঁচ বছর দেশ চালাতে চাই। আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না। আমরা ঐক্যের বাংলাদেশ চাই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় উত্তরাঞ্চলে দু’দিনের সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ১০ দলীয় ঐক্য জোটের নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা ও বগুড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া বেকারদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, যমুনা নদীর ভাঙনে মানুষ প্রতিবছর সর্বস্বান্ত হয়। আমরা ক্ষমতায় গেলে যমুনা নদী খনন করব, যমুনার বাঁধকে শক্তিশালী করব। যমুনা নদী শাসনের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জের উন্নতি করব। সেইসঙ্গে দুগ্ধ উৎপাদন করে সরাসরি ঢাকায় না পাঠিয়ে সারা দেশের চাহিদা পূরণ করব। তাঁতসমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জের দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করা হবে। গতকাল বিকেলে সিরাজগঞ্জ শহরের ইসলামিয়া কলেজ মাঠে জেলা জামায়াত আয়োজিত বিশাল নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি, আল্লাহ যদি সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে জনগণের একটি টাকার ওপরে আমরা হাত বসাবো না। আমরা কথা দিচ্ছি আল্লাহ যদি আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলে সহ্য করব না। দুর্নীতিকে মাটির নিচে চাপা দেয়ার চেষ্টা করব।
বগুড়ার শেরপুরে জেলা জামায়াতের উদ্যোগে বগুড়া জেলা আমীর মাওলানা আব্দুল হকের সভাপতিত্বে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। চাঁদাবাজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভয় পেয়ো না চাঁদাবাজ। আমরা তোমাদের হাতেও সম্মানের রুজির কাজ তুলে দেবো, ইন শা-আল্লাহ। তোমরাও গর্বের সাথে বাংলাদেশে বসবাস করবে। লোভের বশবর্তী হয়ে হয়তো খারাপ করেছো, তোমরা তওবা করে ভালোভাবে চলবে।
সাংবাদিকদের সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, আপনারা আমাদের দিকে খাড়া দৃষ্টি রাখুন। আপনারা ওয়াচডগ হিসেবে অত্যন্ত তীর্যকভাবে দেখবেন। তবে সাদাকে সাদা বলবেন, কালোকে কালো বলবেন। তবে সাদার গায়ে কোনো কালো প্রলেপ লাগাবেন না। কোনো কালোকে গ্রহণ করবেন না। তাহলে দেশ ভালো চলবে এবং আপনাদের অবদানের জন্য দেশবাসী কৃতজ্ঞ থাকবে।
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা দেশকে পারস্পরিক ভালোবাস ও সম্মানের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। মায়েরা সম্মানের ও মর্যাদার সাথে নিরাপদে ঘরে থাকবেন ও বাইরে চলাচল করবেন। একইভাবে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কর্মক্ষেত্রে তারা মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে কাজ করবেন। সকল পেশায় তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে, ইন শা-আল্লাহ।
দলের ঘোষিত নীতিমালার বিষয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সকল শিশুর চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। ষাট বছরের ঊর্ধ্বে সকল মানুষের চিকিৎসার ভার নেবে রাষ্ট্র, তবে যারা স্বচ্ছলতার কারণে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবেন-রাষ্ট্র তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। এছাড়া অন্য বয়সী যারা রয়েছেন তারা রাষ্ট্রের সাথে অংশীদারত্বে থাকবেন।
তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা যুবক-যুবতীদের বলছি, আমরা তোমাদের কোনো বেকার ভাতা দেবো না। তোমাদের বেকার বানিয়ে রাখতে চাই না। তোমাদের দুই হাতকে দেশ গড়ার কারিগর বানাতে চাই। তোমাদের কাছে মর্যাদার কাজ তুলে দিতে চাই। দেশে কিংবা বিদেশে তোমরা মর্যাদার সাথে অবদান রাখবে। আমরা তোমাদের শিক্ষা দিয়ে সেইভাবেই গড়ে তুলবো। শিক্ষা শেষে কাজ তোমাদের হাতে চলে আসবে, ইন শা-আল্লাহ। বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরতে হবে না, সে দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে। যার জন্য যে শিক্ষা প্রযোজ্য, যার মেধা যেখানে প্রযোজ্য তার মেধা বিকাশে রাষ্ট্র হবে সেখানে সঙ্গী। সেই মর্যাদার বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি।
চাঁদাবাজ, দখলবাজ, মামলাবাজদের বিরুদ্ধে জনগণকে ভূমিকা রাখার এবং গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান আমীরে জামায়াত।
পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সব দেশের সাথে বন্ধুত্ব চাই। কেউ আমাদের প্রভু হয়ে আসুক তা আমরা চাই না। বাংলাদেশের মানুষ ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। আমাদের সন্তানেরা আধিপত্যবাদকে লালকার্ড দেখিয়েছে। এ কার্ড সবুজ ও হলুদও হবে না। এইটা লালকার্ড হিসেবেই থাকবে।
এসময় শেরপুর-ধুনট আসনে জামায়াতের এমপি প্রার্থী মাওলানা দবিবুর রহমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন আমীরে জামায়াত।
বগুড়ায় সিটি কর্পোরেশন – বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রতিশ্রুতি জামায়াত আমিরের :
