,

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে শিক্ষকরা

হাওর বার্তা ডেস্কঃ বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ। নানামুখী সংকটকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হতে যাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার অনেকটা বাড়লেও শিক্ষক এবং শিক্ষার গুণগত মান এখনও সেই তিমিরেই। বাড়ছে শিক্ষক সংখ্যা।

কিন্তু সে তুলনায় বাড়ছে না দক্ষ শিক্ষক। নষ্ট রাজনীতির অন্ধগলি থেকেও শিক্ষকরা নিজেদের মুক্ত রাখতে পারছে না না। রাজনীতিমনস্ক শিক্ষক এবং রাজনীতিতে শিক্ষকদের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু আদর্শের রাজনীতি করতে গিয়ে শিক্ষকদের কখনো নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দেননি। অথচ এখন সে চিত্র অনেকটা পালটে গেছে। এখন শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও রাজনীতি নিয়ে দলবাজিসহ নানা রকম কোন্দলে যুক্ত।

দলাদলি, নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি নিত্যসঙ্গী। এমনকি প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষকদের যুক্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে খাদের কিনারে নিয়ে এসেছে। রাজনীতিসংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অনেকে নিজেদের পদ-পদবি এবং ব্যক্তিস্বার্থের জন্য যেন সব কিছু করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির দ্বারা শিক্ষকরাই অনেকটা প্রভাবিত। ক্ষমতাধর ছাত্রনেতারা শত অন্যায় করলেও শিক্ষকরা তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। বলা যায়, শিক্ষকরা বড় অসহায়। খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়, অভিযোগ রয়েছে কোনো কোনো শিক্ষক নিজের পদপদবি টিকিয়ে রাখতে উলটো ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলেন। মূলত এসব কারণে এ মহান পেশার সুনাম তলানিতে ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এদিকে এখনো দেশে বহু নীতিবান ও সৎ শিক্ষকদের অভাব নেই। গ্রাম এবং মফস্বল শহর থেকে শুরু করে একেবারে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের দীর্ঘ সারি। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অনেকে জানিয়েছেন, সাধারণ শিক্ষকদের সমস্যার অন্ত নেই। তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না। সময়মতো পদোন্নতিসহ প্রাপ্য বিভিন্ন সুবিধা পেতে তাদের শুধু ধৈর্যের পরীক্ষায় দিতে হয়। সব ক্ষেত্রে তারা অবহেলিত। এমনকি অনেক সময় বাধ্য হয়ে অপরাজনীতির খাতায় নামও লেখাতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকসমাজ যতক্ষণ পর্যন্ত নীতিহীন রাজনীতির ঘেরাটোপ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না, ততদিন কোনো শিক্ষক দিবস শিক্ষকদের ভালো কোনো সুখবর দিতে পারবে না।

করোনাপরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের এই পরিস্থিতিতে আজ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হচ্ছে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। শিক্ষায় শিক্ষকের গুরুত্ব, তার অধিকার ও মর্যাদাসহ অন্যান্য বিষয় স্মরণে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ডাকে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। সংস্থাটি এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘দ্য ট্রান্সফরমেশন অব এডুকেশন বিগিনস উইথ টিচার্স’। অর্থাৎ শিক্ষায় রূপান্তর শুরু হয় শিক্ষকের মাধ্যমে। দিবসটি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশে সরকারিভাবে এই দিবসটি উদযাপন করা হয় না। তবে একটি জাতীয় কমিটি বেশ কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালন করে আসছে। ওই কমিটির নেতৃত্বে থাকেন প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ। এ প্রসঙ্গে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘যুগের প্রয়োজনে সব সময়ই শিক্ষায় পরিবর্তন ও রূপান্তর আনতে হয়। আর এসব হয়ে থাকে শিক্ষকের মাধ্যমেই। এরপরও ইউনেস্কো এবারে এই বিষয়টিকেই দিবসের স্লোগান হিসাবে নির্ধারণের কারণ হচ্ছে, বিষয়টির ওপর বাড়তি গুরুত্ব প্রদান। কেননা, বিশ্ব অতিমারির বড় একটা ধকল পার করে এসেছে।’

