ঢাকা ০৯:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মোদি-খালেদার বৈঠক ‘গুড সাইন’

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৪:০০:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০১৫
  • ৩০৮ বার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকে ‘গুড সাইন’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

তাদের দাবি, মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর খালেদা জিয়া অনেকটাই উৎফুল্ল, ক্লান্তির ছাপ কেটে গেছে। চলতি বছরে টানা তিন মাস আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে অনেকটাই মনমরা হয়ে যান খালেদা জিয়া। বৈঠকের পর এখন অনেকটাই আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী তিনি। ফলে দলের নেতাকর্মীরাও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

হোটেল সোনারগাঁওয়ে ১৫ মিনিটের একান্ত বৈঠকে কী এমন বার্তা দিয়ে গেলেন মোদি। এ হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন অনেকেই। বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছেন একান্ত বৈঠকের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি নতুন নির্বাচনের বার্তা পেয়েই হয়ত খালেদা জিয়ার হতাশা কেটে গেছে। যদিও বৈঠকের বিষয়ে মোদি-খালেদা কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি।

নেতাকর্মীরা মনে করছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক আছে। তেমনি বিজেপির সঙ্গে বিএনপিরও একটু সুসম্পর্ক আছে। যে কারণে মোদি রাষ্ট্রীয় সফরে এসেও কোনো প্রটোকলের মধ্যে না পড়লেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এটা গুড সাইন (শুভ লক্ষণ)।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মোদিই খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পরিবেশ তৈরী করেন। বিএনপি ও ভারতের প্রতিনিধিদের বৈঠকের এক পর্যায়ে মোদি নিজেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ও ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণকে উঠে যেতে ইশারা করেন। প্রথমে খালেদা জিয়া বুঝতে পারেননি কী হতে যাচ্ছে। পরক্ষণেই বুঝতে পেরে খালেদা জিয়াও বিএনপির প্রতিনিধিদের উঠে যেতে ইশারা করেন। সবাই বাইরে চলে আসেন। এরপর মোদি-খালেদা জিয়া একান্তে ১৫ মিনিট বৈঠক করেন।

রবিবার (৭ জুন) বৈঠক শেষে হোটেল সোনারগাঁও থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও খালেদা জিয়াকে বেশ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। ওই সময় খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুন্দর আলোচনা হয়েছে।’

মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ‘এটা হলে কমন কার্টিসি। তিনি (খালেদা জিয়া) তিনবারের প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে দেখা না করে নরেন্দ্র মোদি চলে যাবেন, এটা হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘দুইজনের মধ্যে একান্তে যে কথা হয়েছে, এটা নিয়ে কিছু বলা আন-একাউন্টেবল (অহেতুক)। যেহেতু এ বিষয়ে আমাদের কিছুই বলা হয়নি।’

সাবেক এই স্পিকার বলেন, ‘আমি যতকুটু শুনেছি, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি (মোদি) বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আসলে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় মোদি চাইলেই তো বাংলাদেশে গণতন্ত্র এনে দিতে পারবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য। গণতন্ত্র, নির্বাচনসহ দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মোদি চাইলে প্রধানমন্ত্রীকে (শেখ হাসিনা) অবহিত করতে পারেন। এটাও তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।’

মোদি-খালেদা জিয়ার বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভেকেট আব্দুস সালাম আজাদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বিজেপি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। ভারতের মতো বৃহৎ একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আমরা তার সফরকে স্বাগত জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, মোদি ভারতের মতো বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নির্বাচনের ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন। ভারত বাংলাদেশের নির্বাচনে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে— এটাই দেশ মানুষ প্রত্যাশা করে।’

আব্দুস সালাম আরও বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে একান্ত বৈঠক শুভ লক্ষণ। আমরা কোনো নির্বাচিত বিরোধী দল না হলেও রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন মোদি। ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করেছেন। এটা আমাদের অর্জন।’

তবে দলের কারও কারও মতে, এখনই আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। কারণ মোদির বক্তব্যে নতুন নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। ফলে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এই মুহূর্তে যেহেতু দৃশ্যমান কিছু নেই, সেহেতু সময়ের হাতেই ছিড়ে দিতে হবে।

