ঢাকা ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্লাস্টিকের বোতলে পানির বদলে ‘বিষ’ খাচ্ছি আমরা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০৩:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২২ বার
শুধু পথেঘাটে মিনারেল ওয়াটার নয়, ছাত্রাবাস,মেস, হোটেল এমনকি বাসা বাড়িতেও প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠেছে। পানি বিশুদ্ধ হলেও প্লাস্টিকের বোতলের কারণে যে সেটি ক্রমেই বিষে পরিণত হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের অধিকাংশই সচেতন না। এ ছাড়া প্লাস্টিকের বোতলে এই পানি কতটা ‘বিশুদ্ধ’, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণা বলছে, প্লাস্টিকের বোতলে আছে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানোপ্লাস্টিক এতই ছোট, একজন মানুষের চুলের গড় প্রস্থের এক হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম। পানির সঙ্গে এগুলো পরিপাকতন্ত্রের টিস্যু বা ফুসফুসের মাধ্যমে রক্ত ​​প্রবাহে চলে যেতে পারে। প্লাস্টিক থেকে আসা সম্ভাব্য ক্ষতিকারক সিন্থেটিক রাসায়নিক শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে যেতে পারে।
আমেরিকার বিখ্যাত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, স্বাভাবিক আকৃতির এক লিটার পানির প্লাস্টিকের বোতলে সাত ধরনের প্লাস্টিক আছে। গড়ে দুই লাখ চল্লিশ হাজার প্লাস্টিকের কণা আছে এক লিটারে! যার মধ্যে নব্বই শতাংশ ন্যানোপ্লাস্টিক। বাকিগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পলিমারের টুকরা। এর আকৃতি পাঁচ মিলিমিটার থেকে এক ইঞ্চির পঁচিশ হাজার ভাগের এক ভাগ বা এক মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে ন্যানোপ্লাস্টিক এক মিটারের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ।
ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালের জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যায় কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা একটি নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কথা বলেছেন। এই প্রযুক্তি বোতলজাত পানিতে ন্যানো পার্টিকেলের রাসায়নিক গঠন দেখতে পারে। এ ছাড়া ন্যানো কণার সংখ্যা গণনা এবং বিশ্লেষণও করতে পারে। দেখা গেছে, প্রতি লিটারে ৩০০-এর পরিবর্তে অনেক বেশি কণা আছে। নতুন গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া ৯টি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পানি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের ন্যানো কণার প্রকৃত সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজারের মধ্যে। গবেষকেরা পানির ব্র্যান্ডের নাম গোপন রেখেছে।
এই গবেষণাপত্রের সহলেখক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-দোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির সহযোগী অধ্যাপক বেইজহান ইয়ান সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘নতুন প্রযুক্তি দিয়ে পানিতে লাখ লাখ ন্যানো কণা দেখা সম্ভব হয়েছে। সব মাইক্রো কণাকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের বাইরে জৈব-অজৈব অন্যান্য সাতটি কণাকে গণনার মধ্যে ধরা হয়নি।’ এই গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করা নতুন প্রযুক্তি স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি ভালোভাবে বোঝার জন্য নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।
এতে বলা হয়, বোতলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শিশুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, শিশুদের মস্তিষ্ক ও শরীর বিকাশমান থাকে। বিষাক্ত বস্তুর সংস্পর্শে তাই শিশুরা বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানোপ্লাস্টিক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর কারণ, ক্ষুদ্র কণা শরীরের অঙ্গগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কোষ ও টিস্যুতে আক্রমণ করতে পারে।
২০১৮ সালের একটি গবেষণার প্রথমে ৯টি দেশের ১১টি ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি বিশ্লেষণ করে ৯৩ শতাংশ নমুনায় মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। ছয় বছর আগের সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, প্রতি লিটার পানিতে গড়ে মানুষের চুলের চেয়ে চওড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা ছিল ১০টি। আর ন্যানো কণা ছিল ৩০০টি। সে সময় এই কণা বিশ্লেষণ করা বা আরও বেশি কণা ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার উপায় আবিষ্কার হয়নি। সেই গবেষকদলের একজন সদস্য ছিলেন মেসন। তিনি সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘এমন না যে আমরা জানতাম না ন্যানোপ্লাস্টিক আছে। আমরা কেবল এগুলো বিশ্লেষণ করতে পারিনি।’
নতুন প্রযুক্তি দিয়ে পানিতে লাখ লাখ ন্যানো কণা দেখা সম্ভব হয়েছে। সব মাইক্রো কণাকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের বাইরে জৈব-অজৈব অন্যান্য সাতটি কণাকে গণনার মধ্যে ধরা হয়নি।
এই গবেষণার ফলাফল থেকে প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ন্যানোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচতে কাচের গ্লাস বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে পানি সংরক্ষণ এবং পান করার প্রচলিত ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে অন্যান্য খাবার এবং পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে মানুষ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পারে। সুস্থ শিশু আর সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। চাইলেই প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার এবং পানীয় গ্রহণ করা বাদ দেওয়া সম্ভব। প্লাস্টিকের বদলে প্রাকৃতিক বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে খাবার পানিতে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকের কণা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

