ঢাকা ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাভের আশায় ব্যাংকে ফিরছে টাকা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০০:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ৭০ বার

ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় আমানতে নতুন করে সাড়া মিলেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসে ব্যাংকে জমা বেড়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির হারে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায়।

শহর বনাম গ্রাম

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শহরের চেয়ে গ্রামীণ এলাকায় আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। জুন শেষে মোট ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকার আমানতের মধ্যে শহরাঞ্চলে ছিল ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৫৮ কোটি এবং গ্রামে ৩ লাখ ১৬ হাজার ২৪ কোটি টাকা। মার্চে যেখানে মোট আমানতের ৮৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ছিল শহরে আর ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ গ্রামে, সেখানে তিন মাসে গ্রামীণ আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ; যা শহরের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিং, সঞ্চয়পত্র ও নানা প্রণোদনা গ্রামীণ সঞ্চয়কে বাড়িয়ে দিয়েছে।

সুদের হারের প্রভাব

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৩১ শতাংশে। সামান্য এই বৃদ্ধি গ্রাহকদের হাতে নগদ না রেখে ব্যাংকে টাকা রাখার প্রবণতা বাড়িয়েছে।

ব্যাংকার ও বিশ্লেষকের মত

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘টাকা হাতে রাখা যায় না। ব্যাংক এখন বেশি সুদ দিচ্ছে, তাই মানুষ ব্যাংকেই টাকা রাখছে। ফলে আমানত বাড়ছে, সামনে আরও বাড়বে।’

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ‘খেলাপি ঋণ ও অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও কিছু ভালো ব্যাংক আমানত ধরে রেখেছে। ইসলামী ব্যাংকসহ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে বিশেষভাবে আমানত বেড়েছে। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলো যদি আস্থা ফেরাতে পারত, প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হতো।’

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মো. হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘গ্রামীণ আমানত বৃদ্ধিকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত বলা যায়। তবে শুধু সুদের হার দিয়ে এই প্রবণতা টেকসই হবে না। আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।’

কোন ব্যাংকে বেশি আমানত

২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে সবচেয়ে বেশি আমানত বেড়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও পূবালী ব্যাংকে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খাঁন আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘আমাদের ওপর গ্রাহকের আস্থা ফিরেছে। সরকার বদলের পর অনিয়ম বন্ধ হওয়ায় আমানত ব্যাপক হারে বাড়ছে।’

ঋণের চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকায়। তিন মাসে ঋণ বেড়েছে ২১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে বলেন, ‘সুদের হার বাড়ায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক ছাড়া সবার অবস্থাই ইতিবাচক।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

লাভের আশায় ব্যাংকে ফিরছে টাকা

আপডেট টাইম : ১১:০০:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় আমানতে নতুন করে সাড়া মিলেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসে ব্যাংকে জমা বেড়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির হারে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায়।

শহর বনাম গ্রাম

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শহরের চেয়ে গ্রামীণ এলাকায় আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। জুন শেষে মোট ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকার আমানতের মধ্যে শহরাঞ্চলে ছিল ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৫৮ কোটি এবং গ্রামে ৩ লাখ ১৬ হাজার ২৪ কোটি টাকা। মার্চে যেখানে মোট আমানতের ৮৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ছিল শহরে আর ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ গ্রামে, সেখানে তিন মাসে গ্রামীণ আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ; যা শহরের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিং, সঞ্চয়পত্র ও নানা প্রণোদনা গ্রামীণ সঞ্চয়কে বাড়িয়ে দিয়েছে।

সুদের হারের প্রভাব

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৩১ শতাংশে। সামান্য এই বৃদ্ধি গ্রাহকদের হাতে নগদ না রেখে ব্যাংকে টাকা রাখার প্রবণতা বাড়িয়েছে।

ব্যাংকার ও বিশ্লেষকের মত

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘টাকা হাতে রাখা যায় না। ব্যাংক এখন বেশি সুদ দিচ্ছে, তাই মানুষ ব্যাংকেই টাকা রাখছে। ফলে আমানত বাড়ছে, সামনে আরও বাড়বে।’

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ‘খেলাপি ঋণ ও অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও কিছু ভালো ব্যাংক আমানত ধরে রেখেছে। ইসলামী ব্যাংকসহ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে বিশেষভাবে আমানত বেড়েছে। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলো যদি আস্থা ফেরাতে পারত, প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হতো।’

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মো. হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘গ্রামীণ আমানত বৃদ্ধিকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত বলা যায়। তবে শুধু সুদের হার দিয়ে এই প্রবণতা টেকসই হবে না। আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।’

কোন ব্যাংকে বেশি আমানত

২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে সবচেয়ে বেশি আমানত বেড়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও পূবালী ব্যাংকে। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খাঁন আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘আমাদের ওপর গ্রাহকের আস্থা ফিরেছে। সরকার বদলের পর অনিয়ম বন্ধ হওয়ায় আমানত ব্যাপক হারে বাড়ছে।’

ঋণের চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকায়। তিন মাসে ঋণ বেড়েছে ২১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে বলেন, ‘সুদের হার বাড়ায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক ছাড়া সবার অবস্থাই ইতিবাচক।’