মোদিখালেদারএক্সক্লুসিভপনেরমিনিট : হোটেল সোনারগাঁওয়ের রবিবার (৭ জুন) ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি গড়ায় পৌণে এক ঘণ্টায়। এর মধ্যে প্রথম পর্বে দু‘পক্ষের প্রতিনিধি দলের সব সদস্যর উপস্থিতিতে আধা ঘণ্টা বৈঠক হয়। এরপর এ দু‘নেতা ১৫ মিনিট একান্তে ‘এক্সক্লুসিভ’ বৈঠক করেন নিজেদের মধ্যে। এ বৈঠকের ব্যাপারে দুই নেতার কোনো পক্ষই মুখ না খুললেও রাজনীতিকসহ সকল মহলেই সৃষ্টি হয়েছে আগ্রহ ও উৎসুক্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানান, খালেদা জিয়ার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি একান্তে পনের মিনিট কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে ওয়ান টু ওয়ান কথা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকের পরিবেশ এক কথায় এ করডিয়্যাল এ্যাটমোসফিয়ার।’

আলোচিত এ বৈঠকের প্রসঙ্গে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে চেয়ারপারসনের বৈঠকটি সার্বিক অর্থেই ‘হাই এক্সক্লুসিভ’। অফিসিয়াল বৈঠকের বিষয়বস্তু দেশের চলমান রাজনীতির সংকট, বিরোধী দলের সিনিয়র নেতাসহ কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একতরফা কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের গুম-খুনের বিষয়টি মোদিকে অবহিত করেন। এমনকি তার (খালেদা জিয়া) ও তার পরিবারের উপর সরকারের হয়রানির বিষয়টি ভারতের সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মোদির সঙ্গে আমাদের আন্তরিক পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। মোদিও আমাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। এ ছাড়া তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, তা আমরা জানি না।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা জানান, বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কথা-বার্তাই বেশী হয়েছে। বিগত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপির পক্ষ থেকে মোদিকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিও বারবার বলেছেন, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত। ভারত সব সময় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে। বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যে বিষয়টি তুলে ধরা হয় তা হল— বাংলাদেশে বর্তমানে যে সরকার দেশ শাসন করছে, তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক নয়। এরা প্রশাসনকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের সকল রীতি-নীতিকে ভূলুণ্ঠিত করে গায়ের জোরে ক্ষমতায় চেপে বসেছে। তাদের এ নির্বাচনে জনগণের কোনো অংশ গ্রহণ ছিল না। ছিল না দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলেরও। এ সব তিনি ভাল করে দেখবেন বলেও জানান।

সূত্র জানায়, পনের মিনিটের ওই বৈঠকে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেন। নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে না দিলেও তিনি চান আসছে বছরের প্রথমমার্ধেই এ দেশে একটি নির্বাচন হোক। তিনি তার এ মনোভাবের কথাও মোদিকে অবহিত করেন।

সূত্র আরও জানায়, মোদি বাংলাদেশে গণতন্ত্র সুসংহত করতে ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন বলে বিএনপি চেয়ারপারসনকে আশ্বাস দেন। তবে, তিনি (মোদি) বিএনপি জোটের সম্পর্কে সরকারের উত্থাপিত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও জোট নেতা খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চান। তিনি জামায়াতের নাম না তুলেই পরোক্ষভাবে জঙ্গি সংশ্লিষ্টদলগুলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দেন।

