ঢাকা ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গ্রামীণ অর্থনীতির ‘গেমচেঞ্জার’ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ গ্রাহকই গ্রামাঞ্চলের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রযুক্তির আশীর্বাদে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হাত ধরে ব্যাংকিং সেবা এখন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের মতো পল্লি অঞ্চলের মানুষও এখন নিমেষেই টাকা জমা, উত্তোলন এবং প্রবাসী আয়ের রেমিট্যান্সের সুবিধা পাচ্ছেন। প্রচলিত ব্যাংক শাখার মতো প্রায় সব ধরনের সেবা পাওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিং ক্রমেই তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকের প্রায় ৮৭ শতাংশই পল্লি অঞ্চলের। এ মাধ্যমে বার্ষিক লেনদেন ছাড়িয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা এখন বিরাট ভূমিকা রাখছে। এক কথায় ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ নামক এই সেবা আজ দেশের প্রান্তিক অর্থনীতিতে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৩০টি ব্যাংকের ১৫ হাজার ৩২১ জন এজেন্ট ২০ হাজার ৪৪৮টি আউটলেটের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খোলা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রাহকই গ্রামীণ এলাকার এবং প্রায় অর্ধেক হিসাব নারীদের নামে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) শেষে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে আমানত স্থিতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৭ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকাই এসেছে গ্রাম ও প্রান্তিক জনপদ থেকে, যা মোট আমানতের প্রায় ৮৩ শতাংশ।

অন্যদিকে উল্লেখিত সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে। এ চিত্র নির্দেশ করে যে, এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনপদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বড় ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের জন্য সহজে আর্থিক সেবা পাওয়া নিশ্চিত করা। আগে ব্যাংকে যেতে সময় ও খরচ—দুটোই বেশি লাগত। এখন ইউনিয়ন পরিষদ, দোকান বা স্থানীয় আউটলেট থেকেই টাকা জমা দেওয়া, উত্তোলন, বিল পরিশোধ— এমনকি ঋণ নেওয়ার সুযোগ মিলছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে ব্যবহার হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকার প্রায় ২ কোটি ১৪ লাখ হিসাবধারী সরাসরি এ সেবার আওতায় এসেছেন। এতে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ দাদন বা উচ্চ সুদে ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন। ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের অবকাঠামো শক্তিশালী করছে, যা ভবিষ্যতে কৃষি ঋণের প্রবাহ আরও বাড়াবে।

এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক ১ হাজার ৪৬২ জন নারী মালিকানাধীন এজেন্টের মাধ্যমে ১ হাজার ৭৩৪টি আউটলেটে সেবা দিচ্ছে। এসব আউটলেট থেকে ১৯ লাখের বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী আউটলেট স্থাপনে ১ অনুপাত ১ বজায় রাখার উদ্যোগ ভবিষ্যতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম বড় চ্যানেল হয়ে উঠেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। গ্রাহকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে টাকা পৌঁছে দেওয়ার কারণে এ মাধ্যম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে বিতরণ করা রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এ অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয় বাজার, কৃষি উৎপাদন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন গতি তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুধু ব্যাংকিং সেবার পরিসরই বাড়াচ্ছে না, বরং কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এজেন্ট ব্যাংকিং ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

গ্রামীণ অর্থনীতির ‘গেমচেঞ্জার’ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ গ্রাহকই গ্রামাঞ্চলের

আপডেট টাইম : ১১:৪৭:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

প্রযুক্তির আশীর্বাদে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হাত ধরে ব্যাংকিং সেবা এখন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের মতো পল্লি অঞ্চলের মানুষও এখন নিমেষেই টাকা জমা, উত্তোলন এবং প্রবাসী আয়ের রেমিট্যান্সের সুবিধা পাচ্ছেন। প্রচলিত ব্যাংক শাখার মতো প্রায় সব ধরনের সেবা পাওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিং ক্রমেই তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকের প্রায় ৮৭ শতাংশই পল্লি অঞ্চলের। এ মাধ্যমে বার্ষিক লেনদেন ছাড়িয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা এখন বিরাট ভূমিকা রাখছে। এক কথায় ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ নামক এই সেবা আজ দেশের প্রান্তিক অর্থনীতিতে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৩০টি ব্যাংকের ১৫ হাজার ৩২১ জন এজেন্ট ২০ হাজার ৪৪৮টি আউটলেটের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খোলা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রাহকই গ্রামীণ এলাকার এবং প্রায় অর্ধেক হিসাব নারীদের নামে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) শেষে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে আমানত স্থিতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৭ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকাই এসেছে গ্রাম ও প্রান্তিক জনপদ থেকে, যা মোট আমানতের প্রায় ৮৩ শতাংশ।

অন্যদিকে উল্লেখিত সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে। এ চিত্র নির্দেশ করে যে, এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনপদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বড় ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের জন্য সহজে আর্থিক সেবা পাওয়া নিশ্চিত করা। আগে ব্যাংকে যেতে সময় ও খরচ—দুটোই বেশি লাগত। এখন ইউনিয়ন পরিষদ, দোকান বা স্থানীয় আউটলেট থেকেই টাকা জমা দেওয়া, উত্তোলন, বিল পরিশোধ— এমনকি ঋণ নেওয়ার সুযোগ মিলছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে ব্যবহার হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকার প্রায় ২ কোটি ১৪ লাখ হিসাবধারী সরাসরি এ সেবার আওতায় এসেছেন। এতে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ দাদন বা উচ্চ সুদে ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন। ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের অবকাঠামো শক্তিশালী করছে, যা ভবিষ্যতে কৃষি ঋণের প্রবাহ আরও বাড়াবে।

এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক ১ হাজার ৪৬২ জন নারী মালিকানাধীন এজেন্টের মাধ্যমে ১ হাজার ৭৩৪টি আউটলেটে সেবা দিচ্ছে। এসব আউটলেট থেকে ১৯ লাখের বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী আউটলেট স্থাপনে ১ অনুপাত ১ বজায় রাখার উদ্যোগ ভবিষ্যতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম বড় চ্যানেল হয়ে উঠেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। গ্রাহকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে টাকা পৌঁছে দেওয়ার কারণে এ মাধ্যম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে বিতরণ করা রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এ অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয় বাজার, কৃষি উৎপাদন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন গতি তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুধু ব্যাংকিং সেবার পরিসরই বাড়াচ্ছে না, বরং কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এজেন্ট ব্যাংকিং ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।