ঢাকা ১০:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬, ৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক ছাড়ছেন ধনীরা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:০৭:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
  • ৫০ বার

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের সরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এমন তথ্যই দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৫০ কোটি টাকার তদূর্ধ্ব ব্যক্তি আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা ৭২টি থেকে নেমে এসেছে মাত্র ২৬টিতে। আর ২৫ কোটি টাকার তদূর্ধ্ব থেকে ৫০ কোটি টাকার আমানতকারীর হিসাব ১৫১টি থেকে নেমে এসেছে ৭৮টিতে। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অতি ধনীদের অনেকেই ব্যাংক হিসাব গুটিয়ে ফেলছেন। বিষয়টি ব্যাংকপাড়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অতি ধনীদের হিসাব কমলেও গত এক বছরে সার্বিকভাবে ব্যক্তি কোটিপতি আমানতকারীর বেড়েছে প্রায় আড়াই হাজার। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীও বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার।

মূলত বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মের তথ্য ফাঁস, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বড় অঙ্কের ব্যক্তি আমানতকারীদের (অতি ধনীদের ব্যাংক হিসাব) আচরণে এমন পরিবর্তন বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, অতি ধনীদের ব্যাংক থেকে সরে যাওয়া বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। কারণ, বড় অঙ্কের আমানতই ব্যাংকের শক্তিশালী তারল্যভিত্তি তৈরি করে।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেÑ নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ধনী গোষ্ঠীর অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাঁদের কেউ কেউ জবাবদিহি, তদন্ত বা খাত-সংক্রান্ত কঠোরতা মোকাবিলা না করতে গুটিয়ে ফেলছেন ব্যাংক হিসাব। এর পরিবর্তে তাঁরা দেশ-বিদেশে রিয়েল এস্টেট এবং স্বর্ণসহ বিকল্প উৎসে টাকা খাটাচ্ছেন। আবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেকের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি‘ (অপেক্ষা করা এবং পরিস্থিতি দেখা) মনোভাব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউ অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেনÑ এমন প্রবণতা থেকে ধারণা করা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বড় আমানতকারীরা বেশি সতর্ক হয়ে পড়েন। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকে যাঁরা টাকা রেখেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা বেশি হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকের ভিত্তি বিবেচনায় বড় অঙ্কের আমানত

একটি মাত্র হিসাবে রাখাটাও অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্ককে ছোট ছোট হিসাবে ভাগসহ অন্য খাতে স্থানান্তরের প্রবণতাও ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বড় অঙ্কের সম্পদধারীরা বরাবরই রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশের বিষয়ে অধিক সংবেদনশীল। তাই পরিবেশ পরিবর্তনের পর তাঁদের মধ্যে নিরাপদ গন্তব্যে অর্থ স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়ে যায়। ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের আমানত হিসাব কমার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।

দেশের অর্থনীতির আকার ক্রমেই বড় হচ্ছে। প্রতি বছরই বাড়ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়। এতে মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতাও বেড়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুণগত মান বৃদ্ধি না পাওয়ায় সমাজের একটি শ্রেণির কাছেই বেশি অর্থ-সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। এ শ্রেণির বেশির ভাগেরই নাম রয়েছে কোটিপতির তালিকায়। তবে দেশে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। অবশ্য আমানতকারীর ব্যাংক হিসাব থেকে এ বিষয়ে একটি ধারণা করা যায়। যদিও বাস্তবে কোটিপতির সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে জানা গেছে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কেবল যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কোটি টাকার বেশি জমা আছে, সেই সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরেও অনেকেই আছেন, যাঁদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।

গত সপ্তাহে ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে প্রথমবার ব্যক্তি আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাব এবং তাঁদের জমানো অর্থের পরিমাণ তুলে ধরা হয়। এর বাইরে, এতদিন তিন মাস পর পর শিডিউল ব্যাংক স্টাটিস্টিকস শিরোনামে একটি প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের হিসাব ও আমানতের পরিমাণ একত্রে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এ দ্ইু প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত জুন পর্যন্ত দেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছেÑ এমন হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮৪টি। ফলে গত এক বছরে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৫৫২টি। এর মধ্যে ব্যক্তি কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৫৫৫টি। গত জুন শেষে ব্যক্তি আমানতকারী ব্যাংক হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬টি। আর প্রতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৩০০টি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানতধারীর হিসাব ছিল ৭২টি। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানত ছিল ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মতো। এক বছরের ব্যবধানে হিসাব সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৬টিতে এবং আমানত পরিমাণও কমে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুনে ২৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে আমানতধারীর হিসাব ছিল ১৫১টি। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানত ছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই হিসাব সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭৮টিতে এবং আমানতের পরিমাণও কমে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বড় আমানতকারীদের একাংশ ব্যাংকিং খাত থেকে তাঁদের অর্থ তুলে নিচ্ছেন।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হিসাবে বড় উল্লম্ফন