মোদি বিএনপি জোটের শরিক জামায়াতের বিষয়ে কিছু তথ্য জোট নেতার কাছে জানতে চান। বিএনপি ভবিষ্যতে জামায়াত ছেড়ে রাজনীতি করবে কি না, বিএনপিতে তারেক রহমানের ভূমিকা কী বা কতটুকু, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও শান্তির জন্য বিএনপির জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান কী— এ সব বিষয়েও মোদি জানতে চান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া তার দল ও জোটের বিরুদ্ধে সরকারের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে নিতান্তই রাজনৈতিক ফায়দা হাছিলের প্রপাগাণ্ডা বলে মত দেন। তবে, তিনি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো ধরনের আদর্শিক মিল বা জোট নেই বলে জানিয়েছেন। তিনি মোদিকে জানান, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যে জোট তা নিতান্তই রাজনৈতিক কৌশলগত। এ ধরনের জোট আওয়ামী লীগ অতীতে দু‘দুবার করেছিল। বর্তমানে বিএনপি জোটে জামায়াতের থাকা না থাকা চিরস্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নয়। দেশের রাজনৈতিক স্থবিরতা ও সরকারের বাধা বিপত্তি কাটিয়ে উঠে জোট নিয়ে খালেদা জিয়া নতুন করে ভাববেন বলেও মোদিকে আশ্বস্ত করেন।

সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার হওয়া তার দলের অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের বিষয়টিও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করেন। তিনি সালাহ উদ্দিন উদ্ধার পরবর্তী তার প্রতি ভারত সরকারের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মোদি ও ভারতবাসীকে দলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদও দেন। তবে, সালাহউদ্দিনের বিষয়টিকে যতটা না আইনী বিষয় তার থেকেও মানবিক বিষয় হিসেবে দেখতেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) রহুল আলম চৌধুরী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের চেয়ারপারসনের যে বৈঠক হয়েছে তা আমরা ফলপ্রসূ বলেই মনে করি। বৈঠকটি অত্যন্ত হৃদ্যিক পরিবেশে হয়েছে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এ উপদেষ্টা আরও বলেন, দু‘পক্ষের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর মোদি চেয়ারপারসনের সঙ্গে প্রায় পনের মিনিট ‘এক্সক্লুসিভ’ বৈঠক করেছেন। একান্ত বৈঠক তো একান্তই। এটা কারও সঙ্গে শেয়ার করারও বিষয় না। এ বিষয়ে তাই কিছু বলাও যাবে না।

তিনি আরও বলেন, একান্ত বৈঠক হবে এটাই আমরা জানতাম না। প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সবাইকে বলা হয় বেরিয়ে যেতে। এরপর তাদের মধ্যে সেই বৈঠকটি হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

মোদি-খালেদার বৈঠক ‘গুড সাইন’

আপডেট টাইম : ০৪:০০:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০১৫

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকে ‘গুড সাইন’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

তাদের দাবি, মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর খালেদা জিয়া অনেকটাই উৎফুল্ল, ক্লান্তির ছাপ কেটে গেছে। চলতি বছরে টানা তিন মাস আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে অনেকটাই মনমরা হয়ে যান খালেদা জিয়া। বৈঠকের পর এখন অনেকটাই আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী তিনি। ফলে দলের নেতাকর্মীরাও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

হোটেল সোনারগাঁওয়ে ১৫ মিনিটের একান্ত বৈঠকে কী এমন বার্তা দিয়ে গেলেন মোদি। এ হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন অনেকেই। বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছেন একান্ত বৈঠকের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি নতুন নির্বাচনের বার্তা পেয়েই হয়ত খালেদা জিয়ার হতাশা কেটে গেছে। যদিও বৈঠকের বিষয়ে মোদি-খালেদা কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি।

নেতাকর্মীরা মনে করছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক আছে। তেমনি বিজেপির সঙ্গে বিএনপিরও একটু সুসম্পর্ক আছে। যে কারণে মোদি রাষ্ট্রীয় সফরে এসেও কোনো প্রটোকলের মধ্যে না পড়লেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এটা গুড সাইন (শুভ লক্ষণ)।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মোদিই খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পরিবেশ তৈরী করেন। বিএনপি ও ভারতের প্রতিনিধিদের বৈঠকের এক পর্যায়ে মোদি নিজেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ও ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণকে উঠে যেতে ইশারা করেন। প্রথমে খালেদা জিয়া বুঝতে পারেননি কী হতে যাচ্ছে। পরক্ষণেই বুঝতে পেরে খালেদা জিয়াও বিএনপির প্রতিনিধিদের উঠে যেতে ইশারা করেন। সবাই বাইরে চলে আসেন। এরপর মোদি-খালেদা জিয়া একান্তে ১৫ মিনিট বৈঠক করেন।