তিনি মনে করেন, ‘যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছে। কিন্তু করোনাকালে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকায় কেবল শিখন ঘাটতিই নয়, আরও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ সময় সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন এসেছে শিক্ষায় সেটি হচ্ছে-প্রযুক্তির ব্যবহার। দুবছরে ভার্চুয়ালি লেখাপড়া করায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ে এর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এখন শুধু সরাসরি ক্লাস আর পাঠদানের মাধ্যম নয়। অনসাইটের পাশাপাশি অনলাইন বা একসঙ্গে বললে হাইব্রিড পাঠদানের ধারণা চালু হয়েছে। কিন্তু সেটি করতে গেলে ব্যবহারিক ক্লাস কীভাবে নেওয়া যাবে, সেই প্রশ্নও সামনে আছে। এই যে বহুমুখী পরিবর্তন আর নতুনত্ব এগুলো, এটি শিক্ষা একীভূত করতে রূপান্তরের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। নতুন যুগে রূপান্তরে নেতৃত্ব দেবেন শিক্ষকরা, এটিই ইউনেস্কোর মর্মবাণী।’

ইউনেস্কো মনে করছে, নতুন এ পরিস্থিতির জন্য শিক্ষায় এই রূপান্তর ঘটাতে নানামুখী চ্যালেঞ্জ আছে। আর সেই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছেন খোদ শিক্ষকরা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-উপযুক্ত শিক্ষকের ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব ও গোটা ক্যারিয়ারেই পেশাগতই ধারাবাহিক উন্নয়নের সুযোগের অভাব, অনেক শিক্ষকের কর্মপরিবেশ অনুকূল নয়, শিক্ষকতা পেশা আকৃষ্ট করার মতো সুবিধার অভাব, শিক্ষকের নেতৃত্ব আর উদ্ভাবনের সুযোগ উৎসাহমূলক নয়।

শিক্ষা বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইউনেস্কো চিহ্নিত উল্লিখিত বিষয়টি ভয়ানকভাবে উপযুক্ত। করোনাকালে শিক্ষকের ওপর সমীক্ষা চালায় গণসাক্ষরতা অভিযান (ক্যাম্পে)। সংস্থাটি গবেষণায় পেয়েছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষকই পরিবারের সব মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। অন্তত সাড়ে ৮ শতাংশ শিক্ষকের ঘরে বেশিরভাগ সময়ে এই ঘাটতি থাকে। আর মাঝে মাঝে ঘাটতির শিকার হন প্রায় ২৪ শতাংশ শিক্ষক। ২০১৯ সালের তুলনায় এই পরিস্থিতি ২০২১ সালে চারগুণ বেড়ে যায়। মূলত করোনাকালে চাকরি হারানো ও উপার্জন কমে যাওয়ায় শিক্ষকরা এই পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হয়েছেন। কর্মপরিবেশের ক্ষেত্রে ভয়ংকরভাবে প্রতিবন্ধকের ভূমিকায় বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তদারকের পরিবর্তে তারা ‘বাপ-মা’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন। অনেকের কাছেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকল্প আয়ের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এই অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবাজ শিক্ষক-কমিটি মিলে লুটপাট করে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষকের দৌরাত্ম্য। যে কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়। দুর্নীতিবাজের সংখ্যা নগণ্য হওয়ায় বেশিরভাগ সাধারণ শিক্ষকই নিষ্পেষিত। এরপরও নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।

রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জহুরা বেগম যুগান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কেবল পাঠদানের মধ্যে সীমিত। শিক্ষার্থী যখন স্কুলে আসে, তখন তার সামাজিকীকরণ হয়। বিভিন্ন পরিবার থেকে আসা সব ধরনের শিক্ষার্থীর সঙ্গে মিশে তারা সমাজ সম্পর্কে ধারণা পায়। স্কুলে তারা খেলাধুলা করে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্মকে আত্মিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত করে তোলায় ভূমিকা রাখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’

ক্যাম্পের উপ-পরিচালক কেএম এনামুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘অতিমারির কারণে শিক্ষার্থীদের কেবল শিখন ঘাটতি নয়, আরও অনেক ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পূরণে ৪ থেকে ৫ বছর লেগে যাবে। এজন্য শিক্ষা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি দরকার। অন্যদিকে বিগত দুই বছরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যে নতুনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে, সেটির সঙ্গে পুরোনোকে মিলিয়ে একটি রূপান্তর ঘটাতে হবে। নইলে পাঠদান আর পরীক্ষাই নয়, শিক্ষার নানা ক্ষেত্রে যুগের চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হবে। সেসব মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে শিক্ষক নেতৃত্ব দেবেন। তবে এক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগ জরুরি।’

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর