ষড়ঋতু হিসেবে শীতকাল আসতে আরও এক মাস বাকি। তবুও পুরো শীতের আমেজ বিরাজ করছে যশোরে। এরই মধ্যে যশোরের গাছিরা পুরোদমে নেমে পড়েছেন খেজুরের রস আহরণে। আর রস থেকে তৈরি হবে জেলার বিখ্যাত গুড় ও পাটালি, যার কদর রয়েছে দেশ পেরিয়ে বিদেশেও। সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি মৌসুমে ১০০ কোটি টাকার রস-গুড় বেচাকেনা হবে বলে জানায় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে জেলায় খেজুরগাছ রয়েছে ১৬ লাখ ২৫ হাজারের মতো। জেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ক্ষেতের আইলে, রাস্তার ধারে, নদী বা খালের পাড়ে খেজুরগাছ হয়ে থাকে। আবার দুয়েক জায়গায় পতিত জমিতে খেজুরগাছের বাগান রয়েছে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, যশোর অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দো-আঁশ। আর পানিতে লবণাক্ততা নেই। এর ফলে গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। সব মিলিয়ে জলবায়ু উপযোগী যশোরের খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।
গাছিরা জানান, কাঁচা রস ঠিলে বা ভাঁড়প্রতি (৩-৫ কেজি) ১৫০-২০০ টাকা বিক্রি হয়। ভালো মানের এক ভাঁড় গুড় বিক্রি হয় হাজার টাকায়। আর পাটালি কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। রস সংগ্রহ থেকে গুড়-পাটালি বানানো কাজটা বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। আশ্বিন মাসের (অক্টোবরের মাঝামাঝির পর থেকে) শুরু থেকে চৈত্র (মার্চ) মাস পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস গাছি ও তাঁর পরিবারকে দিনের উল্লেখযোগ্য সময় এর পেছনে ব্যয় করতে হয়। আর মৌসুম শেষে তাঁদের আয়-রোজগারও হয় ভালো।
যশোরে সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট বসে সদরের রূপদিয়া, বাঘারপাড়ার খাজুরা, মণিরামপুর, কেশবপুর ও মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে। ব্যবসায়ীরা এসব হাট থেকে খেজুরের গুড় ও পাটালি কিনে সারা দেশে সরবরাহ করেন। এখানকার খেজুরের গুড়-পাটালির সুনাম থাকায় দেশে-বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
২০২২ সালে চৌগাছার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বর্তমানে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা জানান, খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণে খেজুর গুড়ের মেলা, গাছিদের প্রশিক্ষণ, গাছি সমাবেশ, গাছিদের সমবায় সমিতি গঠন, খেজুরগাছ রোপণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন তিনি। একই বছর জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য যশোরের খেজুর গুড়ের আবেদন করেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সেটি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়।
গত ২ নভেম্বর খেজুরগাছ প্রস্তুতের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। চৌগাছা উপজেলার হায়াতপুর গ্রামে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ইউএনও শাহিনুর আক্তার। গত শনিবার বিকালে সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের মাঠে খেজুরগাছ কাটছিলেন গাছি টিপু সুলতান। তিনি বলেন, আমার নিজস্ব কোনো খেজুরগাছ নেই। গ্রামের কয়েকজনের কাছ থেকে ১৫০ গাছ লিজ নিয়েছি। লিজ বা ভাগ বের করে দিয়েও মৌসুম শেষে এসব গাছে লাখ দেড়েক টাকা মুনাফা থাকবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, নিরাপদ রস-গুড় উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত ও সচেতন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি প্রজেক্টও এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যশোর জেলায় ৩ কোটি ৭১ লাখ লিটার রস ও ২ হাজার ৭৪২ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারদর অনুযায়ী রস ও গুড়ের বাজার দর প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
Reporter Name 

