রবিবার (৭ জুন) বৈঠক শেষে হোটেল সোনারগাঁও থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও খালেদা জিয়াকে বেশ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। ওই সময় খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুন্দর আলোচনা হয়েছে।’

মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ‘এটা হলে কমন কার্টিসি। তিনি (খালেদা জিয়া) তিনবারের প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে দেখা না করে নরেন্দ্র মোদি চলে যাবেন, এটা হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘দুইজনের মধ্যে একান্তে যে কথা হয়েছে, এটা নিয়ে কিছু বলা আন-একাউন্টেবল (অহেতুক)। যেহেতু এ বিষয়ে আমাদের কিছুই বলা হয়নি।’

সাবেক এই স্পিকার বলেন, ‘আমি যতকুটু শুনেছি, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি (মোদি) বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আসলে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় মোদি চাইলেই তো বাংলাদেশে গণতন্ত্র এনে দিতে পারবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য। গণতন্ত্র, নির্বাচনসহ দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মোদি চাইলে প্রধানমন্ত্রীকে (শেখ হাসিনা) অবহিত করতে পারেন। এটাও তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।’

মোদি-খালেদা জিয়ার বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভেকেট আব্দুস সালাম আজাদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বিজেপি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। ভারতের মতো বৃহৎ একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আমরা তার সফরকে স্বাগত জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, মোদি ভারতের মতো বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নির্বাচনের ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন। ভারত বাংলাদেশের নির্বাচনে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে— এটাই দেশ মানুষ প্রত্যাশা করে।’

আব্দুস সালাম আরও বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে একান্ত বৈঠক শুভ লক্ষণ। আমরা কোনো নির্বাচিত বিরোধী দল না হলেও রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন মোদি। ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করেছেন। এটা আমাদের অর্জন।’

তবে দলের কারও কারও মতে, এখনই আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। কারণ মোদির বক্তব্যে নতুন নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। ফলে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এই মুহূর্তে যেহেতু দৃশ্যমান কিছু নেই, সেহেতু সময়ের হাতেই ছিড়ে দিতে হবে।

মোদিখালেদারএক্সক্লুসিভপনেরমিনিট : হোটেল সোনারগাঁওয়ের রবিবার (৭ জুন) ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি গড়ায় পৌণে এক ঘণ্টায়। এর মধ্যে প্রথম পর্বে দু‘পক্ষের প্রতিনিধি দলের সব সদস্যর উপস্থিতিতে আধা ঘণ্টা বৈঠক হয়। এরপর এ দু‘নেতা ১৫ মিনিট একান্তে ‘এক্সক্লুসিভ’ বৈঠক করেন নিজেদের মধ্যে। এ বৈঠকের ব্যাপারে দুই নেতার কোনো পক্ষই মুখ না খুললেও রাজনীতিকসহ সকল মহলেই সৃষ্টি হয়েছে আগ্রহ ও উৎসুক্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানান, খালেদা জিয়ার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি একান্তে পনের মিনিট কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে ওয়ান টু ওয়ান কথা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকের পরিবেশ এক কথায় এ করডিয়্যাল এ্যাটমোসফিয়ার।’

আলোচিত এ বৈঠকের প্রসঙ্গে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে চেয়ারপারসনের বৈঠকটি সার্বিক অর্থেই ‘হাই এক্সক্লুসিভ’। অফিসিয়াল বৈঠকের বিষয়বস্তু দেশের চলমান রাজনীতির সংকট, বিরোধী দলের সিনিয়র নেতাসহ কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একতরফা কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের গুম-খুনের বিষয়টি মোদিকে অবহিত করেন। এমনকি তার (খালেদা জিয়া) ও তার পরিবারের উপর সরকারের হয়রানির বিষয়টি ভারতের সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মোদির সঙ্গে আমাদের আন্তরিক পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। মোদিও আমাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। এ ছাড়া তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, তা আমরা জানি না।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা জানান, বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কথা-বার্তাই বেশী হয়েছে। বিগত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপির পক্ষ থেকে মোদিকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিও বারবার বলেছেন, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত। ভারত সব সময় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে। বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যে বিষয়টি তুলে ধরা হয় তা হল— বাংলাদেশে বর্তমানে যে সরকার দেশ শাসন করছে, তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক নয়। এরা প্রশাসনকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের সকল রীতি-নীতিকে ভূলুণ্ঠিত করে গায়ের জোরে ক্ষমতায় চেপে বসেছে। তাদের এ নির্বাচনে জনগণের কোনো অংশ গ্রহণ ছিল না। ছিল না দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলেরও। এ সব তিনি ভাল করে দেখবেন বলেও জানান।

