বাংলদেশের ভিতরে অঞ্চল কেন্দ্রিক সংকট ও যুদ্ধ অনেকাংশে কমতে শুরু করে। আগের দিন ঢাকাকে দখলে নিতে উত্তরদিক থেকে পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকামুখী রওনা দেন পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যরা। এদিকে ঢাকাতেও তখন বিভিন্ন গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ব্যাপক সর্তকতার সঙ্গে নজর রাখতে থাকেন। তবে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে তখন ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়।
এদিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে শিগিগরিই যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। তিনি ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধ বাধলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে জড়িয়ে পড়বে না। এদিকে যৌথবাহিনী ঢাকার পতন দ্রুততর করার প্রয়োজনে যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে। কেননা ঢাকার পতন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পরাজয় চূড়ান্ত হবে। তাই সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উপকূলে পৌঁছানোর আগেই পতন চূড়ান্ত করতে চাইছিল যৌথবাহিনী। তবে এত দ্রুত যে ঢাকা আক্রমণ করা সম্ভব হবে এটা ধারণাতেও ছিল না ভারতীয় সেনাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াইয়ের কারণেই দ্রুত মিত্রবাহিনী ঢাকার দিকে এগুতে পারে।
রামপাল (বাগরহাট) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদারমুক্ত হয়েছিল বাগেরহাটের রামপাল। এদিন সকাল সাড়ে ৭টায় ৫৫ থেকে ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা রামপাল মুক্ত করে লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করেন।
মুক্তিযুদ্ধর অন্যতম সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার মরহুম শেখ আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে বৃহত্তর (রামপাল ও মোংলা) এলাকা হানাদারমুক্ত করা হয়। রামপালমুক্ত দিবসটি ছিল স্বজন, সহযোদ্ধাদের হারানো দীর্ঘশ্বাস ও বিজয় উল্লাসের দিন।
ডিসেম্বরের ৯ তারিখ প্রয়াত শেখ আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে বাগেরহাটের মোংলাতে আরো অপারেশনের একটি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। ওই সময় ৫৫ থেকে ৬০ জনের একটি দল মোংলার আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। পাকহানাদার বাহিনীর সদস্যরা একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তিন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ওই সময় গুরুতর আহত হন চিতলমারী থানার নিজামসহ ৩৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। ওই তারিখ মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করলে পাকহানাদার বাহিনীর সদস্যরা পিছু হটে। ১২ তারিখ রাতে রামপাল থানাকে শত্রু মুক্ত ঘোষণা করতে মুক্তিযোদ্ধারা থানার অপরপার পেড়িখালী বাজারে অবস্থান নেন। ১৩ তারিখ সকালে রামপাল থানায় হাজির হলে তৎকালীন ওসি আমিনুর রহমান তাদের অভ্যর্থনা জানান। ১৩ তারিখ মুক্তিযোদ্ধারা সকাল ৭টায় রামপাল থানায় লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে জয় বাংলা শ্লোগান দেন। এসময় শেখ আব্দুল জলিল, সম্মুখ সমর যোদ্ধা বড়দিয়ার টি. আহম্মদ, বাহালুলসহ সকলে উপস্থিত ছিলেন। বিজয় পতাকা উড়ানোর পর হানাদার বাহিনীর ৪৫ জন দালাল ও তার দোসরদের থানায় ধরে নিয়ে আসা হয়। তাদের থানায় কয়েকদিন আটক রেখে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ক্ষতি প্রদানের শপথ পড়িয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয় মুক্তিযুদ্ধকালীন ডেপুটি কমান্ডার অতিদ্রনাথ হালদার দুলালের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ একটি চেতনা। একটি কনসেপ্ট। এটা এখনও চলমান। আমরা আমাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। সেটি শিক্ষা, মৌলিক অধিকার পূরণ ও বাঙালীর সংস্কৃতি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানানা, সোনারগাঁও মুক্ত হয় ১৯৭১ সালের এই দিনে। ৫৪ বছর আগে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে সোনারগাঁওয়ের তিনশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা পাক হানাদরদের কাছ থেকে মুক্ত করেছিল সোনারগাঁওকে। এদিন শ্রদ্ধাভরে সোনারগাঁওবাসী স্মরণ করে তৎকালীন সময়ের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক মরহুম অ্যাডভোকেট সাজেদ আলী মিয়া ও সাবেক এমপি মরহুম মোবারক হোসেনকে।
রাজধানী ঢাকা থেকে কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট ও চট্টগ্রাম বন্দরগামী ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়েটি মুক্ত করার জন্য ১৯৭১ এর নভেম্বর মাসে লাঙ্গলবন্ধ সেতুর ওপর অবস্থানরত পাক হানাদরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সোনারগাঁওয়ের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা। পরবর্তী পর্যায়ে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেয় পানামগামী রাস্তার দু’পাশে। সারাদিন ব্যাপী ওই যুদ্ধে শহীদ হয় মজনু মিয়া।
তার সম্মানে সোনারগাঁওয়ে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে (শহীদ মজনু সড়ক)। ১২ ডিসেম্বর রাতেই মিত্রবাহিনী অবস্থান নেয় সোনারগাঁওয়ে। মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে টিকতে না পেরে পাক হানাদাররা তাদের মৃত দোসরদের রেখে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ১৩ ডিসেম্বরকে সোনারগাঁ মুক্ত দিবস ঘোষণা করেন। যাবার পূর্বে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পিরোজপুর গ্রাম। নৃশংসভাবে হত্যা করে ওই গ্রামের নূরু মিয়া, আ. রহমান, ফজলুল হক, আবু মিয়া ও আয়েত আলীকে। সেদিনকার মুক্ত দিবসে অংশগ্রহণ করেছিল মরহুম মোবারক হোসেন, কামন্ডার নূরু মিয়া বাচ্চু, ফুলু মিয়া, রুহুল আমীন বাদশাহ, জিয়াউল ফারুক, শফিউর রহমান, শফিকুল ইসলাম, ওসমানগনি, মনিরুজ্জামান, আনোয়ার হোসেন, খন্দকার নজরুল ইসলাম, গোফরান, আ. হাই, মো. হোসেন, আজিজুর রাহমান, বাবুল হোসেন, মোহাম্মদ আলীসহ আরো অনেকে।
Reporter Name 





