প্লাস্টিকের বোতলে পানির বদলে ‘বিষ’ খাচ্ছি আমরা

আপডেট টাইম : ১১:০৩:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
শুধু পথেঘাটে মিনারেল ওয়াটার নয়, ছাত্রাবাস,মেস, হোটেল এমনকি বাসা বাড়িতেও প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠেছে। পানি বিশুদ্ধ হলেও প্লাস্টিকের বোতলের কারণে যে সেটি ক্রমেই বিষে পরিণত হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের অধিকাংশই সচেতন না। এ ছাড়া প্লাস্টিকের বোতলে এই পানি কতটা ‘বিশুদ্ধ’, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণা বলছে, প্লাস্টিকের বোতলে আছে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানোপ্লাস্টিক এতই ছোট, একজন মানুষের চুলের গড় প্রস্থের এক হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম। পানির সঙ্গে এগুলো পরিপাকতন্ত্রের টিস্যু বা ফুসফুসের মাধ্যমে রক্ত ​​প্রবাহে চলে যেতে পারে। প্লাস্টিক থেকে আসা সম্ভাব্য ক্ষতিকারক সিন্থেটিক রাসায়নিক শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে যেতে পারে।
আমেরিকার বিখ্যাত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, স্বাভাবিক আকৃতির এক লিটার পানির প্লাস্টিকের বোতলে সাত ধরনের প্লাস্টিক আছে। গড়ে দুই লাখ চল্লিশ হাজার প্লাস্টিকের কণা আছে এক লিটারে! যার মধ্যে নব্বই শতাংশ ন্যানোপ্লাস্টিক। বাকিগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পলিমারের টুকরা। এর আকৃতি পাঁচ মিলিমিটার থেকে এক ইঞ্চির পঁচিশ হাজার ভাগের এক ভাগ বা এক মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে ন্যানোপ্লাস্টিক এক মিটারের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ।
ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালের জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যায় কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা একটি নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কথা বলেছেন। এই প্রযুক্তি বোতলজাত পানিতে ন্যানো পার্টিকেলের রাসায়নিক গঠন দেখতে পারে। এ ছাড়া ন্যানো কণার সংখ্যা গণনা এবং বিশ্লেষণও করতে পারে। দেখা গেছে, প্রতি লিটারে ৩০০-এর পরিবর্তে অনেক বেশি কণা আছে। নতুন গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া ৯টি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পানি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের ন্যানো কণার প্রকৃত সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজারের মধ্যে। গবেষকেরা পানির ব্র্যান্ডের নাম গোপন রেখেছে।
এই গবেষণাপত্রের সহলেখক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-দোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির সহযোগী অধ্যাপক বেইজহান ইয়ান সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘নতুন প্রযুক্তি দিয়ে পানিতে লাখ লাখ ন্যানো কণা দেখা সম্ভব হয়েছে। সব মাইক্রো কণাকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের বাইরে জৈব-অজৈব অন্যান্য সাতটি কণাকে গণনার মধ্যে ধরা হয়নি।’ এই গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করা নতুন প্রযুক্তি স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি ভালোভাবে বোঝার জন্য নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।
এতে বলা হয়, বোতলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শিশুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, শিশুদের মস্তিষ্ক ও শরীর বিকাশমান থাকে। বিষাক্ত বস্তুর সংস্পর্শে তাই শিশুরা বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানোপ্লাস্টিক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর কারণ, ক্ষুদ্র কণা শরীরের অঙ্গগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কোষ ও টিস্যুতে আক্রমণ করতে পারে।
২০১৮ সালের একটি গবেষণার প্রথমে ৯টি দেশের ১১টি ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি বিশ্লেষণ করে ৯৩ শতাংশ নমুনায় মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। ছয় বছর আগের সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, প্রতি লিটার পানিতে গড়ে মানুষের চুলের চেয়ে চওড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা ছিল ১০টি। আর ন্যানো কণা ছিল ৩০০টি। সে সময় এই কণা বিশ্লেষণ করা বা আরও বেশি কণা ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার উপায় আবিষ্কার হয়নি। সেই গবেষকদলের একজন সদস্য ছিলেন মেসন। তিনি সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘এমন না যে আমরা জানতাম না ন্যানোপ্লাস্টিক আছে। আমরা কেবল এগুলো বিশ্লেষণ করতে পারিনি।’
নতুন প্রযুক্তি দিয়ে পানিতে লাখ লাখ ন্যানো কণা দেখা সম্ভব হয়েছে। সব মাইক্রো কণাকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের বাইরে জৈব-অজৈব অন্যান্য সাতটি কণাকে গণনার মধ্যে ধরা হয়নি।
এই গবেষণার ফলাফল থেকে প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ন্যানোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচতে কাচের গ্লাস বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে পানি সংরক্ষণ এবং পান করার প্রচলিত ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে অন্যান্য খাবার এবং পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে মানুষ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পারে। সুস্থ শিশু আর সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। চাইলেই প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার এবং পানীয় গ্রহণ করা বাদ দেওয়া সম্ভব। প্লাস্টিকের বদলে প্রাকৃতিক বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে খাবার পানিতে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকের কণা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে।