ঢাকা ০৯:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১৯:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
  • ১৬ বার

দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভোগাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। শুধু নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত নয়-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝেও একধরনের বোবাকান্না বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সবই ব্যর্থ ও অকার্যকর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এসব কথা বলেন। অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-হামিদ বিশ্বাস

যুগান্তর : বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : দেশ এখন অনেক কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে অন্যতম হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মন্থরতা এবং সম্পদের অপ্রতুলতা। অর্থাৎ দেশের যে সম্পদ আছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এগুলো একেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যোগ হবে রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রশাসন। এসব চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

যুগান্তর : ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে এবারের বাজেটে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকছে?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : নিঃসন্দেহে মূল্যস্ফীতি সবার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানছে। মানুষের সঞ্চয় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে ক্রয়ক্ষমতা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব নীতি প্রণয়ন করেছে, তা যথাযথ হয়নি। সবই এখন ব্যর্থ ও অকার্যকর। হঠাৎ কেউ বলল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এ ধরনের রুটিন কথায় হবে না। এখানে মূল সমস্যা হলো-সমস্যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। বলা হয়, সব ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। তাহলে কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। আগে বলতে হবে-সমস্যা আছে। যথাসম্ভব সমস্যার গভীরে যেতে হবে। শুধু সরকারি লোক নয়, বেসরকারি খাতের যারা এ বিষয়ে ভালো বোঝেন, তাদের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, একতরফা সিদ্ধান্ত বা ভুলনীতি কাজে আসেনি, আসবেও না। সুতরাং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ বহুমুখী পদক্ষেপ এবং সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

যুগান্তর : দেশের রাজস্ব আদায় অনেক কম, সরকারের রাজস্ব আয় এবং রাজস্ব ব্যয় সমান। পুরো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় ঋণের টাকায়। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বাড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে রাজস্ব খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করে ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করতে হবে। রাজস্বের মধ্যে আছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর। এখন পরোক্ষ বা ভ্যাটের ওপর নির্ভর করছি। শুধু ভ্যাটের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এতে গরিব আরও গরিব হবে। যেতে হবে পরোক্ষ কর বা আয়কর এবং বিভিন্ন ফি আদায়ে। এ কাজ কঠিন। তাই ভ্যাটের দিকে চলে যায়। কারণ, সবার ওপর চাপিয়ে দিয়ে সহজে ভ্যাট আদায় করা যায়। সরকারকে আয়ের সহজ পথ পরিহার করে যেতে হবে কঠিন পথে। এতে সর্বসাধারণও বাঁচবে, অন্যদিকে করের আওতা বা করজালও বৃদ্ধি পাবে। কোনো অবস্থায় কর ফাঁকি চলবে না। ভুলনীতির কারণে সঞ্চয় করতে পারছে না সাধারণ মানুষ। নানা ভুলনীতি দিয়ে মানুষকে সঞ্চয় করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতে দুর্বলতার কারণে মানুষ টাকা রাখছে না। রাখলেও তুলে ফেলছে। ট্রেজারি বিল, বন্ডের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে সরকার। প্রথমে টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়। যদিও এখন তা বন্ধ করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের পুরোটাই এখন বৈদেশিক ঋণনির্ভর। দিনের পর দিন এই ঋণের বোঝা বাড়ছে। বাজেটের একটা বড় অংশ এই ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

যুগান্তর : ব্যয়ের দিক থেকে কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : প্রথমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করতে হবে। সরকারকে আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতেও ব্যয় বন্ধ করতে হবে। ব্যয় হবে শুধু উৎপাদনশীল খাতে। যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে অহেতুক অনেক ব্যয় হচ্ছে, এসব ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্যয় হবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তায়। শিল্পের আকার অনেক ছোট। এটা বাড়াতে হবে। বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পে বেশি নজর দিতে হবে। প্রশাসনের মাথা ভারী হচ্ছে। এ প্রশাসন দিয়ে কী হবে। কোনো কিছুই ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। সরকারের প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারি প্রকল্পে এক টাকার জিনিসে চার টাকা ব্যয় করা হয়। প্রশাসনের আকার ছোট করতে হবে। সব মিলিয়ে সরকারি প্রকল্পে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্পদ অপচয় বন্ধ করতে হবে।