সূত্র জানায়, পনের মিনিটের ওই বৈঠকে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেন। নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে না দিলেও তিনি চান আসছে বছরের প্রথমমার্ধেই এ দেশে একটি নির্বাচন হোক। তিনি তার এ মনোভাবের কথাও মোদিকে অবহিত করেন।

সূত্র আরও জানায়, মোদি বাংলাদেশে গণতন্ত্র সুসংহত করতে ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন বলে বিএনপি চেয়ারপারসনকে আশ্বাস দেন। তবে, তিনি (মোদি) বিএনপি জোটের সম্পর্কে সরকারের উত্থাপিত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও জোট নেতা খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চান। তিনি জামায়াতের নাম না তুলেই পরোক্ষভাবে জঙ্গি সংশ্লিষ্টদলগুলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দেন।

মোদি বিএনপি জোটের শরিক জামায়াতের বিষয়ে কিছু তথ্য জোট নেতার কাছে জানতে চান। বিএনপি ভবিষ্যতে জামায়াত ছেড়ে রাজনীতি করবে কি না, বিএনপিতে তারেক রহমানের ভূমিকা কী বা কতটুকু, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও শান্তির জন্য বিএনপির জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান কী— এ সব বিষয়েও মোদি জানতে চান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া তার দল ও জোটের বিরুদ্ধে সরকারের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে নিতান্তই রাজনৈতিক ফায়দা হাছিলের প্রপাগাণ্ডা বলে মত দেন। তবে, তিনি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো ধরনের আদর্শিক মিল বা জোট নেই বলে জানিয়েছেন। তিনি মোদিকে জানান, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যে জোট তা নিতান্তই রাজনৈতিক কৌশলগত। এ ধরনের জোট আওয়ামী লীগ অতীতে দু‘দুবার করেছিল। বর্তমানে বিএনপি জোটে জামায়াতের থাকা না থাকা চিরস্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নয়। দেশের রাজনৈতিক স্থবিরতা ও সরকারের বাধা বিপত্তি কাটিয়ে উঠে জোট নিয়ে খালেদা জিয়া নতুন করে ভাববেন বলেও মোদিকে আশ্বস্ত করেন।

সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার হওয়া তার দলের অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের বিষয়টিও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করেন। তিনি সালাহ উদ্দিন উদ্ধার পরবর্তী তার প্রতি ভারত সরকারের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মোদি ও ভারতবাসীকে দলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদও দেন। তবে, সালাহউদ্দিনের বিষয়টিকে যতটা না আইনী বিষয় তার থেকেও মানবিক বিষয় হিসেবে দেখতেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) রহুল আলম চৌধুরী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের চেয়ারপারসনের যে বৈঠক হয়েছে তা আমরা ফলপ্রসূ বলেই মনে করি। বৈঠকটি অত্যন্ত হৃদ্যিক পরিবেশে হয়েছে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এ উপদেষ্টা আরও বলেন, দু‘পক্ষের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর মোদি চেয়ারপারসনের সঙ্গে প্রায় পনের মিনিট ‘এক্সক্লুসিভ’ বৈঠক করেছেন। একান্ত বৈঠক তো একান্তই। এটা কারও সঙ্গে শেয়ার করারও বিষয় না। এ বিষয়ে তাই কিছু বলাও যাবে না।

তিনি আরও বলেন, একান্ত বৈঠক হবে এটাই আমরা জানতাম না। প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর সবাইকে বলা হয় বেরিয়ে যেতে। এরপর তাদের মধ্যে সেই বৈঠকটি হয়।