ব্যক্তি খাতে বড় অঙ্কের আমানত হিসাব কমলেও অতি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি আকারের আমানত হিসাব বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছেÑ শূন্য থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত, ২ লাখ ১ টাকা থেকে ২৫ লাখ এবং ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত আমানতধারীর হিসাব এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের জুনে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর হিসাব ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাভ ৪৮ হাজার ৬৮টি; আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে তাঁদের ব্যাংক হিসাব বেড়ে হয়েছে ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫৬টি; আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

গত জুন শেষে ২ লাখ ১ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকার আমানত হিসাব বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫২টি, যা গত বছরের জুনে ছিল ৮৮ লাখ ৭৭ হাজার ৭৩৪টি। এসব হিসাবে গত জুনে আমানত বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ৫ লাখ ২২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

গত বছরের জুনে ২৫ লাখ ১ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক হিসাব ছিল ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮৭৪টি, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ৪৫৫টি। আর আমানত বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

গত জুন শেষে ৫০ লাখ ১ কোটি থেকে ১ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৯টি, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৪৬টি। এসব হিসাবে গত জুন শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

গত বছরের জুন শেষে ১ কোটি ১ টাকা থেকে ২৫ কোটি টাকার আমানত হিসাব ছিল ৩৪ হাজার ২৫৮টি, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৩২টি। এসব হিসাবে গত জুন শেষে আমানত দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ৮০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এটি ইঙ্গিত করে যে, দেশে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয় শ্রেণির উত্থান ঘটছে এবং তাদের ব্যাংকিং খাতে অংশগ্রহণ বাড়ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যাংক ছাড়ছেন ধনীরা

আপডেট টাইম : ১০:০৭:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের সরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এমন তথ্যই দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৫০ কোটি টাকার তদূর্ধ্ব ব্যক্তি আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা ৭২টি থেকে নেমে এসেছে মাত্র ২৬টিতে। আর ২৫ কোটি টাকার তদূর্ধ্ব থেকে ৫০ কোটি টাকার আমানতকারীর হিসাব ১৫১টি থেকে নেমে এসেছে ৭৮টিতে। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অতি ধনীদের অনেকেই ব্যাংক হিসাব গুটিয়ে ফেলছেন। বিষয়টি ব্যাংকপাড়ায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অতি ধনীদের হিসাব কমলেও গত এক বছরে সার্বিকভাবে ব্যক্তি কোটিপতি আমানতকারীর বেড়েছে প্রায় আড়াই হাজার। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীও বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার।

মূলত বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মের তথ্য ফাঁস, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বড় অঙ্কের ব্যক্তি আমানতকারীদের (অতি ধনীদের ব্যাংক হিসাব) আচরণে এমন পরিবর্তন বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, অতি ধনীদের ব্যাংক থেকে সরে যাওয়া বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। কারণ, বড় অঙ্কের আমানতই ব্যাংকের শক্তিশালী তারল্যভিত্তি তৈরি করে।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেÑ নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ধনী গোষ্ঠীর অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাঁদের কেউ কেউ জবাবদিহি, তদন্ত বা খাত-সংক্রান্ত কঠোরতা মোকাবিলা না করতে গুটিয়ে ফেলছেন ব্যাংক হিসাব। এর পরিবর্তে তাঁরা দেশ-বিদেশে রিয়েল এস্টেট এবং স্বর্ণসহ বিকল্প উৎসে টাকা খাটাচ্ছেন। আবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেকের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি‘ (অপেক্ষা করা এবং পরিস্থিতি দেখা) মনোভাব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউ অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেনÑ এমন প্রবণতা থেকে ধারণা করা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বড় আমানতকারীরা বেশি সতর্ক হয়ে পড়েন। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকে যাঁরা টাকা রেখেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা বেশি হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকের ভিত্তি বিবেচনায় বড় অঙ্কের আমানত