যুগান্তর : বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমেই কমছে। ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বাড়বে। এ রিজার্ভ কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, করণীয় কী?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : ভুলনীতির কারণে আজ রিজার্ভের এই পরিণতি। ১২-১৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে কেন টাকাকে শক্তিশালী করার অপপ্রয়াস চালানো হলো? কী দরকার ছিল? আশপাশে সব দেশে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এখানেও হতো। জোর করে টাকার দাম ধরে রাখার প্রয়োজন ছিল না। এখন হঠাৎ ৭ টাকা বাড়ানো হলো। এটা স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়তে পারত। আমদানি বন্ধ করে দিলে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। হুন্ডি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে রিজার্ভ রক্ষা করা যাবে না। বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ঘাটে ঘাটে হয়রানি আর দুর্নীতি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারী কীভাবে আসবে। মুখে শুধু বললেই বিনিয়োগকারী আসবে না। বিনিয়োগের আবহ তৈরি করতে হবে।

যুগান্তর : আইএমএফ-এর অন্যতম একটি শর্ত হলো ভর্তুকি কমাতে হবে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : হ্যাঁ, অহেতুক ভর্তুকি কমান। তবে আইএমএফ-এর সব কথা মানা যাবে না। আইএমএফ-এর পরামর্শে পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ চলছে। কই? তেমন উন্নতি হচ্ছে না। সেজন্য তাদের সব কথা শোনার সুযোগ নেই। কৃষি খাতে সেচের ওপর ভর্তুকি কমানো যাবে না। এছাড়া সার, ডিজেলেও ভর্তুকি অপরিবর্তিত রাখতে হবে।

যুগান্তর : ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা, শেয়ারবাজারে সংকট এবং বন্ড মার্কেটে আস্থা নেই। বর্তমানে ব্যাংক মার্জার হচ্ছে। আবার অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য গোপনে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : আগে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষ পরিচালক পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সরকারি ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে হবে। পুরো খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে হঠাৎ মার্জার করে দিলে হবে না। এছাড়া শেয়ারবাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিদেশিরা প্রচুর বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এখানে কোনো বিনিয়োগ নেই। শুধু বিদেশে রোডশো করে বেড়ায়। ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার, আর্থিক হিসাব ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ঠিক হয়নি। যে তথ্য ঝুঁকিপূর্ণ, সে তথ্য দেবে না। তাই বলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত হয়নি।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট টাইম : ১১:১৯:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪

দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভোগাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। শুধু নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত নয়-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝেও একধরনের বোবাকান্না বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সবই ব্যর্থ ও অকার্যকর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এসব কথা বলেন। অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-হামিদ বিশ্বাস

যুগান্তর : বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : দেশ এখন অনেক কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে অন্যতম হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মন্থরতা এবং সম্পদের অপ্রতুলতা। অর্থাৎ দেশের যে সম্পদ আছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এগুলো একেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যোগ হবে রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রশাসন। এসব চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

যুগান্তর : ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে এবারের বাজেটে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকছে?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : নিঃসন্দেহে মূল্যস্ফীতি সবার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানছে। মানুষের সঞ্চয় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে ক্রয়ক্ষমতা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব নীতি প্রণয়ন করেছে, তা যথাযথ হয়নি। সবই এখন ব্যর্থ ও অকার্যকর। হঠাৎ কেউ বলল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এ ধরনের রুটিন কথায় হবে না। এখানে মূল সমস্যা হলো-সমস্যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। বলা হয়, সব ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। তাহলে কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। আগে বলতে হবে-সমস্যা আছে। যথাসম্ভব সমস্যার গভীরে যেতে হবে। শুধু সরকারি লোক নয়, বেসরকারি খাতের যারা এ বিষয়ে ভালো বোঝেন, তাদের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, একতরফা সিদ্ধান্ত বা ভুলনীতি কাজে আসেনি, আসবেও না। সুতরাং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ বহুমুখী পদক্ষেপ এবং সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