বগুড়াকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। একইসাথে বগুড়ায় একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি। বগুড়া সদরে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, গাইবান্ধা ও বগুড়াবাসীর দাবি অনুযায়ী আমরা দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করব। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে সাড়ে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এসব টাকা দেশে এনে আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নয়নখাতে ব্যয় করা হবে। এমন সিস্টেম ডেভেলপ করা হবে, চোরেরা আর চুরি করতে পারবে না। রাষ্ট্রের টাকা রাষ্ট্রীয় খাতেই ব্যয় করা হবে।
জামায়াতের আমির বলেন, দেশের জনগণ সাক্ষী, জামায়াতের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি করে না। আমাদের হাত পবিত্র। এ পবিত্র হাত দিয়েই আমাদের প্রতিশ্রুত সকল ওয়াদা বাস্তবায়ন করা হবে ইন শা-আল্লাহ। মা বোনদের জীবন আমাদের জীবনের চাইতেও বেশি পবিত্র। তাদের জন্য আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ব ইন শা-আল্লাহ।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ি সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১০ দলীয় নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, আমরা কারো লাল চোখকে ভয় করি না। আমরা কারো ওপর খবরদারি করতে চাই না। আবার আমাদের দেশের ওপর কেউ খবরদারি করুক, সেটাও সহ্য করবো না।
উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনাদের সমর্থনে আল্লাহর রহমতে সুযোগ পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে আমরা বাস্তবায়ন করে ছাড়বো। নদীর জীবন ফিরে আসলে উত্তরাঞ্চলের মানুষেরও জীবন ফিরবে।
তিনি বলেন, আমরা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজদের রুখে দিবো। তিনি চাঁদাবাজদের ভয় না পাবার কথাও বলেন। তিনি বলেন, আমরা কাউকে ভাতা নয়, কাজ দিবো। আপনাদেরও কাজ দিবো। আমরা আপনাদের সম্পদে পরিণত করতে চাই -যোগ করেন তিনি।
আমরা আপনাদেরকে মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা এবং কাজ দিতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মাটিকে আমরা ভালোবাসি। এ কারণে শত জুলুমের পরও আমরা কোথাও চলে যাইনি। আল্লাহ সুযোগ দিলে আমরা আপনাদের সাথে নিয়ে চলতে চাই। মায়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই।
বক্তব্য শেষে ডা. শফিকুর রহমান গাইবান্ধা জেলার ৫টি সংসদীয় আসনের ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেন। প্রতীক তুলে দিয়ে তিনি বলেন, এই পাঁচজনকে আপনাদের কাছে আমনাত হিসেবে রেখে গেলাম। এই আমানতকে আপনারা আমাদরেকে উপহার দিবেন।
শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করলেন জামায়াত আমির : ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের কবর জেয়ারত করেন জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল সকাল ৮টায় রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া গ্রামে তার বাড়িতে আসেন তিনি। এসময় আবু সাঈদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া করেন।
এসময় জামায়াত আমীর বলেন, দেশের এক ইঞ্চি জমির সম্মান আমরা কারো কাছে বন্ধক রাখবো না। যেভাবে আবু সাঈদেরা বুক পেতে দিয়েছিলো সেভাবে আমরাও বুক পেতে দিতে রাজি আছি। আমরা কথা দিচ্ছি, জীবন যাবে কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবো না। তিনি বলেন, আবু সাঈদেরা জীবন দিয়ে দেশের আমানত আমাদের কাছে রেখে গেছেন। আমরাও জীবন দিয়ে এসব আমানত রক্ষা কবরো।
দেশে কোনো আধিপত্যবাদীদের স্থান দেয়া হবে না : দু’দিনের উত্তরবঙ্গ সফরের শেষ দিনে গতকাল রাতে পাবনার জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর দেশের মান-মর্যাদা অন্য দেশের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিল। এখন থেকে সেটি হতে দেয়া যাবে না। দেশে কোনো আধিপত্যবাদীদের স্থান দেয়া হবে না। এই সবকিছুর জন্য একটা পরিবর্তন দরকার।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দশদলীয় জোট সরকার গঠন করলে চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের হাত ভেঙে দেব। চব্বিশের ৬ আগস্ট থেকে চাঁদাবাজি দখলবাজি করে কিছু লোক নিজেদের ভাগ্য বদলে লেগে পড়েন। আমরা বলেছি চাঁদা নেবো না, দুর্নীতি করবো না। সরকার গঠন করলে চাঁদাবাজ দুর্নীতিবাজদের হাত ভেঙে দেবো। ন্যায়বিচার ও সাম্যতা নিশ্চিত করা হবে।
দশদলীয় জোটে পাবনাবাসীর কাছে ভোট দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, বস্তাপচা রাজনীতিকে লাল কার্ড দেখাতে হবে। গণভোটে হ্যাঁ বলতে হবে। দ্বিতীয় ভোট দেবেন সরকার গঠনের জন্য। দশ দল মানে বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশকে ভোট দেবেন। পাবনায় দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করলে আপনাদের আমাদের কাছে যেতে হবে না। আমরা খুঁজে খুঁজে আপনাদের কাছে যাবো।
জনসভায় জেলা জামায়াতের আমির ও পাবনা-৪ আসনের প্রার্থী আবু তালেব ম-লের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল গাফফারের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। এসময় পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান, পাবনা-২ আসনের প্রফেসর হেসাব উদ্দিন, পাবনা-৩ আসনের মাওলানা আলী আছগার ও পাবনা-৫ আসনের প্রিন্সিপাল ইকবাল হুসাইনসহ ১০ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
Reporter Name 
























