আজ ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারে নববর্ষের প্রথম দিন। ইনকিলাবের অসংখ্য পাঠক পাঠিকাকে জানাচ্ছি, শুভ নববর্ষ। প্রতি বছর ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন উপলক্ষে দৈনিক ‘ইনকিলাবে’ লিখি। আজকেও লিখতে বসেছি। কিন্তু আজ লিখতে বসে আগের বছরগুলোর লেখার মতো মন শান্ত এবং অচঞ্চল থাকছে না। ২০২৬ সালকে অন্যান্য বছরের চেয়ে ভিন্ন একটি বছর মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই বছরটি হবে অত্যন্ত ঘটনাবহুল। সেসব কথা ভেবে মনের মধ্যে একটা থ্রিল অনুভব করছি। কেনো মনের মধ্যে এই আলোড়ন?
প্রথমেই মনে পড়ছে, আর ১ মাস ১১ দিন আয়ু আছে এই সরকারের। তার পরদিন অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদের ওপর গণভোট। যদিও বলেছি যে, বর্তমান সরকারের আয়ু আছে আর ১ মাস ১১ দিন, তার পরেও আরো কয়েকটা দিন এই সরকার টিকতে পারে। তার কারণ হলো, নির্বাচনের পর নতুন সংসদের সদস্যগণ শপথ গ্রহণ করবেন। এরপর নতুন সংসদে মেজরিটি পার্টি সরকার গঠন করবে। এসব করতে কয়েকটা দিন ব্যয় হবে। বলা যেতে পারে, এটি হবে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় যে সময় লাগবে সেই কটা দিনই ড. ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় থাকবে। যেহেতু ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে পবিত্র রমজান, তাই তার আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর হবে বলে আমার ধারণা।
নির্বাচন নিয়ে নানান জন নানান কথা বলছেন। তফশিল পর্যন্ত ঘোষণা হয়ে গেছে, কারা প্রার্থী হবেন সেটিও বলতে গেলে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অবশ্য যাচাই বাছাই এবং প্রত্যাহার পর্ব রয়েছে। তার পরেই ঘোষিত হবে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকলেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পূর্ণমাত্রায় শুরু হলেও অনেক সংশয়বাদী এখনো প্রশ্ন করছেন, নির্বাচন কি শেষমেশ হবে? আজ নয়, ১০ মাস আগে থেকেই আমি বলে যাচ্ছি এবং আজও বলছি যে, নির্বাচন না হওয়ার মতো কোনো অবস্থা জুলাই বিপ্লবের পর থেকে আমার চোখে পড়েনি। এখনো পড়ছে না। অনেকে এখন নির্বাচন হবে কিনা, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে প্রশ্ন তুলছেন দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে।
এটাও আমার কাছে খুব বড় সমস্যা বলে মনে হয় না। একথা ঠিক যে, একটা দেশে বিপ্লবোত্তর যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে সেই মাত্রার কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। বরং যে খুনি স্বৈরাচারী ও লুটেরা সরকারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণবিপ্লব হয়েছে সেই সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাসহ প্রায় সমস্ত রাঘব বোয়াল এবং তাদের ছানাপোনারা ভারত পালিয়ে গেছেন। গণমাধ্যমের হিসাব মোতাবেক বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া এসব স্বৈরাচারী শাসক এবং তাদের ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীসহ লাখ খানেক মানুষ সীমান্ত পার হয়েছে। দেশের ভেতরে যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে রাঘব বোয়াল গোছের নেতাদের সংখ্যা অনুল্লেখযোগ্য। ১৬ মাস হয়ে গেছে, এখনো স্বৈরাচার এবং তাদের দোসররা অন্ধকার বিবর থেকে মাথা বের করার সাহস পায়নি।
দিল্লী এবং কলকাতার মাটিতে বসে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আওয়ামী লীগের টপ লিডারশিপ বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য একাধিকবার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের পেছনে জনসমর্থন একেবারে শূন্য বলে তারা কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। যেটুকু তারা করেছেন সেটি হলো, ঢাকায় এবং মফস্বলের দু’ চারটি জায়গায় কয়েকটি বাস পোড়ানো এবং কিছু ককটেল ফাটানো। তাদের এই বাস পোড়ানোতে এক বা দুই ব্যক্তি অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
শহীদ হাদিকে ওরা হত্যা করতে পেরেছে। ওদের টার্গেটে আরো বেশ কয়েকজন আছেন। কিন্তু সরকার এবং জনগণের সতর্ক নজরদারি এড়িয়ে ওরা এমন বড় কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না, যার ফলে নির্বাচন ভন্ডুল হতে পারে। ওদের আল্টিমেট টার্গেট হলো, ইলেকশন বানচাল করা। কিন্তু সেই কাজটি হবে বলে আমার মনে হয় না।
এখানে ওখানে কিছু দ্বন্দ্ব ফ্যাসাদ বা মারামারি হতে পারে। ইলেকশনে এ ধরনের অশান্তি ঘটেই থাকে। এই লেখাটি যে দিন লিখছি সেদিন পর্যন্ত একমাত্র শহীদ হাদির হত্যাকা- ছাড়া আর বড় কিছু ঘটেনি।
এবারের নির্বাচনে জনগণ বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ করবেন বলে মনে হয়। কারণ, শেখ হাসিনার আমলে ৩টি নির্বাচনের নামে বিরাট তামাশায় তারা ভোট দিতে পারেনি। এবার তাদের সামনে একটি বিরাট সুযোগ এসেছে, যখন অন্তত সরকার এবং সরকারের প্রশাসন যন্ত্রের তরফ থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা যাচ্ছে না। শেখ হাসিনার ৩ ইলেকশনে যে ভোট ডাকাতি হয়েছে সেগুলোর কোনো আশঙ্কা এবার দেখা যাচ্ছে না।
