ঢাকা ০৯:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সংগঠিত সফল উদগিরণ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ১০৬ বার

তৌহিদুজ্জামান সোহান

টালমাটাল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বিক্ষোভ, সরকার পতন আর রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র। গত ৩ বছরে শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ হয়ে নেপাল পর্যন্ত তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন নিজ নিজ দেশের সরকার পতন ঘটিয়েছে। ভারত-পাকিস্তান জড়িয়েছে যুদ্ধে।

থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও একই ধরনের জনরোষ দৃশ্যমান। দাবি ভিন্ন হলেও আন্দোলনের ধারা ও পরিণতি প্রায় একই রকম। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ শাসকশ্রেণিই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুর্বলের কারণ। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্য-বঞ্চনা যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তারই উদগিরণ ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে যোগাযোগের অভূতপূর্ব সুযোগ করে দেওয়ায় সংগঠিত হওয়া এবং আন্দোলন সফল করা সহজ হচ্ছে। অবশ্য আঞ্চলিক অস্থিরতায় ভারত আর চীনের মতো বড় বড় দেশগুলোর প্রভাবের কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।

শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ হয়ে নেপাল : দক্ষিণ এশিয়ার শুরুটা শ্রীলঙ্কা দিয়ে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক পতন ঘটে সেখানে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। ঋণের বোঝা, জ্বালানি ও খাদ্য ঘাটতি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় করে তোলে। রাজারপাকসে সরকারের বিরুদ্ধে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী কলম্বোসহ পুরো দেশ। আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে। পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন বামপন্থি নেতা অণুঢ়া কুমারা দিসানায়েক। তবে সময় পেরোলেও সংকট কাটেনি। এখনও লঙ্কানদের ভুগতে হচ্ছে অর্থনৈতিক দুর্দশা ও বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে। এরপর বাংলাদেশে কোটা সংস্কার থেকে একদফার আন্দোলন।

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয় বাংলাদেশে। কিন্তু সরকারের কঠোর দমননীতি, শত শত প্রাণহানি আর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্য আন্দোলনকে একদফার সরকার পতনের দাবিতে রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও এক বছরের বেশি সময়েও শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফেরেনি। নির্বাচন কবে হবে সে নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। কাঠমান্ডুতে বিক্ষোভে প্রথম দিনেই পুলিশের গুলিতে ১৯ জন নিহত হলে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পার্লামেন্ট ভবন ও মন্ত্রীদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হয়। চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। তবে নতুন সরকার গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনও অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো নেপালও দীর্ঘ অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ : চির বৈরী দুই দেশ ভারত-পাকিস্তানও এরই মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়েছে। কাশ্মির ইস্যুতে দুদেশের লড়াই দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময় হামলায় পর্যটক নিহতের ঘটনায় পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরোধ তুঙ্গে। অপারেশন সিঁদুর নামে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানও ভারতের বেশ কিছু জায়গায় হামলা চালায়। গত ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে, তার মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনও বিরাজ করছে।

অস্থির দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াও : ওদিকে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডেও সংসদ ও আদালতের টানাপড়েন চলছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সংসদ সদস্যদের সুবিধা বৃদ্ধি এবং এক তরুণ ডেলিভারি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র বিক্ষোভ দেখা দেয়। আন্দোলনে নিহত হয়েছেন অন্তত সাতজন, আটক রয়েছেন কয়েকশ মানুষ। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে গত দুই বছরে তিনবার প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে। কখনো আদালতের রায়ে, কখনো সামরিক চাপে সরকারের পতন ঘটেছে। অন্যদিকে মিয়ানমার ও ফিলিপাইনেও ভিন্ন মাত্রার সংকট চলছে। মিয়ানমার এখনও রোহিঙ্গা ইস্যু ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নাস্তানাবুদ। অন্যদিকে ফিলিপাইনে প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র ও ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতার্তের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তৈরি হয়েছে নতুন অস্থিরতা। সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্র ও অভ্যুত্থানের অভিযোগ আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর দলের ভেতর-বাইরে চাপের মুখে পড়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু। ক্ষমতা গ্রহণের ১১ মাসের মাথায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন ইশিবা। দেশটি বর্তমানে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ গাড়িশিল্পের ওপর মার্কিন শুল্কের প্রভাব নিয়ে চাপে আছে।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা : দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অস্থিরতার মূলে রয়েছে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও দুর্নীতির জাল। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু সরকারের পদত্যাগ নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়। তারা বলেন, প্রতিটি আন্দোলন শুরু হয়েছিল নির্দিষ্ট কোনো ইস্যু বা অসন্তোষকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরিণতিতে জনগণের ক্ষোভ গিয়ে ঠেকেছে শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সার্বিক অবিশ্বাসে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীনরা বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, বৈষম্য আর অদক্ষ শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি দেশে অস্থিরতার কারণ ভিন্ন হলেও একটি অভিন্ন সূত্র রয়েছে। আর তা হলো দুর্নীতি, বৈষম্য, অদক্ষ শাসনের বিপরীতে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বারবার আন্দোলন ও সরকার পতনের পেছনে মূল কারণ হলো শাসক শ্রেণিকে জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ হিসেবে দেখে। একবার এই ধারণা তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে। তার ভাষ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ বিক্ষোভই নাটকীয়ভাবে মিলে যায়। তবে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয় সামান্য ভুল হিসাব বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনাই বড় গণবিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নেপাল আসলে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ধরনের অস্থির রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

