ঢাকা ০৬:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারত-পাকিস্তানে যুদ্ধের প্রস্তুতি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫
  • ১৬১ বার

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার জেরে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দুই বৈরী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলওসি) ছয় দিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা ঘটছে। সীমান্তে জোরদার করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি। কূটনীতিক বহিষ্কারসহ উভয় পক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে পাকিস্তানে অভিযানের ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

বসে নেই পাকিস্তানও। ভারত ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে দেশটির সামরিক বাহিনীও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। এমনকি আক্রান্ত হলে কীভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে সীমান্ত এলাকার বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মহড়াও চলছে। খোদ পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বলেছেন, পরবর্তী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে ভারত। এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য’ রয়েছে। তবে পাকিস্তান তার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালেও একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘পেহেলগামের ঘটনায় জড়িত থাকার ভিত্তিহীন অভিযোগের অজুহাত দেখিয়ে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে চায় দিল্লি। তিনি বলেন, ‘ভারত নিজেই একাধারে বিচারক, আদালত ও জল্লাদের অহংকারী ভূমিকা নিচ্ছে। এটি বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। পাকিস্তান নিজেই বহু বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের শিকার এবং এই বিপর্যয়ের যন্ত্রণা আমরা খুব ভালো করেই বুঝি। আমরা সব সময় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি।’

এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে পাকিস্তানে অভিযানের ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এনডিটিভি জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান এবং তিন বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে এই নির্দেশনা দেন তিনি। মোদি বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে জবাব দেওয়ার সময়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং কোন প্রক্রিয়ায় জবাব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে।

ষষ্ঠ দিনের মতো গুলিবিনিময়

রয়টার্স জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখায় উভয় পক্ষের মধ্যে গুলির খবর পাওয়া গেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযোগ, মধ্যরাতে একাধিক পাকিস্তানি সেনাচৌকি থেকে ‘বিনা উসকানিতে’ গুলি চালানো হয়। ভারতীয় সেনারাও জবাব দিয়েছে। রয়টার্সের তরফে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ ব্যাপারে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রের বরাত দিয়ে এএনআই বলেছে, পাকিস্তান কর্তৃক বিনা উসকানিতে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়ে হটলাইনে উভয় দেশের সামরিক অভিযানবিষয়ক মহাপরিচালকদের কথা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণরেখায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উসকানির বিষয়ে ইসলামাবাদকে সতর্ক করেছে ভারত।

সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছ থেকে ভারতের চারটি রাফায়েল যুদ্ধবিমানকে ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে পাকিস্তান। দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিমানগুলো ভারতশাসিত কাশ্মীরের আকাশসীমায় টহল দিচ্ছিল। কিন্তু দ্রুত সেগুলোকে শনাক্ত করে তাড়িয়ে দেয় পাকিস্তানের বিমানবাহিনী। তার আগে এলওসিতে ভারতের গুপ্তচর ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, পাকিস্তান প্রথমে আক্রমণ চালাবে না, তবে আঘাত এলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

সংযত থাকতে জাতিসংঘের আহ্বান

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিখ জানান, মঙ্গলবার আলাদাভাবে দুই নেতার সঙ্গে কথা বলেন গুতেরেস। এ সময় তিনি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হতে পারে, এমন যেকোনো সংঘাত এড়িয়ে চলতে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। প্রয়োজনে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ মধ্যস্থতা’রও প্রস্তাব দেন তিনি।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়, জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলাপকালে দিল্লিকে দায়িত্বশীল আচরণ ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানোর অনুরোধ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ভারতের একতরফাভাবে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সিন্ধু অববাহিকার পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের যেকোনো পদক্ষেপ পাকিস্তানের কাছে অগ্রহণযোগ্য।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-পাকিস্তানে যুদ্ধের প্রস্তুতি

আপডেট টাইম : ১০:৪২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার জেরে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দুই বৈরী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলওসি) ছয় দিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা ঘটছে। সীমান্তে জোরদার করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি। কূটনীতিক বহিষ্কারসহ উভয় পক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে পাকিস্তানে অভিযানের ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

বসে নেই পাকিস্তানও। ভারত ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে দেশটির সামরিক বাহিনীও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। এমনকি আক্রান্ত হলে কীভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে সীমান্ত এলাকার বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মহড়াও চলছে। খোদ পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বলেছেন, পরবর্তী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে ভারত। এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের কাছে ‘বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য’ রয়েছে। তবে পাকিস্তান তার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালেও একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘পেহেলগামের ঘটনায় জড়িত থাকার ভিত্তিহীন অভিযোগের অজুহাত দেখিয়ে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে চায় দিল্লি। তিনি বলেন, ‘ভারত নিজেই একাধারে বিচারক, আদালত ও জল্লাদের অহংকারী ভূমিকা নিচ্ছে। এটি বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। পাকিস্তান নিজেই বহু বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের শিকার এবং এই বিপর্যয়ের যন্ত্রণা আমরা খুব ভালো করেই বুঝি। আমরা সব সময় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি।’

এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে পাকিস্তানে অভিযানের ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এনডিটিভি জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান এবং তিন বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে এই নির্দেশনা দেন তিনি। মোদি বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে জবাব দেওয়ার সময়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং কোন প্রক্রিয়ায় জবাব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে।

ষষ্ঠ দিনের মতো গুলিবিনিময়

রয়টার্স জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখায় উভয় পক্ষের মধ্যে গুলির খবর পাওয়া গেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযোগ, মধ্যরাতে একাধিক পাকিস্তানি সেনাচৌকি থেকে ‘বিনা উসকানিতে’ গুলি চালানো হয়। ভারতীয় সেনারাও জবাব দিয়েছে। রয়টার্সের তরফে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ ব্যাপারে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রের বরাত দিয়ে এএনআই বলেছে, পাকিস্তান কর্তৃক বিনা উসকানিতে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়ে হটলাইনে উভয় দেশের সামরিক অভিযানবিষয়ক মহাপরিচালকদের কথা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণরেখায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উসকানির বিষয়ে ইসলামাবাদকে সতর্ক করেছে ভারত।

সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছ থেকে ভারতের চারটি রাফায়েল যুদ্ধবিমানকে ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে পাকিস্তান। দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিমানগুলো ভারতশাসিত কাশ্মীরের আকাশসীমায় টহল দিচ্ছিল। কিন্তু দ্রুত সেগুলোকে শনাক্ত করে তাড়িয়ে দেয় পাকিস্তানের বিমানবাহিনী। তার আগে এলওসিতে ভারতের গুপ্তচর ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, পাকিস্তান প্রথমে আক্রমণ চালাবে না, তবে আঘাত এলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

সংযত থাকতে জাতিসংঘের আহ্বান

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিখ জানান, মঙ্গলবার আলাদাভাবে দুই নেতার সঙ্গে কথা বলেন গুতেরেস। এ সময় তিনি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হতে পারে, এমন যেকোনো সংঘাত এড়িয়ে চলতে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। প্রয়োজনে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ মধ্যস্থতা’রও প্রস্তাব দেন তিনি।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়, জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলাপকালে দিল্লিকে দায়িত্বশীল আচরণ ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানোর অনুরোধ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ভারতের একতরফাভাবে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সিন্ধু অববাহিকার পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের যেকোনো পদক্ষেপ পাকিস্তানের কাছে অগ্রহণযোগ্য।