যুগান্তর : দেশের রাজস্ব আদায় অনেক কম, সরকারের রাজস্ব আয় এবং রাজস্ব ব্যয় সমান। পুরো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় ঋণের টাকায়। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বাড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে রাজস্ব খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করে ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করতে হবে। রাজস্বের মধ্যে আছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর। এখন পরোক্ষ বা ভ্যাটের ওপর নির্ভর করছি। শুধু ভ্যাটের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এতে গরিব আরও গরিব হবে। যেতে হবে পরোক্ষ কর বা আয়কর এবং বিভিন্ন ফি আদায়ে। এ কাজ কঠিন। তাই ভ্যাটের দিকে চলে যায়। কারণ, সবার ওপর চাপিয়ে দিয়ে সহজে ভ্যাট আদায় করা যায়। সরকারকে আয়ের সহজ পথ পরিহার করে যেতে হবে কঠিন পথে। এতে সর্বসাধারণও বাঁচবে, অন্যদিকে করের আওতা বা করজালও বৃদ্ধি পাবে। কোনো অবস্থায় কর ফাঁকি চলবে না। ভুলনীতির কারণে সঞ্চয় করতে পারছে না সাধারণ মানুষ। নানা ভুলনীতি দিয়ে মানুষকে সঞ্চয় করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতে দুর্বলতার কারণে মানুষ টাকা রাখছে না। রাখলেও তুলে ফেলছে। ট্রেজারি বিল, বন্ডের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে সরকার। প্রথমে টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়। যদিও এখন তা বন্ধ করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের পুরোটাই এখন বৈদেশিক ঋণনির্ভর। দিনের পর দিন এই ঋণের বোঝা বাড়ছে। বাজেটের একটা বড় অংশ এই ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

যুগান্তর : ব্যয়ের দিক থেকে কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : প্রথমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করতে হবে। সরকারকে আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতেও ব্যয় বন্ধ করতে হবে। ব্যয় হবে শুধু উৎপাদনশীল খাতে। যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে অহেতুক অনেক ব্যয় হচ্ছে, এসব ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্যয় হবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তায়। শিল্পের আকার অনেক ছোট। এটা বাড়াতে হবে। বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পে বেশি নজর দিতে হবে। প্রশাসনের মাথা ভারী হচ্ছে। এ প্রশাসন দিয়ে কী হবে। কোনো কিছুই ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। সরকারের প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারি প্রকল্পে এক টাকার জিনিসে চার টাকা ব্যয় করা হয়। প্রশাসনের আকার ছোট করতে হবে। সব মিলিয়ে সরকারি প্রকল্পে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্পদ অপচয় বন্ধ করতে হবে।

যুগান্তর : বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমেই কমছে। ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বাড়বে। এ রিজার্ভ কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, করণীয় কী?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : ভুলনীতির কারণে আজ রিজার্ভের এই পরিণতি। ১২-১৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে কেন টাকাকে শক্তিশালী করার অপপ্রয়াস চালানো হলো? কী দরকার ছিল? আশপাশে সব দেশে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এখানেও হতো। জোর করে টাকার দাম ধরে রাখার প্রয়োজন ছিল না। এখন হঠাৎ ৭ টাকা বাড়ানো হলো। এটা স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়তে পারত। আমদানি বন্ধ করে দিলে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। হুন্ডি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে রিজার্ভ রক্ষা করা যাবে না। বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ঘাটে ঘাটে হয়রানি আর দুর্নীতি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারী কীভাবে আসবে। মুখে শুধু বললেই বিনিয়োগকারী আসবে না। বিনিয়োগের আবহ তৈরি করতে হবে।

যুগান্তর : আইএমএফ-এর অন্যতম একটি শর্ত হলো ভর্তুকি কমাতে হবে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : হ্যাঁ, অহেতুক ভর্তুকি কমান। তবে আইএমএফ-এর সব কথা মানা যাবে না। আইএমএফ-এর পরামর্শে পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ চলছে। কই? তেমন উন্নতি হচ্ছে না। সেজন্য তাদের সব কথা শোনার সুযোগ নেই। কৃষি খাতে সেচের ওপর ভর্তুকি কমানো যাবে না। এছাড়া সার, ডিজেলেও ভর্তুকি অপরিবর্তিত রাখতে হবে।

যুগান্তর : ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা, শেয়ারবাজারে সংকট এবং বন্ড মার্কেটে আস্থা নেই। বর্তমানে ব্যাংক মার্জার হচ্ছে। আবার অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য গোপনে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : আগে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষ পরিচালক পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সরকারি ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে হবে। পুরো খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে হঠাৎ মার্জার করে দিলে হবে না। এছাড়া শেয়ারবাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিদেশিরা প্রচুর বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এখানে কোনো বিনিয়োগ নেই। শুধু বিদেশে রোডশো করে বেড়ায়। ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার, আর্থিক হিসাব ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ঠিক হয়নি। যে তথ্য ঝুঁকিপূর্ণ, সে তথ্য দেবে না। তাই বলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত হয়নি।