বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সূর্যমুখীর হলুদ সমারোহ। প্রতিটি গাছ যেন সূর্যের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। গাছের শীর্ষে বড় বড় পুষ্প, আর তার কেন্দ্রে ঘন হয়ে থাকা বীজের স্তরে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত। চারদিকে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর পরিবেশ, আর সূর্যের দিকে মুখ তুলে থাকা ফুলগুলো পুরো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক অপূর্ব আলোর আবহ। এই সৌন্দর্য শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, অর্থনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে ভোজ্যতেলের সিংহভাগ এখনও আমদানিনির্ভর, যার জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এই নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরে বিকল্প উৎস অনুসন্ধান চলছে। এরই অংশ হিসেবে খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলার লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখীর চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের উদ্যোগ এরই মধ্যে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
যেখানে আগে ফসল উৎপাদন কঠিন ছিল, সেখানে এখন সূর্যমুখীর চাষ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। কম খরচে চাষাবাদ, তুলনামূলক ভালো ফলন এবং বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। সূর্যমুখীর বীজ থেকে উৎপাদিত তেল দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি এটি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
খুলনা অঞ্চলের নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরের বিস্তীর্ণ লবণাক্ত জমিতে এখন এমন দৃশ্যই নতুন বাস্তবতা। আমন ধান কাটার পর যে জমি কয়েক মাস পতিত থাকত, সেখানে এখন চাষ হচ্ছে বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের ফসল। কৃষক বলছেন, এই পরিবর্তন শুধু জমির নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিরও।
নড়াইল সদর উপজেলার তুলারাম ইউনিয়নের চাঁচড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম এবার দুই একর জমিতে বারি সূর্যমুখী-৩ চাষ করে চমক দেখিয়েছেন। আগে হাইব্রিড জাত থেকে আশানুরূপ ফল না পেলেও সরকারি প্রণোদনায় পাওয়া এই জাতের বীজে তিনি পেয়েছেন দারুণ ফলন। তার ভাষায়, প্রায় প্রতিটি ফুলেই এক কেজির কাছাকাছি বীজ হচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও আমাদের এলাকায় আমন ধান কাটার পর জমিতে আর কিছুই হতো না। শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে লবণ ওঠে। তাই ভাবতাম চাষ করলে শুধু খরচই বাড়বে। এখন মাঠজুড়ে সূর্যমুখী ফুল ফুটে আছে, দুই বছর ধরে মানুষের ধারণাই বদলে গেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে খুলনার ফুলতলা উপজেলার আলকা গ্রামেও। সেখানে কয়েকজন কৃষক মিলে সূর্যমুখী চাষ করে ভালো ফলনের আশায় আছেন। কৃষক রেজাউল করিম বলেন, কম খরচে চাষ করা যায়, সেচও কম লাগে-ফলন ভালো হলে লাভ ধানের চেয়েও বেশি হবে। অন্যদিকে আনিছুর রহমান জানান, এই এলাকায় আগে এমন ফসল দেখেননি, তাই আগ্রহ নিয়ে নিজেই চাষ করছেন।
বাগেরহাটের আটজুড়ী ইউনিয়নেও মিলেছে একই সাফল্য। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমলা বিশ্বাস বলেন, শুরুতে কিছুটা সমস্যা থাকলেও এখন ভালো পরিচর্যার ফলে বড় আকারের ফুল ও বেশি বীজ পাওয়া যাচ্ছে। খুলনার কৃষি কর্মকর্তা আরিফ হোসেনের মতে, লবণাক্ততা ও পানির সংকটে এতদিন জমি পতিত থাকলেও এখন সূর্যমুখীর ভালো ফলন কৃষকের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে।
খুলনা অঞ্চলে আমন ধান কাটার পর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিশাল পরিমাণ জমি পতিত পড়ে থাকে। লবণাক্ততা ও সেচের পানির অভাবে কৃষক এসব জমিতে অন্য ফসল করতে সাহস পেতেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, খরিপ-১ মৌসুমে শুধু এই অঞ্চলে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। তবে গত দুই বছর ধরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে বছরের পর বছর পতিত থাকা জমিতে এখন সূর্যমুখীর আবাদ শুরু হয়েছে।
জানা যায়, দেশে প্রধানত চার ধরনের ভোজ্যতেল ব্যবহৃত হয়- সরিষা, ধানের কুঁড়া (রাইস ব্রান), সয়াবিন ও সূর্যমুখী। এর সবগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার; যার অংশ হিসেবে খুলনা অঞ্চলের পতিত জমিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চাষ করা হচ্ছে সূর্যমুখী।
দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সূর্যমুখী তেল আমদানি হয়েছে ১৪ হাজার ৪০৬ টন। দেশে বছরে উৎপাদন হয় সাধারণত ১০ থেকে ১২ হাজার টন। এই উৎপাদন আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, সূর্যমুখী চাষে খরচ তুলনামূলক কম। এক একর জমিতে চাষে খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা, যেখানে লাভ হতে পারে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ মণ বীজ পাওয়া যায় এবং প্রতি কেজি বীজ থেকে অন্তত ৪০০ গ্রাম তেল উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে এক বিঘায় প্রায় ১৩০ লিটার তেল পাওয়া যায়; যার বাজারমূল্য ৩০ হাজার টাকার বেশি। পাশাপাশি খৈল ও গাছ জ¦ালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সূর্যমুখীর জীবনকাল ৮৫ থেকে ১০৫ দিন হওয়ায় এটি আমন ও অন্যান্য ফসলের মাঝামাঝি সময়ে সহজেই চাষ করা যায়।
পার্টনার প্রকল্পের খুলনা অঞ্চলের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, দেশে ভোজ্যতেলের মাত্র ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকি ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি করা হয়। পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ বাড়ানো গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব। তিনি আরও বলেন, লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী সবচেয়ে উপযোগী ফসল এবং কম খরচ ও কম পরিশ্রমে ভালো লাভ হওয়ায় কৃষকদের এতে আগ্রহী করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত। সাধারণত ৮ ডিএস পার মিটার লবণাক্ততা জমিকে অনুপযোগী করে তোলে; কিন্তু সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। তিনি বলেন, সরকার কৃষকদের এক বিঘা জমির জন্য বীজ, সারসহ বিভিন্ন উপকরণ দিচ্ছে, এতে খরচ কমে যাচ্ছে এবং লাভের সম্ভাবনা বাড়ছে। এরই মধ্যে ১০ হাজারের বেশি কৃষককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সূর্যমুখীর গভীর শিকড় মাটির উর্বরতা বাড়ায়, ফলে পরবর্তী ফসলের উৎপাদনও ভালো হয়।
পার্টনার প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলনা অঞ্চল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। লবণাক্ততা বাড়ায় অনেক জমি পতিত থাকে, আর সূর্যমুখী চাষ সেই জমিকে কাজে লাগানোর একটি কার্যকর উপায়। তিনি বলেন, সূর্যমুখী তেল স্বাস্থ্যসম্মত হলেও আমদানিনির্ভরতার কারণে দাম বেশি। দেশে উৎপাদন বাড়লে এটি মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য হবে।
সব মিলিয়ে, খুলনা অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষ এখন কেবল একটি কৃষি উদ্যোগ নয়; এটি কৃষকের আয় বৃদ্ধি, পতিত জমির ব্যবহার এবং দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের একটি সম্ভাবনাময় পথ হয়ে উঠছে।
Reporter Name 























