ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে এই ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন পেছাতে একের পর দাবি-দাওয়া ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। যার প্রথম ধাপে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) এর মাধ্যমে হয়। এই দাবি তুলে বলা হয় পিআর না হলে নির্বাচন হবে না হতে দেয়া হবে না। এটি হালে পানি না পেলে নতুন করে আলোচনায় আসে গণভোট ইস্যু। জামায়াতসহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট না নির্বাচন হতে দেবে না বলে হুমকী দেয়। এমনকি এই দাবিতে রাজপথেও নামে এসব দল। আর শুরু থেকেই বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি- জাতীয় নির্বাচনের তিন মাসের কম সময় আগে একই রকম আরেকটি কর্মযজ্ঞ আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সম্ভব হবে না, এটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে এবং আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীসহ সার্বিক লোকবলের জন্য চাপ হবে। অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ঘোষণা করেছেন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে।
গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখি অবস্থানে যখন রাজনৈতিক সঙ্কট চরমে তখন প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণের আগের দিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলটি আয়োজিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের একটি অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। যেখানে তিনি অতীতের বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্যের মতোই ফের দেশ, দেশের মানুষের জন্য কি করলে ভালো সে বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। আর তার এই বক্তব্য প্রচারের পর থেকে কেবল জামায়াতপন্থীরা সমালোচনা করলেও দেশের আপামর কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষ প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে গণভোটে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে কৃষকদের জন্য সেই টাকা ব্যয় করে দীর্ঘমেয়াদে কৃষক, কৃষি ও দেশের অর্থনীতিকে কিভাবে এগিয়ে নেয়া যায় সেই পরিকল্পনা তুলে ধরেন। গণভোটের অর্থ ব্যয় চেয়ে আলু চাষী ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের রাজনীতি কাদের জন্য। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমার কিছু উপলব্ধির কথা বলতে চাই। দেশে এবার এক কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। আলু উৎপাদন করে খুব সম্ভবত আলু কৃষকরা বিপাকে পড়ে গিয়েছেন, কারণ আলুর যে উৎপাদন খরচ এবং আলুর উৎপাদিত আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখতে হবে। প্রতি কেজি আলুর পেছনে খুব সম্ভবত খরচ পড়ছে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ টাকার মতো। অথচ আলুর চাষীরা কিন্তু এখনো অর্ধেক দামেও উৎপাদিত আলু বাজারে বিক্রি সম্ভবত করতে উনারা পারছেন না। আলু চাষ করে আলু চাষীরা এবার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান তারা আশঙ্কা করছেন। অপর দিকে আমরা দেখি যে, দু’একটি রাজনৈতিক দলের আবদার মেটাতে গিয়ে কথিত গণভোট যদি করতে হয় রাষ্ট্রকে আলু চাষীদের যে তিন হাজার কোটি টাকা পরিমাণের গচ্চা, এই কথিত গণভোট করতে হলে প্রায় সমপরিমাণের টাকা গচ্চা দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসানের মুখোমুখি এইসব আলু চাষীদের কাছে এই সময় গণভোটের চেয়ে মনে হয় আলুর ন্যায্য মূল্য পাওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই ভাবে পেঁয়াজের উৎপাদনের বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা বা যে পরিমাণ উৎপাদন হয় আমাদের কৃষকদের কম বেশি মোটামুটি সক্ষমতা রয়েছে যদি তাদেরকে সহযোগিতা করা হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণ সুষ্ঠভাবে সংরক্ষণ করার কোন ব্যবস্থা সেভাবে না থাকায় অর্থাৎ কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় আমাদেরকে প্রতিবছর পেঁয়াজের জন্য আমদানির ওপরে নির্ভর করতে হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কথিত গণভোট করার চেয়ে সেই টাকায় পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ যদি স্থাপন করা হয় এটা বোধহয় কৃষকদের কাছে গণভোটের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। তবে সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাপার হচ্ছে পেঁয়াজ কৃষক বলুন বা অন্য যেই কৃষকের কথাই বলুন না কেন তাদের কথাগুলো যেরকম তাদের বলার জায়গা নেই ,এই মুহূর্তে তাদের হয়ে কথাগুলো তুলে ধরারও বোধ হয় কোন জায়গা নেই।
দেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, গার্মেন্টস শিল্প বন্ধে বেকার কর্মহীন শ্রমিকদের দুরাবস্থা, শিক্ষা খাতে দুরাবস্থা, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার সর্বনি¤œ ফলাফল প্রভৃতি বিষয়গুলো তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এসব বিষয়ে এখন গণভোটের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
তারেক রহমানের এই বক্তব্য প্রচারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্রই প্রশংসিত হচ্ছে। ফেসবুকে অসংখ্য পোস্টে কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে ভাবনার জন্য তারেক রহমানের প্রশংসা করা হয়েছে।
তানজিম রুবায়েত আফিফ নামে একজন লেখেছে- তারেক রহমান আজ তার বক্তব্যে মাত্র ২ টা পয়েন্ট উল্লেখ্য করেছেন। ১. দেশে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু বেধে দেয়া দামে বাস্তবায়ন না থাকায় কৃষকরা অর্ধেক দামেও আলু বিক্রি করতে পারতেছে না। এ বছর আলুচাষীদের ক্ষতি হবে আনুমানিক ৩০০০ কোটি টাকার মত।
২। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পেয়াজের দাম এখন ১১০ টাকা। প্রচুর পেয়াজ চাষ হলেও সংরক্ষণাগার না থাকায় প্রতি বছরই প্রচুর পরিমান পেয়াজ আমদানি করতে হয়।তাই প্রচুর টাকা নষ্ট হয়। তৃতীয় বিশ্বের একটি “উন্নয়নশীল” রাষ্ট্রে গণভোটের প্রয়োজনীয়তার থেকে সে দেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামের মূল্য যেদিন বেশি হবে সেদিনই এ দেশ এগিয়ে যাবে। সময় এসেছে ভাববার, অর্থনৈতিকভাবে খাদের কিনারায় থাকা একটি দেশ কিভাবে তার স্বল্প সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু ব্যবহার করবে।
মোহাম্মদ রাজু নামে একজন লিখেছেন- তারেক রহমান যখন বাংলাদেশের কৃষকদের কথা চিন্তা করে আলু ও পেয়াজ সংরক্ষন চিন্তা করছে, ঠিক তখন জামাত-শিবির সেই বক্তব্যকে বিকৃত করে শ্লোগান দিচ্ছে। জামাত-শিবির কখনই দেশের এবং দেশের মানুষের কথা ভাবেনা। এটাই বাস্তব।
শুধু সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমেই নয়, চায়ের আড্ডায়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও তারেক রহমানের এই বক্তব্য প্রশংসা কুড়িয়েছে। যেখানে তিন মাসের ব্যবধানে দুটি বড় নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচের দিকে ঠেলে দিতে কয়েকটি রাজনৈতিক দল বাধ্য করছিল সেখানে বিএনপি ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েই সেটি সম্পন্ন করার মতো পথ বাতলে দিয়েছে এবং অবস্থান নিয়েছে। রাষ্ট্রের এই বিপুল অর্থ সাশ্রয়ের যে চিন্তা-ভাবনা এবং তা দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ও চিন্তা-ভাবনা সেটিরও প্রশংসা করেছেন তারা।
Reporter Name 



