দেশে দেশে এমন বিক্ষোভের বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, বিক্ষোভে জড়িত দেশগুলোর কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ, মূলধারার রাজনীতি, সরকার, প্রশাসন তথা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই জগদ্দল পাথরের মতো দশকের পর দশক ধরে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। জনমুখী কোনো সংস্কার হয়নি, পরিবর্তন ঘটেনি। বিষয়টি মানুষের মনে দিনের পর দিন ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাই এসব বিক্ষোভে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা সেই ক্ষোভের উদগিরণ হয়েছে। আর এই সময়ে এসে বিক্ষোভ দানা বাঁধার পেছনে একটি বিশেষ কারণ হলো প্রযুক্তির বিকাশ। সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ মানুষকে মতামত প্রকাশের একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে এবং ওই মতামতের ভিত্তিতে চট করে সম্মিলিত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছে। আগেও মানুষ এসব সমস্যায় ভারাক্রান্ত ছিল, কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে চট করে সমবেত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনকার মতো সুবিধাজনক অবস্থা ছিল না। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ চাপের পাশাপাশি বাহ্যিক চাপও রয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে ছোট ছোট দেশগুলোতেই বিক্ষোভ হচ্ছে। চীন কিংবা ভারতের মতো বড় দেশগুলোর এ ধরনের বিক্ষোভ রুখে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণের মতো একটা শক্তির জায়গা আছে।

ফলে বাইরের শক্তি তথা বড় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে এসব উত্থান বা বিক্ষোভে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের এসব স্বার্থ অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে হাসিল হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সামনে আসে। ফলে এই পরিবর্তন চেষ্টা বা উত্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও যেমন আছে তেমনি বাহ্যিক প্রভাবকের ভূমিকাও আছে। আর এগুলো কতটা বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব তা বলার সময় এখনও আসেনি, সেটা পরবর্তীতে বোঝা যাবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

হাওরে কৃষক বিপর্যয়: ক্ষতিগ্রস্তদের ৩ মাস সহায়তার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সংগঠিত সফল উদগিরণ

আপডেট টাইম : ১১:১৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

তৌহিদুজ্জামান সোহান

টালমাটাল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বিক্ষোভ, সরকার পতন আর রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র। গত ৩ বছরে শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ হয়ে নেপাল পর্যন্ত তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন নিজ নিজ দেশের সরকার পতন ঘটিয়েছে। ভারত-পাকিস্তান জড়িয়েছে যুদ্ধে।

থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও একই ধরনের জনরোষ দৃশ্যমান। দাবি ভিন্ন হলেও আন্দোলনের ধারা ও পরিণতি প্রায় একই রকম। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ শাসকশ্রেণিই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুর্বলের কারণ। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্য-বঞ্চনা যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তারই উদগিরণ ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে যোগাযোগের অভূতপূর্ব সুযোগ করে দেওয়ায় সংগঠিত হওয়া এবং আন্দোলন সফল করা সহজ হচ্ছে। অবশ্য আঞ্চলিক অস্থিরতায় ভারত আর চীনের মতো বড় বড় দেশগুলোর প্রভাবের কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।

শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ হয়ে নেপাল : দক্ষিণ এশিয়ার শুরুটা শ্রীলঙ্কা দিয়ে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক পতন ঘটে সেখানে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। ঋণের বোঝা, জ্বালানি ও খাদ্য ঘাটতি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় করে তোলে। রাজারপাকসে সরকারের বিরুদ্ধে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী কলম্বোসহ পুরো দেশ। আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে। পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন বামপন্থি নেতা অণুঢ়া কুমারা দিসানায়েক। তবে সময় পেরোলেও সংকট কাটেনি। এখনও লঙ্কানদের ভুগতে হচ্ছে অর্থনৈতিক দুর্দশা ও বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে। এরপর বাংলাদেশে কোটা সংস্কার থেকে একদফার আন্দোলন।