এবারের নির্বাচনে একটি মজার ব্যাপাার রয়েছে। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ প্রভৃতি নির্বাচনে প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দলের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলো আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সিপিবি বা ভারতপ্রেমীরা ছাড়া আর সকলেই ছিলেন একাট্টা। এর পরের ৩ নির্বাচন নিয়ে আর কোনো কথা বললাম না। কারণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকেও ওগুলোকে ভোট ডাকাতি এবং তামাশা ছাড়া আর কিছ্ ুবিলা হয়নি।
কিন্তু এবার, শেখ হাসিনাকে বিতাড়নের পর রাজনীতিতে যে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি হয়েছে সেটি অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণ, অতীতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অন্য সকলে একট্টা থাকলেও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত লড়াইয়ের অগ্রভাগে থাকতো দুটি রাজনৈতিক দল। এ দুটি রাজনৈতিক দল হলো বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। দুটি রাজনৈতিক দলের ওপরেই শেখ হাসিনা তার শাসনামলে বর্বরোচিত জুলুম চালিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার প্রধান রাজনৈতিক দল হয়েছে বিএনপি এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ১ বছর আগেও তাদের মধ্যে ছিলো গভীর সখ্য। এখন প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় একদল অপর দলের বিরুদ্ধে যেসব বাক্যবাণ নিক্ষেপ করছে সেগুলো জনগণ কীভাবে গ্রহণ করছে সেটি বোঝা যাবে ভোটের ফলাফলে।
জনগণের মধ্যে একটি বিরাট কৌতূহল, এবারের নির্বাচনে কোন দল বা কোন জোট জিতবে? ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য নির্বাচনী ফলাফলের ওপরে কয়েকটি জরিপও হয়েছে। সবগুলো জরিপেই বিএনপিকে ১ নম্বরে এবং জামায়াতে ইসলামীকে ২ নম্বরে রাখা হয়েছে। এনসিপি একটি নবগঠিত দল। রাজনৈতিক দল হিসাবে বিগত ১ বছরে তারা তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তারপরেও কি সরকার বা কি গণমাধ্যম, উভয়েই তরুণদের দল এনসিপিকে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে চিত্রিত করছে।
কে জিতবে বা কে জিতবে না, সেসম্পর্কে এবার সঠিকভাবে আগাম প্রেডিকশন করা বেশ মুশকিল। কারণ, ভোটারদের মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি সংখ্যক ভোটার হল ১৮ বছর থেকে ৪০ বছরের মধ্যবর্তী এজ গ্রুপের। এদের প্রেফারেন্স লিস্টে কোন রাজনৈতিক দল রয়েছে সেটি সম্পর্কে সঠিকভাবে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া যাবে না। তবে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
কথা হলো, নতুন সরকার কোন পথে হাঁটবে? অভ্যন্তরে তাদের সামনে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এবং পোশাক রফতানি বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা আয় অনেক বাড়লেও অর্থনীতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ধ্বংস প্রাপ্ত অর্থনীতিকে ধ্বংসের স্তূপ থেকে টেনে তুলতে পারেনি। ড. ইউনূস নিজে একজন অর্থনীতিবিদ। ধারণা করা হয়েছিলো যে, তার নেতৃত্বে দেড় বছরে অর্থনীতি অগ্রগতির মহাসড়কে উঠবে। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। নতুন সরকারকে সর্বাগ্রে এই কাজে মনোনিবেশ করতে হবে।
নতুন সরকারকে সমান গুরুত্বের সাথে মোকাবেলা করতে হবে যে সমস্যা, সেটি হলো, দেশের পররাষ্ট্রনীতি। পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আবার ১ নম্বর প্রায়োরিটি পাবে ভারত। কারণ, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্যে পরিণত করেছিলেন। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো ভারতের গোলামীর শৃঙ্খল ছিন্ন করা। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ইন্টারিম সরকার এই কাজটি মোটামুটি নির্ভিকভাবেই সম্পন্ন করেছে। ড. ইউনূসের হাজারো ব্যর্থতার কথা বলা যায়। কিন্তু একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে যে, তার সরকার ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে।
ড. ইউনূস আর ৪০ দিন পর ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। কিন্তু চীন ও পাকিস্তান থেকে যুদ্ধাস্ত্র ক্রয় এবং উভয় দেশের সাথে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক স্থাপনের যে শুরুটা তিনি করে যাচ্ছেন, সেটি কি কন্টিনিউ করবে? চীনকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কি দেওয়া হবে? পাকিস্তানকে হাসিনা একটি নিষিদ্ধ রাষ্ট্র করেছিলেন। ড. ইউনূস সেটিকে উন্মুক্ত করেছেন। সেই উন্মুক্ত নীতি কি অব্যাহত থাকবে? জেনারেল ফজলুর রহমানের বিডিআর ম্যাসাকারের রিপোর্টের ভিত্তিতে কি বিচার শুরু হবে? শাপলা ম্যাসাকারের কি বিচার হবে? এসব জ¦লন্ত প্রশ্ন ২০২৬ সাল জুড়েই ভবিষ্যত সরকার এবং জনগণকে হন্ট (তাড়িত) করবে।
Email:journalist15@gmail.com
Reporter Name 

























