ঢাকা ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উত্তাল বিক্ষোভে কাঁপছে ইরান

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৯ বার

আবারও এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে প্রবেশ করেছে ইরান। বৃহস্পতিবার রাতে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ও রাজপথ দ্বন্দ্বের নতুন মাত্রা। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রার লাগাতার অবমূল্যায়ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ জীবনের ক্রমবর্ধমান অসহনীয়তার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ১২ দিনে ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু রয়েছে। আহত ও গ্রেফতার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

এদিকে, বিক্ষোভকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে ইরানে ‘শক্তিশালী হামলা’ চালানো হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প। বিপরীতে খামেনি বলেছেন, ট্রাম্পকেই ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো হবে।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নারী-জীবন ও স্বাধীনতার আন্দোলন ইরানকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তারপর এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত গণআন্দোলন। যদিও এবারের বিক্ষোভের সূচনা নৈতিক পুলিশ বা সামাজিক স্বাধীনতা নয়, বরং অর্থনীতি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের বৈধতা, শাসনব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েই মৌলিক প্রশ্ন তুলছে।

রাষ্ট্রের পরিচিত অস্ত্র ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট : দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির খবর অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় পুরো দেশেই ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস প্রথম এই তথ্য নিশ্চিত করে। দিনের শুরুতেই পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহে আংশিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্ল্যাকআউটের কারণ জানায়নি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সরকার প্রায় নিয়মিতভাবেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং ২০২২ সালের গণআন্দোলনের সময়ও একই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, ভিডিও ও ছবি বাইরে পাঠানো ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ সীমিত রাখা।

বিবিসি পার্সিয়ান জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় শুধু আন্দোলনের খবর নয়, আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, পরিবারগুলোর যোগাযোগ এবং সাধারণ নাগরিক সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে আহত বিক্ষোভকারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে ব্ল্যাকআউটের কারণে।

মৃত্যু নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি ও বাস্তব চিত্র : দ্য গার্ডিয়ান বলছে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইরানে বরাবরের মতোই বিভ্রান্তিকর তথ্যযুদ্ধ চলছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু। সংস্থাটি বলছে, বুধবার ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। সেই এক দিনেই ১৩ জন নিহত হন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। বিবিসি পার্সিয়ান স্বাধীনভাবে ২২ জনের মৃত্যুর পরিচয় ও তথ্য যাচাই করেছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি বিবৃতিতে নিহতের সংখ্যা অনেক কম দেখানো হচ্ছে। তাদের হিসাবে, নিরাপত্তা বাহিনীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ২১।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি, তেহরানের প্রতিক্রিয়া : শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে, তবে সেখানে হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সবদিক থেকে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ‘খুব কঠোর’ হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর আগে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নতুন ওই মন্তব্য তারই ধারাবাহিকতা।

কনজারভেটিভ রেডিও হোস্ট হাগ হেউইটকে বৃহস্পতিবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি তাদের (ইরান সরকার) জানিয়ে দিয়েছি যদি তারা মানুষকে হত্যা করা শুরু করে, যেটি তারা দাঙ্গার সময় করে থাকে, যদি (এবার) তারা এমনটি করে তা হলে আমরা তাদের ওপর খুব শক্তভাবে আঘাত হানব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব কাছ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারা জানে এবং তাদের খুব শক্তভাবে বলা হয়েছে, এখন আমি আরও শক্তভাবে বলছি। যদি তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যা শুরু করে তা হলে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ইরানের মানুষের জন্য কী বার্তা দেবেন এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার ব্যাপারে অনুভূতি খুবই দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন।’

ট্রাম্পের সবশেষ হুঁশিয়ারির বিপরীতে ইরান তার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রেখেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় হামলার হুমকি দিয়েছে। তেহরান বলেছে, তারা পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা রাখবে না এবং আগে হামলার শিকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। নিরাপত্তা বা ভূখণ্ডে যেকোনো আঘাতকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরান আরও জানিয়েছে, যেকোনো হামলা বা অব্যাহত শত্রুতামূলক আচরণের বিপরীতে তারা চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অত্যাচারী ব্যক্তি’ উল্লেখ করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানে ক্ষমতাসীন ইসলাপন্থি সরকারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে ‘নাশকতাকারী’ বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