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয় বাংলাদেশে। কিন্তু সরকারের কঠোর দমননীতি, শত শত প্রাণহানি আর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্য আন্দোলনকে একদফার সরকার পতনের দাবিতে রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও এক বছরের বেশি সময়েও শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফেরেনি। নির্বাচন কবে হবে সে নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। কাঠমান্ডুতে বিক্ষোভে প্রথম দিনেই পুলিশের গুলিতে ১৯ জন নিহত হলে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পার্লামেন্ট ভবন ও মন্ত্রীদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হয়। চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। তবে নতুন সরকার গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনও অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো নেপালও দীর্ঘ অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ : চির বৈরী দুই দেশ ভারত-পাকিস্তানও এরই মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়েছে। কাশ্মির ইস্যুতে দুদেশের লড়াই দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময় হামলায় পর্যটক নিহতের ঘটনায় পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরোধ তুঙ্গে। অপারেশন সিঁদুর নামে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানও ভারতের বেশ কিছু জায়গায় হামলা চালায়। গত ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে, তার মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনও বিরাজ করছে।

অস্থির দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াও : ওদিকে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডেও সংসদ ও আদালতের টানাপড়েন চলছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সংসদ সদস্যদের সুবিধা বৃদ্ধি এবং এক তরুণ ডেলিভারি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র বিক্ষোভ দেখা দেয়। আন্দোলনে নিহত হয়েছেন অন্তত সাতজন, আটক রয়েছেন কয়েকশ মানুষ। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে গত দুই বছরে তিনবার প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে। কখনো আদালতের রায়ে, কখনো সামরিক চাপে সরকারের পতন ঘটেছে। অন্যদিকে মিয়ানমার ও ফিলিপাইনেও ভিন্ন মাত্রার সংকট চলছে। মিয়ানমার এখনও রোহিঙ্গা ইস্যু ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নাস্তানাবুদ। অন্যদিকে ফিলিপাইনে প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র ও ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতার্তের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তৈরি হয়েছে নতুন অস্থিরতা। সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্র ও অভ্যুত্থানের অভিযোগ আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর দলের ভেতর-বাইরে চাপের মুখে পড়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু। ক্ষমতা গ্রহণের ১১ মাসের মাথায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন ইশিবা। দেশটি বর্তমানে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ গাড়িশিল্পের ওপর মার্কিন শুল্কের প্রভাব নিয়ে চাপে আছে।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা : দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অস্থিরতার মূলে রয়েছে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও দুর্নীতির জাল। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু সরকারের পদত্যাগ নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়। তারা বলেন, প্রতিটি আন্দোলন শুরু হয়েছিল নির্দিষ্ট কোনো ইস্যু বা অসন্তোষকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরিণতিতে জনগণের ক্ষোভ গিয়ে ঠেকেছে শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সার্বিক অবিশ্বাসে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীনরা বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, বৈষম্য আর অদক্ষ শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি দেশে অস্থিরতার কারণ ভিন্ন হলেও একটি অভিন্ন সূত্র রয়েছে। আর তা হলো দুর্নীতি, বৈষম্য, অদক্ষ শাসনের বিপরীতে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বারবার আন্দোলন ও সরকার পতনের পেছনে মূল কারণ হলো শাসক শ্রেণিকে জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ হিসেবে দেখে। একবার এই ধারণা তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে। তার ভাষ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ বিক্ষোভই নাটকীয়ভাবে মিলে যায়। তবে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয় সামান্য ভুল হিসাব বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনাই বড় গণবিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নেপাল আসলে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ধরনের অস্থির রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

দেশে দেশে এমন বিক্ষোভের বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, বিক্ষোভে জড়িত দেশগুলোর কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ, মূলধারার রাজনীতি, সরকার, প্রশাসন তথা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই জগদ্দল পাথরের মতো দশকের পর দশক ধরে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। জনমুখী কোনো সংস্কার হয়নি, পরিবর্তন ঘটেনি। বিষয়টি মানুষের মনে দিনের পর দিন ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাই এসব বিক্ষোভে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা সেই ক্ষোভের উদগিরণ হয়েছে। আর এই সময়ে এসে বিক্ষোভ দানা বাঁধার পেছনে একটি বিশেষ কারণ হলো প্রযুক্তির বিকাশ। সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ মানুষকে মতামত প্রকাশের একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে এবং ওই মতামতের ভিত্তিতে চট করে সম্মিলিত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছে। আগেও মানুষ এসব সমস্যায় ভারাক্রান্ত ছিল, কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে চট করে সমবেত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনকার মতো সুবিধাজনক অবস্থা ছিল না। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ চাপের পাশাপাশি বাহ্যিক চাপও রয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে ছোট ছোট দেশগুলোতেই বিক্ষোভ হচ্ছে। চীন কিংবা ভারতের মতো বড় দেশগুলোর এ ধরনের বিক্ষোভ রুখে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণের মতো একটা শক্তির জায়গা আছে।

ফলে বাইরের শক্তি তথা বড় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে এসব উত্থান বা বিক্ষোভে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের এসব স্বার্থ অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে হাসিল হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সামনে আসে। ফলে এই পরিবর্তন চেষ্টা বা উত্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও যেমন আছে তেমনি বাহ্যিক প্রভাবকের ভূমিকাও আছে। আর এগুলো কতটা বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব তা বলার সময় এখনও আসেনি, সেটা পরবর্তীতে বোঝা যাবে।