ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

সুগন্ধি ধানে পোকার আক্রমণে দিশেহারা কৃষক, উৎপাদন খরচ নিয়ে শঙ্কা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০০:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ৩০ বার

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় সুগন্ধি জাতের ধানে বিভিন্ন পোকার আক্রমণ ও অসময়ে ঝড়বৃষ্টিতে ধানগাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চিরিরবন্দর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে সুগন্ধি জাতের বিভিন্ন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় ব্রি ধান-৩৪ জাতের চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে। অন্য জাতগুলোর মধ্যে ফিলিপাইন কাটরি ৮৫ হেক্টর, জিরা কাটরি ১০ হেক্টর ও কাটারিভোগ ১০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় দুই টন নির্ধারণ করা হয়েছিল।

চিরিরবন্দর উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার ৬ বিঘা জমিতে ব্রি-৩৪ জাতের ধান লাগিয়েছি। কিছুদিন আগে অসময়ের ঝড়বৃষ্টিতে প্রায় তিন বিঘা জমির ধান মাটিতে পড়ে গেছে। ধানে ব্লাস্ট রোগসহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণে আমরা দিশেহারা। বিভিন্ন কোম্পানির কীটনাশক স্প্রে করেও ফল পাচ্ছি না, ধানের শিষ শুকিয়ে যাচ্ছে।’

আব্দুর রাজ্জাক আরও জানান, প্রাথমিকভাবে বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মণ ফলনের আশা থাকলেও ঝড়বৃষ্টি ও পোকার আক্রমণে এখন ১২ থেকে ১৪ মণ ফলন হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, ‘এ রকম ফলন হলে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, সেই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে।’

শ্যামনগর গ্রামের কৃষক আনছার আলী জানান, তিনি লাভের আশায় চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে সুগন্ধি ধানের চাষ করেছেন। কিন্তু ঝড়বৃষ্টিতে ধানগাছ হেলে পড়ায় কারেন্ট পোকা ও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ বেড়েছে, যাতে শতকরা ২৫ থেকে ৩০টি ধানের শিষ শুকিয়ে গেছে।

তিনি খরচ উল্লেখ করে বলেন, ‘এক বিঘা জমি ২০ হাজার টাকায় বর্গা নিয়েছি। সার, কীটনাশক, চাষ ও পানি সেচ বাবদ আরও প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে এবার এক বিঘা জমিতে ধান আবাদের উৎপাদন খরচ তোলাও সম্ভব হবে না।’

পুনট্টি গ্রামের কৃষক খোকন সরকার বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় সুগন্ধি ধানের আবাদে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সারের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজার থেকে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হয়। কীটনাশকের দামও বেশি। চার-পাঁচবার স্প্রে করেও ধানে ব্লাস্ট রোগ ঠেকানো যায়নি।

তিনি বাজার পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন সুগন্ধি ধান প্রতি মণ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় নামিয়ে আনবেন। তাহলে কৃষক কীভাবে লাভবান হবে?’

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা আজকের প্রত্রিকাকে বলেন, ‘উপজেলাজুড়ে সুগন্ধি ধানের বেশ কদর রয়েছে। জেলার সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি ধানের আবাদ চিরিরবন্দর উপজেলায়। সুগন্ধি ধান দিনাজপুরের একটি ঐতিহ্য। ইতিমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে কাটারিভোগ এখন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। সুগন্ধি ধানের আবাদ বাড়াতে কৃষি বিভাগ সব সময় কৃষকদের পাশে থেকে বিভিন্ন পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে।’

দিনাজপুর, চিরিরবন্দর, সুগন্ধি জাতের ধান, বিভিন্ন পোকার আক্রমণ,

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিজয় দিবস : জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার নতুন শপথ

সুগন্ধি ধানে পোকার আক্রমণে দিশেহারা কৃষক, উৎপাদন খরচ নিয়ে শঙ্কা

আপডেট টাইম : ১১:০০:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় সুগন্ধি জাতের ধানে বিভিন্ন পোকার আক্রমণ ও অসময়ে ঝড়বৃষ্টিতে ধানগাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চিরিরবন্দর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে সুগন্ধি জাতের বিভিন্ন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় ব্রি ধান-৩৪ জাতের চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে। অন্য জাতগুলোর মধ্যে ফিলিপাইন কাটরি ৮৫ হেক্টর, জিরা কাটরি ১০ হেক্টর ও কাটারিভোগ ১০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় দুই টন নির্ধারণ করা হয়েছিল।

চিরিরবন্দর উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার ৬ বিঘা জমিতে ব্রি-৩৪ জাতের ধান লাগিয়েছি। কিছুদিন আগে অসময়ের ঝড়বৃষ্টিতে প্রায় তিন বিঘা জমির ধান মাটিতে পড়ে গেছে। ধানে ব্লাস্ট রোগসহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণে আমরা দিশেহারা। বিভিন্ন কোম্পানির কীটনাশক স্প্রে করেও ফল পাচ্ছি না, ধানের শিষ শুকিয়ে যাচ্ছে।’

আব্দুর রাজ্জাক আরও জানান, প্রাথমিকভাবে বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মণ ফলনের আশা থাকলেও ঝড়বৃষ্টি ও পোকার আক্রমণে এখন ১২ থেকে ১৪ মণ ফলন হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, ‘এ রকম ফলন হলে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, সেই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে।’

শ্যামনগর গ্রামের কৃষক আনছার আলী জানান, তিনি লাভের আশায় চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে সুগন্ধি ধানের চাষ করেছেন। কিন্তু ঝড়বৃষ্টিতে ধানগাছ হেলে পড়ায় কারেন্ট পোকা ও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ বেড়েছে, যাতে শতকরা ২৫ থেকে ৩০টি ধানের শিষ শুকিয়ে গেছে।

তিনি খরচ উল্লেখ করে বলেন, ‘এক বিঘা জমি ২০ হাজার টাকায় বর্গা নিয়েছি। সার, কীটনাশক, চাষ ও পানি সেচ বাবদ আরও প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে এবার এক বিঘা জমিতে ধান আবাদের উৎপাদন খরচ তোলাও সম্ভব হবে না।’

পুনট্টি গ্রামের কৃষক খোকন সরকার বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় সুগন্ধি ধানের আবাদে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সারের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজার থেকে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হয়। কীটনাশকের দামও বেশি। চার-পাঁচবার স্প্রে করেও ধানে ব্লাস্ট রোগ ঠেকানো যায়নি।

তিনি বাজার পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন সুগন্ধি ধান প্রতি মণ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় নামিয়ে আনবেন। তাহলে কৃষক কীভাবে লাভবান হবে?’

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা আজকের প্রত্রিকাকে বলেন, ‘উপজেলাজুড়ে সুগন্ধি ধানের বেশ কদর রয়েছে। জেলার সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি ধানের আবাদ চিরিরবন্দর উপজেলায়। সুগন্ধি ধান দিনাজপুরের একটি ঐতিহ্য। ইতিমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে কাটারিভোগ এখন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। সুগন্ধি ধানের আবাদ বাড়াতে কৃষি বিভাগ সব সময় কৃষকদের পাশে থেকে বিভিন্ন পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে।’

দিনাজপুর, চিরিরবন্দর, সুগন্ধি জাতের ধান, বিভিন্ন পোকার আক্রমণ,