শুক্রবার দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলে ভাষণ দিয়েছেন খামেনি। ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস সাক্ষী আছে যে অত্যাচারীরা বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ফারাও, নমরুদ এবং মোহম্মদ রেজা শাহরা (পাহলভি) তাদের আগ্রাসী মনোভাবের জন্য ক্ষমতায় টিকতে পারেনি, ট্রাম্পও পারবেন না। তাকেও ক্ষমতা থেকে নামানো হবে।’

৩১ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন : বিবিসির যাচাইকৃত ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী আন্দোলন এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান, তাবরিজ, আবাদান, দেজফুল প্রায় সব বড় শহরেই বিক্ষোভ হয়েছে।

মাশহাদে হাজারো মানুষ প্রধান সড়কে মিছিল করেছে। তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ চলেছে। বিভিন্ন শহরে ‘ডেথ টু দ্য ডিক্টেটর’, ‘লং লিভ দ্য শাহ’ এবং ‘ডোন : বি অ্যাফ্রেইড, উই আর অল টুগেদার’- এই স্লোগানগুলো শোনা গেছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের নজরদারি ক্যামেরা খুলে ফেলতেও দেখা গেছে, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কুর্দি অঞ্চল, ধর্মঘট ও সংখ্যালঘু প্রশ্ন : পশ্চিম ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। সাতটি কুর্দি রাজনৈতিক দলের আহ্বানে বৃহস্পতিবার সাধারণ ধর্মঘট পালন হয়। ইলাম, কেরমানশাহ ও লোরেস্তান প্রদেশে দোকানপাট বন্ধ ছিল।

কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেনগাউ অভিযোগ করেছে, এসব অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে। তাদের হিসাবে এই তিন প্রদেশেই অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ কুর্দি ও লোর জাতিগোষ্ঠীর। এটি আবারও দেখাচ্ছে, ইরানের প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি।

সোলেইমানির মূর্তি ভাঙা : দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে বিক্ষোভকারীরা কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলেইমানির একটি মূর্তি ভেঙে ফেলেছে। যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, মূর্তিটি মাটিতে পড়তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। সরকারপন্থিদের কাছে সোলেইমানি একজন জাতীয় বীর, প্রায় পৌরাণিক চরিত্র। তার মূর্তি ভাঙা শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও সামরিক শক্তির প্রতীকের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি : দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির খবর থেকে জানা গেছে, এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। গত এক বছরে খাদ্যের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি, ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ইরানি মুদ্রা রিয়াল ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

সরকার সম্প্রতি আমদানিকারকদের জন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিনিময় হার বাতিল করেছে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে গেছে। তেহরানের এক নারী বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে বাঁচার মতো কোনো পরিকল্পনা নেই।’

নেতৃত্বহীন আন্দোলন ও রেজা পাহলভির ভূমিকা : ২০২২ সালের আন্দোলনের মতো এবার কোনো একক প্রতীক নেই। তবে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানালা থেকে স্লোগান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, জনগণের সাড়া দেখে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। ভিডিওতে তার সমর্থনে স্লোগান শোনা গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন পাহলভির প্রকৃত সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন এখনও স্পষ্ট নয়।

সরকারের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপ : প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যে সংযমের আহ্বান জানালেও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সরকার আন্দোলনকারীদের ‘বিদেশি মদদপুষ্ট দাঙ্গাকারী’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারাও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন।

ভাঙনের গভীর সংকেত : বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আন্দোলন হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে শাসন পরিবর্তন ঘটাবে না। কিন্তু এটি ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর ভঙ্গুরতা উন্মোচন করেছে; অর্থনীতি, বৈধতা এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক তিন ক্ষেত্রেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