একটি মাত্র হিসাবে রাখাটাও অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্ককে ছোট ছোট হিসাবে ভাগসহ অন্য খাতে স্থানান্তরের প্রবণতাও ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বড় অঙ্কের সম্পদধারীরা বরাবরই রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশের বিষয়ে অধিক সংবেদনশীল। তাই পরিবেশ পরিবর্তনের পর তাঁদের মধ্যে নিরাপদ গন্তব্যে অর্থ স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়ে যায়। ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের আমানত হিসাব কমার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।

দেশের অর্থনীতির আকার ক্রমেই বড় হচ্ছে। প্রতি বছরই বাড়ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়। এতে মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতাও বেড়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুণগত মান বৃদ্ধি না পাওয়ায় সমাজের একটি শ্রেণির কাছেই বেশি অর্থ-সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। এ শ্রেণির বেশির ভাগেরই নাম রয়েছে কোটিপতির তালিকায়। তবে দেশে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। অবশ্য আমানতকারীর ব্যাংক হিসাব থেকে এ বিষয়ে একটি ধারণা করা যায়। যদিও বাস্তবে কোটিপতির সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে জানা গেছে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কেবল যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কোটি টাকার বেশি জমা আছে, সেই সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরেও অনেকেই আছেন, যাঁদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।

গত সপ্তাহে ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে প্রথমবার ব্যক্তি আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাব এবং তাঁদের জমানো অর্থের পরিমাণ তুলে ধরা হয়। এর বাইরে, এতদিন তিন মাস পর পর শিডিউল ব্যাংক স্টাটিস্টিকস শিরোনামে একটি প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের হিসাব ও আমানতের পরিমাণ একত্রে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এ দ্ইু প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত জুন পর্যন্ত দেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছেÑ এমন হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮৪টি। ফলে গত এক বছরে কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৫৫২টি। এর মধ্যে ব্যক্তি কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৫৫৫টি। গত জুন শেষে ব্যক্তি আমানতকারী ব্যাংক হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬টি। আর প্রতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীর হিসাব দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৩০০টি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানতধারীর হিসাব ছিল ৭২টি। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানত ছিল ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মতো। এক বছরের ব্যবধানে হিসাব সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৬টিতে এবং আমানত পরিমাণও কমে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুনে ২৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে আমানতধারীর হিসাব ছিল ১৫১টি। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানত ছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই হিসাব সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭৮টিতে এবং আমানতের পরিমাণও কমে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বড় আমানতকারীদের একাংশ ব্যাংকিং খাত থেকে তাঁদের অর্থ তুলে নিচ্ছেন।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হিসাবে বড় উল্লম্ফন

ব্যক্তি খাতে বড় অঙ্কের আমানত হিসাব কমলেও অতি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি আকারের আমানত হিসাব বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছেÑ শূন্য থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত, ২ লাখ ১ টাকা থেকে ২৫ লাখ এবং ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত আমানতধারীর হিসাব এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের জুনে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর হিসাব ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাভ ৪৮ হাজার ৬৮টি; আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে তাঁদের ব্যাংক হিসাব বেড়ে হয়েছে ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫৬টি; আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

গত জুন শেষে ২ লাখ ১ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকার আমানত হিসাব বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫২টি, যা গত বছরের জুনে ছিল ৮৮ লাখ ৭৭ হাজার ৭৩৪টি। এসব হিসাবে গত জুনে আমানত বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ৫ লাখ ২২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

গত বছরের জুনে ২৫ লাখ ১ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক হিসাব ছিল ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮৭৪টি, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ৪৫৫টি। আর আমানত বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

গত জুন শেষে ৫০ লাখ ১ কোটি থেকে ১ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৯টি, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৪৬টি। এসব হিসাবে গত জুন শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

গত বছরের জুন শেষে ১ কোটি ১ টাকা থেকে ২৫ কোটি টাকার আমানত হিসাব ছিল ৩৪ হাজার ২৫৮টি, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৩২টি। এসব হিসাবে গত জুন শেষে আমানত দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ৮০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এটি ইঙ্গিত করে যে, দেশে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয় শ্রেণির উত্থান ঘটছে এবং তাদের ব্যাংকিং খাতে অংশগ্রহণ বাড়ছে।