উত্তাল বিক্ষোভে কাঁপছে ইরান

আপডেট টাইম : ১১:০৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

আবারও এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে প্রবেশ করেছে ইরান। বৃহস্পতিবার রাতে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ও রাজপথ দ্বন্দ্বের নতুন মাত্রা। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রার লাগাতার অবমূল্যায়ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ জীবনের ক্রমবর্ধমান অসহনীয়তার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ১২ দিনে ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু রয়েছে। আহত ও গ্রেফতার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

এদিকে, বিক্ষোভকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে ইরানে ‘শক্তিশালী হামলা’ চালানো হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প। বিপরীতে খামেনি বলেছেন, ট্রাম্পকেই ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো হবে।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নারী-জীবন ও স্বাধীনতার আন্দোলন ইরানকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তারপর এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত গণআন্দোলন। যদিও এবারের বিক্ষোভের সূচনা নৈতিক পুলিশ বা সামাজিক স্বাধীনতা নয়, বরং অর্থনীতি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের বৈধতা, শাসনব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েই মৌলিক প্রশ্ন তুলছে।

রাষ্ট্রের পরিচিত অস্ত্র ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট : দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির খবর অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় পুরো দেশেই ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস প্রথম এই তথ্য নিশ্চিত করে। দিনের শুরুতেই পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহে আংশিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্ল্যাকআউটের কারণ জানায়নি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সরকার প্রায় নিয়মিতভাবেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং ২০২২ সালের গণআন্দোলনের সময়ও একই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, ভিডিও ও ছবি বাইরে পাঠানো ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ সীমিত রাখা।

বিবিসি পার্সিয়ান জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় শুধু আন্দোলনের খবর নয়, আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, পরিবারগুলোর যোগাযোগ এবং সাধারণ নাগরিক সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে আহত বিক্ষোভকারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে ব্ল্যাকআউটের কারণে।

মৃত্যু নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি ও বাস্তব চিত্র : দ্য গার্ডিয়ান বলছে, নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইরানে বরাবরের মতোই বিভ্রান্তিকর তথ্যযুদ্ধ চলছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু। সংস্থাটি বলছে, বুধবার ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। সেই এক দিনেই ১৩ জন নিহত হন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। বিবিসি পার্সিয়ান স্বাধীনভাবে ২২ জনের মৃত্যুর পরিচয় ও তথ্য যাচাই করেছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি বিবৃতিতে নিহতের সংখ্যা অনেক কম দেখানো হচ্ছে। তাদের হিসাবে, নিরাপত্তা বাহিনীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ২১।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি, তেহরানের প্রতিক্রিয়া : শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে, তবে সেখানে হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সবদিক থেকে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ‘খুব কঠোর’ হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর আগে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নতুন ওই মন্তব্য তারই ধারাবাহিকতা।

কনজারভেটিভ রেডিও হোস্ট হাগ হেউইটকে বৃহস্পতিবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি তাদের (ইরান সরকার) জানিয়ে দিয়েছি যদি তারা মানুষকে হত্যা করা শুরু করে, যেটি তারা দাঙ্গার সময় করে থাকে, যদি (এবার) তারা এমনটি করে তা হলে আমরা তাদের ওপর খুব শক্তভাবে আঘাত হানব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব কাছ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারা জানে এবং তাদের খুব শক্তভাবে বলা হয়েছে, এখন আমি আরও শক্তভাবে বলছি। যদি তারা বিক্ষোভকারীদের হত্যা শুরু করে তা হলে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ইরানের মানুষের জন্য কী বার্তা দেবেন এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার ব্যাপারে অনুভূতি খুবই দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন।’

ট্রাম্পের সবশেষ হুঁশিয়ারির বিপরীতে ইরান তার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রেখেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় হামলার হুমকি দিয়েছে। তেহরান বলেছে, তারা পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা রাখবে না এবং আগে হামলার শিকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। নিরাপত্তা বা ভূখণ্ডে যেকোনো আঘাতকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরান আরও জানিয়েছে, যেকোনো হামলা বা অব্যাহত শত্রুতামূলক আচরণের বিপরীতে তারা চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অত্যাচারী ব্যক্তি’ উল্লেখ করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানে ক্ষমতাসীন ইসলাপন্থি সরকারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে ‘নাশকতাকারী’ বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

শুক্রবার দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলে ভাষণ দিয়েছেন খামেনি। ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস সাক্ষী আছে যে অত্যাচারীরা বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ফারাও, নমরুদ এবং মোহম্মদ রেজা শাহরা (পাহলভি) তাদের আগ্রাসী মনোভাবের জন্য ক্ষমতায় টিকতে পারেনি, ট্রাম্পও পারবেন না। তাকেও ক্ষমতা থেকে নামানো হবে।’

৩১ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন : বিবিসির যাচাইকৃত ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী আন্দোলন এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান, তাবরিজ, আবাদান, দেজফুল প্রায় সব বড় শহরেই বিক্ষোভ হয়েছে।

মাশহাদে হাজারো মানুষ প্রধান সড়কে মিছিল করেছে। তেহরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ চলেছে। বিভিন্ন শহরে ‘ডেথ টু দ্য ডিক্টেটর’, ‘লং লিভ দ্য শাহ’ এবং ‘ডোন : বি অ্যাফ্রেইড, উই আর অল টুগেদার’- এই স্লোগানগুলো শোনা গেছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের নজরদারি ক্যামেরা খুলে ফেলতেও দেখা গেছে, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কুর্দি অঞ্চল, ধর্মঘট ও সংখ্যালঘু প্রশ্ন : পশ্চিম ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। সাতটি কুর্দি রাজনৈতিক দলের আহ্বানে বৃহস্পতিবার সাধারণ ধর্মঘট পালন হয়। ইলাম, কেরমানশাহ ও লোরেস্তান প্রদেশে দোকানপাট বন্ধ ছিল।

কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেনগাউ অভিযোগ করেছে, এসব অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে। তাদের হিসাবে এই তিন প্রদেশেই অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ কুর্দি ও লোর জাতিগোষ্ঠীর। এটি আবারও দেখাচ্ছে, ইরানের প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি।

সোলেইমানির মূর্তি ভাঙা : দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে বিক্ষোভকারীরা কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলেইমানির একটি মূর্তি ভেঙে ফেলেছে। যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, মূর্তিটি মাটিতে পড়তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। সরকারপন্থিদের কাছে সোলেইমানি একজন জাতীয় বীর, প্রায় পৌরাণিক চরিত্র। তার মূর্তি ভাঙা শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও সামরিক শক্তির প্রতীকের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি : দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির খবর থেকে জানা গেছে, এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। গত এক বছরে খাদ্যের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি, ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ইরানি মুদ্রা রিয়াল ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

সরকার সম্প্রতি আমদানিকারকদের জন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিনিময় হার বাতিল করেছে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে গেছে। তেহরানের এক নারী বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে বাঁচার মতো কোনো পরিকল্পনা নেই।’

নেতৃত্বহীন আন্দোলন ও রেজা পাহলভির ভূমিকা : ২০২২ সালের আন্দোলনের মতো এবার কোনো একক প্রতীক নেই। তবে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানালা থেকে স্লোগান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, জনগণের সাড়া দেখে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। ভিডিওতে তার সমর্থনে স্লোগান শোনা গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন পাহলভির প্রকৃত সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন এখনও স্পষ্ট নয়।

সরকারের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপ : প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যে সংযমের আহ্বান জানালেও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সরকার আন্দোলনকারীদের ‘বিদেশি মদদপুষ্ট দাঙ্গাকারী’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারাও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন।

ভাঙনের গভীর সংকেত : বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আন্দোলন হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে শাসন পরিবর্তন ঘটাবে না। কিন্তু এটি ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর ভঙ্গুরতা উন্মোচন করেছে; অর্থনীতি, বৈধতা এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক তিন ক্ষেত্রেই।